তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হয়েও সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন খালেদা জিয়া

তিন দফায় দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন; দীর্ঘ সময় ছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। কিন্তু ক্ষমতার চাকচিক্য তাঁকে ছুঁতে পারেনি। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে। ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও তার জীবনযাপনে ছিল না জাঁকজমক বা আড়ম্বর। পোশাক, বাসভবন কিংবা দৈনন্দিন অভ্যাস— সবকিছুতেই ছিল সাধারণ মানুষের মতো থাকার চেষ্টা। ব্যক্তি খালেদা জিয়ার এই সহজাত সরলতাই তাকে আলাদা করে চেনায় মানুষের কাছে। ইতিহাস তাকে মূল্যায়ন করবে একজন নির্মোহ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে।
গত ৩০ ডিসেম্বর ভোরে সবাইকে শোকে ভাসিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান বাংলাদেশের প্রথম এই নারী প্রধানমন্ত্রী। তার মহাপ্রয়াণের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে দীর্ঘ ৪৩ বছরের এক বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের।
আরেকবার জেতা হলো না তিন আসনে
১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১— তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন খালেদা জিয়া। ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন তিনি। এ ছাড়া দুই মেয়াদে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনো কোনো আসনের নির্বাচনে পরাজয় বরণ করেননি। যত আসনে নির্বাচন করেছেন সবগুলোতে জিতেছেন বিপুল ব্যবধানে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও খালেদা জিয়া ফেনী-১, দিনাজপুর-২ ও বগুড়া-৭ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে জানিয়েছিল দল। সেই অনুযায়ী তার মনোনয়নপত্রও জমা দেওয়া হয়েছিল। তবে, নির্বাচনী লড়াইয়ের কিছুদিন আগেই সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে তিনি পাড়ি জমান না ফেরার দেশে। ফলে আরও একবার তিনটি আসনে তার জয় দেখল না বাংলাদেশ।
নির্বাচনে অংশ নেওয়া না হলেও, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া উপলক্ষ্যে নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনে হলফনামা দাখিল করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। সেই হলফনামায় উঠে আসে তার অর্থ-সম্পদের প্রতি নির্মোহ থাকার অসাধারণএক অনুকরণীয় চিত্র।
হলফনামায় দেখা যায়, আপসহীন নেত্রী বিএনপির এই প্রয়াত চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের আমলে গত ১৬ বছরে মোট ৩০টি মামলা হয়েছিল। এর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও তার বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা হয়। তবে, দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে এসব মামলার সবগুলোতে তিনি খালাস বা অব্যাহতি পান।
হলফনামা সূত্রে জানা গেছে, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা এসব মামলার সিংহভাগই ছিল ভাঙচুর, নাশকতা, সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগের।
সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক জীবনে নানাভাবে প্রতিহিংসার শিকার হয়েছিলেন। তাকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়েছে, এমনকি দীর্ঘদিনের স্মৃতিবিজড়িত নিজ বসতবাড়ি থেকেও তাকে উচ্ছেদ হতে হয়েছে।
তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, অথচ সম্পদ অর্জনে ছিলেন ‘অত্যন্ত সংযত’
নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামায় দেখা যায়, বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, বাণিজ্যিক স্থান ও অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তি থেকে ভাড়া বাবদ খালেদা জিয়ার বার্ষিক আয় ছিল ৯ লাখ টাকা। তার কাছে নগদ অর্থ ছিল ৭ লাখ ৪১ হাজার টাকা। বিভিন্ন ব্যাংকে জমা ছিল ১৩ কোটি ৯৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। সঞ্চয়পত্র ও স্থায়ী আমানত (ফিক্সড ডিপোজিট) বাবদ ছিল ৭ কোটি ৮৫ লাখ ১৪ হাজার ২২৯ টাকা।

বিএনপির চেয়ারপারসনের নামে ছিল দুটি গাড়ি। এর মধ্যে একটি নিসান জিপ, যার মূল্য ২২ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং একটি টয়োটা জিপ, যার মূল্য ১৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। তার কাছে ৫০ তোলা স্বর্ণ ছিল, যা তিনি উপহার হিসেবে পেয়েছেন। ৫০ হাজার টাকার ইলেকট্রনিক্স পণ্য এবং দুই লাখ ৬০ হাজার টাকার আসবাবপত্র ছিল তার। এ ছাড়া, খালেদা জিয়ার নামে ৮ শতাংশ কৃষি জমি রয়েছে, যার অর্জনকালীন মূল্য ৩ হাজার ৩০০ টাকা। এক শতাংশের কম আরেকটি জমি রয়েছে, যার অর্জনকালীন মূল্য ৯ হাজার টাকা।
হলফনামায় তিনি দুটি বাড়ির তথ্য উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে একটি বর্তমানে তার মালিকানায় নেই বলে উল্লেখ করা হয়। মালিকানায় থাকা ঢাকার ১৯৬ নম্বর গুলশান এভিনিউয়ের একটি বাড়ির ৩/১ অংশ তার, যেটির অর্জনকালীন মূল্য দেখানো হয়েছে ১০০ টাকা। অপরটি ঢাকা সেনানিবাস এলাকার বাড়ি, যা বর্তমানে তার মালিকানা ও দখলে নেই। এটির অর্জনকালীন মূল্য দেখানো হয়েছে ৫ টাকা।
তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর খালেদা জিয়া সেনানিবাসের ওই বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হন। বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তাকে সেই বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। তিনি ওই বাড়িতে দীর্ঘ ২৮ বছর বসবাস করেছিলেন। স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার বাড়িটি তার নামে বরাদ্দ দিয়েছিলেন।
হলফনামায় আরও বলা হয়, খালেদা জিয়ার সব স্থাবর সম্পত্তি— কৃষি জমি, স্পেস ও বাড়ির মোট অর্জনকালীন মূল্য ১২ হাজার ৪০৫ টাকা, আর বর্তমান আনুমানিক মূল্য ৫ কোটি টাকা। তার নামে উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যাংক ঋণ নেই, ব্যক্তিগত দেনা ছিল না। কেবল বাড়ি বাবদ ১৮ লাখ ২০ হাজার টাকা দেনা থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। সবমিলিয়ে খালেদা জিয়ার ঘোষিত সম্পদের বর্তমান আনুমানিক মূল্য মোট ২২ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

