বিজ্ঞাপন

আমীরুল ইসলাম : ছড়াপুরের আমির

আমীরুল ইসলাম : ছড়াপুরের আমির

‘কে বানাল? কে লিখল? আদিকালের ছড়া?

হাজার ছড়া বেঁচে আছেন বংশ-পরম্পরা।

কোন সে মাসী? কোন সে পিসী? ছড়া বানান মুখে

হাজার বছর ধরে ছড়া কাটছি সুখে-দুঃখে।

কানে শুনে মনে রাখার মন্ত্র দিয়ে ভরা

চির নতুন পুরানো সেই আদিকালের ছড়া।

................................................

ছড়া লিখেই কারোর আবার মহারাজার ভাব

ছড়া হলো সহজ সরল কৃত্রিমতা নয়

একটি সরল গ্রাম ছড়াই জীবন করে জয়।’

ছড়া সম্পর্কে এই কঠিন কথাগুলো এত সহজ করে কে বলেছেন? আমীরুল ইসলাম। একাধারে ছড়াকার, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, অনুবাদক। শিশু সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই, যা নিয়ে তিনি লেখেননি।

আমি ছড়া সাহিত্যের একজন ক্ষুদ্র কর্মী হিসেবে এই আলোচনা ছড়াতেই সীমিত রাখার চেষ্টা করব। আমীরুল ইসলাম সবচেয়ে বেশি লিখেছেন ছড়া। সবচেয়ে মনোযোগ দিয়ে লিখেছেন। এর কারণও তিনি নিজেই বলেছেন—

“আমি ভালোবাসি নিমফুল-জুঁই

মাছরাঙা। নীল, আকাশের নীল।

আমি ভালোবাসি বসন্তের বায়ু।

শিশিরের রঙ। উড়ন্ত চিল।

………………………..

আমি ভালোবাসি সুর ঝংকার।

গদ্য পদ্য কবিতা ও ছড়া।”

স্বীকৃতিও এসেছে তার লেখার পথ ধরে একের পর এক। ১৯৮৪ সালে, মাত্র বিশ বছর বয়সে, ‘খামখেয়ালী’ ছড়াগ্রন্থের জন্য তিনি পান অগ্রণী ব্যাংক শিশু-সাহিত্য পুরস্কার। এত অল্প বয়সে এই পুরস্কার পাওয়ার দৃষ্টান্ত তখন আর কোনো শিশুসাহিত্যিকের ছিল না।

সেই যে শুরু, এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক পুরস্কার এসেছে তার ঝুলিতে। ২০০৬ সালে পান বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার। পুরস্কারের স্বীকৃতিতে যেমন তার অর্জন সমৃদ্ধ, তেমনি পাঠকের ভালোবাসাতেও তার প্রাপ্তির ভাণ্ডার পূর্ণ।

আমীরুল ইসলাম বহু সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন বহু সংগঠনের। মানুষের। তরুণ ছড়াকারদের অভিভাবক ছিলেন তিনি। ‘শিশুসাহিত্যের আলোছায়া’ গ্রন্থ লেখার সময় আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। তারপর আরও বহুবার তার কাছে ছুটে গেছি। আতিথেয়তায় অতুলনীয় ছিলেন। উপহার দিতেন অমূল্য বই।

বিচিত্র ভাব, কল্পনা, ননসেন্স, একই সঙ্গে বুদ্ধির শানিত ঝিলিক। লিখেছেন কয়েক হাজার ছড়া সব মিলিয়ে। সাধেই কি আর তাকে আমি ‘ছড়াপুরের আমির’ ডাকি? আমির মানে রাজা।

এত এত ছড়ার মধ্যে কোনটা রেখে কোনটার কথা বলা যায়? উদাহরণ থাক এখানে কয়েকটা—

“আঁকব চিতা বাঘ

দিলাম কালো দাগ।

ডাইনে বাঁয়ে টান,

মেরেছি দুই খান।

ছবিটা বোঝা ভার

হয়েছে গাধার।”

আরেকটি ছড়া—

“এলাটিং বেলাটিং

ফুটবল খেলাটিং

ফুটবল ফুটবল

পায়ে পায়ে ছুট বল…”

বিড়াল ভালোবাসতেন তিনি। সেই ছড়ায় লিখেছেন—

“আমার পোষা বিলাই

যতই তাকে কিলাই

খেতেই থাকে

এরই ফাঁকে

...................

