অনেক জল্পনা কল্পনার পর অবশেষে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন শেষে সব সদস্য দেশের ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি যৌথ ঘোষণাপত্র স্বাক্ষর করা সম্ভব হয়েছে। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সদস্য দেশগুলো একমত হয়েছে–ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এমন ঘোষণা অনেকটাই অপ্রত্যাশিত ছিল।
সম্মেলন শুরুর আগে ধারণা হচ্ছিল মার্কিন আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে একটি সম্মিলিত ঘোষণা দেওয়া অনেকটা কঠিন হয়ে উঠবে ব্রিকস দেশগুলোর জন্য। এই আশঙ্কাগুলো অমূলক প্রমাণিত করে এমন কিছু বিষয় এখানে এসেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রককে আরও প্রতিক্রিয়াশীল করে তুলতে পারে।
এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বিশ্ববাণিজ্যে মার্কিন ডলারের আধিপত্য কমাতে বিকল্প মুদ্রার মাধ্যমে লেনদেন করা অপরিহার্য বলে মনে করছে ব্রিকস দেশগুলো। অথচ এর আগে ২০২৪ সালে ডলারের বিপরীতে বিকল্প মুদ্রায় বাণিজ্য করতে গেলে ব্রিকসের উপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে রেখেছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
বৈশ্বিক আধিপত্যবাদের মাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ বন্ধে ব্রিকস দেশগুলো একত্রে কাজ করতে সম্মত হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রকারান্তরে যুক্তরাষ্ট্রকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে মনে করা যায়। ইরান ব্রিকসের অন্যতম সদস্যদেশ, আবার অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতও ব্রিকসের সদস্য।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে গিয়ে সংস্থাটি যুক্তরাষ্ট্রকে খ্যাপাতে চাইবে না বলে যে ধারণা ছিল, সেটি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো পুনর্গঠনের দাবি জানানো হয়েছে ব্রিকস থেকে। এক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদে ব্রিকসের আরও জোরালো ভূমিকার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এমন বিবৃতির মাধ্যমে দীর্ঘ বছর ধরে চলা নিরাপত্তা পরিষদে ভারত এবং ব্রাজিলের মতো দেশগুলো অন্তর্ভুক্ত করা ছাড়াও আফ্রিকার প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দৃঢ়ভাবে জানিয়েছেন যে, পুরোনো কাঠামো দিয়ে বর্তমানে নানা সমস্যা নির্ভর বিশ্বকে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে উঠছে। এক্ষেত্রে বৈশ্বিক কাঠামোগত বাস্তববাদকে আমলে নিয়ে এর সংস্কারের গুরুত্ব অনুভূত হয়েছে নরেন্দ্র মোদির বক্তব্যে। বৈশ্বিক সব ফোরামে বৈশ্বিক দক্ষিণের (গ্লোবাল সাউথ) দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব, সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা এবং নীতি নির্ধারণের গুরুত্ব উঠে এসেছে এবারের সম্মেলনে।
বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং এগুলো পরিচালনার নীতিমালা প্রণয়নেও দক্ষিণের দেশগুলোর অংশগ্রহণ আবশ্যক বলে জোর তাগিদ এসেছে এবারের সম্মেলন থেকে। একই নীতি ব্যক্ত হয়েছে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর পক্ষ থেকেও। বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতাকে ইঙ্গিত করে প্রতিটি দেশের সার্বভৌম অধিকারকে মর্যাদা দানের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রেসিডেন্ট শি-র পক্ষ থেকে।
অন্যদেশের অভ্যন্তরীণ নীতিতে হস্তক্ষেপ না করার দীর্ঘদিনের চীনের নীতিকে উল্লেখ করে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর এক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে কার্যত তিনি ইরান এবং ইউক্রেন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকেই বুঝিয়েছেন বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে।
বিশ্ববাণিজ্যের বর্তমান সংকটকে আমলে নিয়ে পশ্চিমের দেশগুলো একতরফাভাবে একে নিয়ন্ত্রণ করাকে এখন আর মেনে নেওয়া যায় না-এমনটাই ব্যক্ত হয়েছে শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্যের মাধ্যমে এবং যৌথ ঘোষণায় তা স্থান পেয়েছে।
বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা যদিও আগে থেকেই উন্নত দেশ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাথে সমান আচরণ করছে না মর্মে অভিযোগ ছিল, এবার এটি আরও শক্তভাবে উঠে এসেছে ডব্লিউটিও-কে পাস কাটিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একতরফাভাবে বিভিন্ন দেশের উপর বিভিন্ন পরিমাণ শুল্ক আরোপের মধ্য দিয়ে।
ভিন্ন ভিন্ন দেশের ওপর ভিন্ন ধরনের শুল্কারোপ কোনোভাবেই বাণিজ্যনীতির মৌলিক বিধানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এর মধ্য দিয়ে বরং নিজ স্বার্থে বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে রাজনৈতিক স্বার্থ অর্জনটা বড় করে দেখা হচ্ছে। এখানে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে জটিলতা বিশ্ব বাণিজ্য অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছে, এমন বিষয়ের দিকেই মূলত ইঙ্গিত করা হয়েছে।
এর মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাও বড় ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এটি সার্বিকভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করলেও সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে কোনো সংঘাতে যুক্ত না থাকা দেশগুলো।
সাম্প্রতিক সময়ে বাব আল-মানদেব প্রণালীর ওপর হুতিদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই সংকট নতুন মাত্রা লাভ করবে। সার্বিকভাবে এবারের সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী নেতৃবৃন্দের মনে এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে বেশি উঁকি দিয়েছে যে এভাবে এমন অবস্থা কি চলতে দেওয়া উচিত, নাকি পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আরও সোচ্চার ভূমিকা পালন করা দরকার?
এবারের সম্মেলনের মাধ্যমে ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করল ভারত। শুরুর দিকের অনেক অনিশ্চয়তাকে জয় করে মূলত ভারতের প্রধানমন্ত্রী এই সম্মেলনের মাধ্যমে বৈশ্বিক বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সদস্য দেশগুলো একমত করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করেন।
সম্মেলনের যে ঘোষণাগুলো এসেছে, এর অনেকগুলোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সংযুক্ত আরব আমিরাত একমত নাও হতে পারে– এমন আশঙ্কাকে জয় করতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে ভারত। একটি সদস্য দেশ হিসেবে ব্রিকসের বৃহত্তর ঐক্যের প্রতি সম্মান রাখা উচিত এই বোধোদয়ের মধ্য দিয়ে আগামী দিনে আমিরাতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের সমীকরণ পাল্টে যেতে পারে।
একইসাথে ইরানের সাথে দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে আব্রাহাম চুক্তির অংশ হয়ে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের সাথে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা ইত্যাদি বিষয়গুলো আমিরাত মেনে চলবে, নাকি এক্ষেত্রে তাদের নীতিতে পরিবর্তন আনবে সেটা ভাবনার বিষয় হলেও এখানে ভারতের উদাহরণ তাদের জন্য সহায়ক হতে পারে।
ভারত ব্রিকসের বৃহত্তর ঐক্যকে সমুন্নত রেখে বৈশ্বিক দক্ষিণের অধিকার আদায়ের বিষয়ে সোচ্চার থাকলেও দেশটির সাথে ইসরায়েলের ভালো কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। সুতরাং এটা ধরেই নেওয়া যায় যে এক্ষেত্রে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক থাকা না থাকা ব্রিকসে খুব একটা ছায়া ফেলবে না, বরং অন্যায্য আচরণের বিপরীতে গিয়ে নিজেদের সপক্ষে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য।
রাশিয়ার সাথে চীনের ‘সীমাহীন সুসম্পর্কের’ ধারাবাহিকতায় এবার চীন মনযোগী হয়েছে ভারতের সাথে তাদের দ্বিপাক্ষিক সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে শাণিত করতে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে ইরান ছাড়াও সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে চীন এবং রাশিয়ার উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ রয়েছে এবং তাদের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কও অনেকটা নিবিড়। এক্ষেত্রে এই সম্পর্ক ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রের ক্ষেত্রে যদি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে আসে, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ইতিমধ্যে ইরান যুদ্ধে জর্জরিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল ছাড়া আর কোনো মিত্রকে পাশে পাচ্ছে না।
ব্রিকসের এই যুদ্ধবিরোধী ভূমিকা এবং নতুন বিশ্বব্যবস্থার প্রতি অঙ্গীকার কার্যত যুক্তরাষ্ট্রকে একটা বার্তা দেওয়ার সামিল। এরপরও যদি যুক্তরাষ্ট্র তার নীতিতে অটল থাকে, তাহলে হয়তো ব্রিকসকে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থকে নিরাপদ রাখার জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপের দিকে যেতে হতে পারে।
সদস্যদেশগুলোর অনেকেই বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের চড়া শুল্কের চক্রে আবদ্ধ হচ্ছে। এক্ষেত্রে ১১ সদস্যের ব্রিকস বৈশ্বিক জনসংখ্যার ৪৯ শতাংশ, বৈশ্বিক জিডিপি’র ৪০ শতাংশ এবং বিশ্ববাণিজ্যের ২৬ শতাংশের অধিকারী হওয়ার পরও মার্কিন নীতিকেই আমলে নিয়ে থাকবে কি না এই প্রশ্নটি এবারের সম্মেলনে ঘুরে ফিরেই এসেছে, যা তাদের জন্য নতুন বোধোদয়ের সামিল বলে মনে করা যেতে পারে।
ড. ফরিদুল আলম : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