জিবলা বড়, ল্যাঞ্জা মোটা

 থ্যাবড়ানো নাক বোঁচা।…”

কুকুর আর ইঁদুর নিয়ে লেখা তার ছড়া ছিল বেশ। তিনি লিখেছেন—

 “তিন টন ওজনের মোটা জলহস্তী,

 ইঁদুরের সাথে তার ভয়ানক দোস্তি।

দুইজনে জলকেলি করে এক পুকুরে

 ইঁদুরকে খাওয়ায় করে কালো এক কুকুর।

কুকুরকে তাড়া করে রাগী খ্যাঁকশেয়ালে

কুকুরটা চুপচাপ—উঠে পড়ে দেয়ালে।

.............................................................

এইরকম আরেকটি ছড়া উল্লেখ করতে চাই, যা শুধু শিশুদের ভালো লাগবে না, বড়দেরও লাগবে।

“ছড়ায় ছড়ায় রঙের সুর

 ছড়া মানেই সমুদ্দুর।

 নীলকমলের তেপান্তর

 সেইখানে কি ছড়ার ঘর?

 কোথায় আছে ছন্দ-মিল?

 ছড়া মানেই রং মিছিল।”

আমীরুল ইসলাম ছিলেন সুরাঁধুনি। কতজনকে যে ডেকে ডেকে রান্না করে খাইয়েছেন! অবশ্য তার আক্ষেপও ছিল!

“ডাইনোসরের ডিম যদি পাই

 আর কি চাই?

 সে ডিম খাব ভাজা

 আমি তখন রাজা।

মরিশাসের ডেডোপাখির

 মাংস যদি পাই

 করব ডিপ ফ্রাই।

 আর কিছু না চাই।”

এই রকম কত ছড়া যে তিনি লিখেছেন। শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন আমীরুল ইসলাম সম্পর্কে লিখেছেন, “ছড়াকার’ একটি লঘুপ্রায় অভিধা। আমীরুল মূলত কবি এবং কবি বলেই বিচিত্র ভাবধারায় সব ছড়ার জন্মদাতা। তার সেসব ছড়া এক একটি নিটোল কবিতা। ভালো ছড়া মানেই তো ভালো কবিতা। রবীন্দ্রনাথের অত্যুজ্জ্বল অনুসারী আমীরুল।”

শিল্পী ধ্রুব এষ ছড়া নিয়ে তার দীর্ঘ সময়ের কাজ, বিভিন্ন পুরস্কার এবং তার ছড়ার বৈচিত্র্যের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের শিশুসাহিত্যে আমীরুল ইসলামের মতো খুব বেশি নেই। তার রাস্তায় তিনি একা একজন। একা হেঁটে চলে গেছেন অনেক দূর। অন্যদের থেকে সেটা এতই ‘দূর’ যে, ঈর্ষাকাতররা দূরবীনে চোখ রেখেও তাকে দেখতে পাচ্ছেন না। না পেলেন, পাঠকদের কী? পাঠকরা তো কারোর ঈর্ষা দেখবেন না, তারা পড়বেন আমীরুল ইসলামের ছড়া।’

অকৃতদার আমীরুল সংসার বেঁধেছিলেন সাহিত্যের সঙ্গে। ছড়া তার সন্তান। নিজের জীবন, সঞ্চয়, মেধা, শক্তি নিয়োগ করেছেন সাহিত্যে। তাতে লাভ হয়েছে বাংলা সাহিত্যের, বিশেষ করে শিশুসাহিত্যের।

অন্ত্যমিলের প্যারাডক্স, কিংবা উদ্ভট অন্ত্যমিল বাদ দিয়ে গদ্যছড়া লিখেছেন প্রচুর। এটি সাহসের কাজ। ধ্রুব এষ যেমনটি বলেছেন, “বাংলার ছড়ায় একটা নতুন ট্রেন্ড এবং ব্র্যান্ড ‘আমীরুল ইসলাম’। আত্মবিশ্বাস এবং দুঃসাহস রাখেন যে কোনো সংকটে তুড়ি বাজানোর। একে ওকে তোয়াক্কা করেন না।”

উদাহরণ দেওয়া যাক—

“ছড়া কি জোনাকি পোকা?

ছড়া কি ভোরের ফুল?

ছড়া কি রাঙা বউয়ের মধুর হাসি?

বুবুর কানের দুল অথবা

ছড়া সেই অধরা মাধুরী

যাকে দেখা যায় না।”

এমন আর কেউ কি লিখেছেন?

ছড়া যদি বাংলাসাহিত্যের সবচেয়ে প্রাচীন শাখা হয়, তবে ছন্দ ও মিল হচ্ছে তার শিরদাঁড়া। সেই শিরদাঁড়াকে একটু নমনীয় করার কথা বলেছিলেন তিনি।

তার নিরীক্ষাধর্মী ছড়াগুলো দীর্ঘজীবী হবে কিনা, পাঠকমহলে সমাদৃত হবে কিনা, তার অনুগামীদের দ্বারা অনুসৃত হবে কিনা সেই বিচারের ভার সময়ের হাতে তোলা থাক।

আমীরুল ইসলাম বহু সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন বহু সংগঠনের। মানুষের। তরুণ ছড়াকারদের অভিভাবক ছিলেন তিনি। ‘শিশুসাহিত্যের আলোছায়া’ গ্রন্থ লেখার সময় আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। তারপর আরও বহুবার তার কাছে ছুটে গেছি। আতিথেয়তায় অতুলনীয় ছিলেন। উপহার দিতেন অমূল্য বই।

আমীরুল ইসলাম বলতেন, “লেখক হওয়ার আগে পাঠক হতে হয়, পরেও।”

নিজেও প্রচুর পড়তেন। তার পড়ার সীমা ছিল ঈর্ষণীয়। আড্ডা দিতে দিতে পড়ে ফেলতেন আস্ত একখানা বই।

অকৃতদার আমীরুল সংসার বেঁধেছিলেন সাহিত্যের সঙ্গে। ছড়া তার সন্তান। নিজের জীবন, সঞ্চয়, মেধা, শক্তি নিয়োগ করেছেন সাহিত্যে। তাতে লাভ হয়েছে বাংলা সাহিত্যের, বিশেষ করে শিশুসাহিত্যের। তার মৃত্যুতে তারচেয়ে বেশি ক্ষতি হলো আমাদেরই।

তার উল্লেখযোগ্য কিছু বই: ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: সেরা কিশোর কবিতা’, ‘এক যে পেটুক ফড়িং ছানা’, ‘মজার পড়া ১০০ ছড়া’, ‘সোনা রঙের ছড়া’, ‘যা দেখি তাই ছড়া হয়ে যায়’, ‘ছড়া গেছে ছড়াপুরে’, ‘মেঘে মেঘে ঝুলে আছে আমাদের ছড়া’, ‘বীর বাঙালির গল্প’ ইত্যাদি।

শেষ করি তার একটি অপূর্ণ স্বপ্ন নিয়ে। তিনি জাদুকর জুয়েল আইচের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন—

‘একটা শুধু ম্যাজিক দেখাও

সেই ম্যাজিকের জোরে

ফুলের মত ভাত ফুটবে

নতুন কোন ভোরে।’

ছড়ায় ছড়ায় তার মুক্তি হোক।

ব্রত রায় : ছড়াকার ও কথাসাহিত্যিক

বিজ্ঞাপন