বিশ্লেষকদের মতে, সার্বিকভাবে হলফনামা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়— তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও খালেদা জিয়া সেভাবে তেমন ব্যক্তিগত সম্পদের মালিক ছিলেন না। এই হলফনামা কেবল একটি আইনি নথি নয় বরং এটি খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত জীবনধারা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক দলিল। ইতিহাসে এটি সেভাবেই বিবেচিত হবে।
তার ঘোষিত সম্পদের এই পরিমাণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সীমিত এবং সম্পদ অর্জনে তিনি বেশ ‘সংযত’ ছিলেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার হলফনামা পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট বোঝা যায় তিনি কতটা অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন। একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার সামান্য ইশারাই যথেষ্ট ছিল শত শত কোটি টাকার মালিক হওয়ার জন্য। অথচ এই মহীয়সী নারী মাত্র কয়েক কোটি টাকার সম্পদ নিয়ে জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন, যা তার নির্লোভ ও সাদাসিধে জীবনাচারেরই পরিচয় বহন করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অর্থের প্রতি তার এই নিরাসক্তি তাকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। যারা এতদিন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের নানা অভিযোগ তুলে হেয় করার চেষ্টা করেছেন, এই হলফনামার মাধ্যমে তাদের সেই দাবি ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে। আজ এটা স্পষ্ট যে, তিনি কতটা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছিলেন।’
যোগ্য সম্মান আর ভালোবাসা নিয়ে শেষ বিদায়
জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত খালেদা জিয়ার জানাজা ছিল তার বিপুল জনপ্রিয়তার আরেকটি প্রমাণ। সেখানে অংশ নিয়েছিল লাখ লাখ শোকার্ত মানুষ। রাজধানী ছাড়াও দেশের প্রতিটি জেলা থেকে আসা মানুষের ঢলে ঢাকার রাজপথ সেদিন এক জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক সহকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ রিকশাচালক— সবার চোখেই ছিল অশ্রু। ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও খালেদা জিয়ার অনাড়ম্বর জীবন যাপন এবং আপসহীন নেতৃত্ব তাকে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে দিয়েছে। এই অভাবনীয় জনস্রোত তার সেই ত্যাগেরই এক বড় স্বীকৃতি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা প্রতিকূলতা, কারাবরণ এবং বাড়ি থেকে উচ্ছেদের মতো ঘটনা বেগম জিয়াকে মানুষের হৃদয়ে আরও শক্ত জায়গা করে দিয়েছিল। জানাজায় উপস্থিত মানুষের এই বিশাল জমায়েত প্রমাণ করে, ক্ষমতা বা পদমর্যাদার চেয়েও তিনি জনগণের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। এই যে বিরল সম্মান ও ভালোবাসা নিয়ে তিনি বিদায় নিলেন, তা তার দীর্ঘ ৪৩ বছরের ত্যাগ ও সংগ্রামের যোগ্যতম প্রাপ্তি।

জানাজার দীর্ঘ সারি যখন মাইলের পর মাইল ছাড়িয়ে যাচ্ছিল, তখন উপস্থিত মানুষের কণ্ঠে একটি কথাই বারবার ধ্বনিত হয়েছে— ম্যাডাম যে সম্মান নিয়ে বিদায় নিচ্ছেন, তা তার প্রাপ্য ছিল। জীবনের শেষ বেলায় এসে তিনি শুধু একটি দলের নেত্রী নন বরং গোটা জাতির এক অভিভাবক হিসেবে চিরবিদায় নিলেন।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া যে সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে বিদায় নিয়েছেন, তা তার প্রাপ্য ছিল। এর প্রধান কারণ হলো—গণতন্ত্র, দেশের উন্নয়ন এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তিনি ছিলেন আপসহীন ও দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রাজনীতিতে তিনি নিজেকে একজন অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি দেশের একজন সর্বজনীন নেত্রী হিসেবে দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন। আমরা দোয়া করি, আল্লাহ যেন তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করেন।’
প্রসঙ্গত, বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গত ৩০ ডিসেম্বর ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যূর সময় তার শয্যাপাশে ছিলেন বড় ছেলে ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও পরিবারের সদস্যরা।
গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে আসা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল প্রায় ৪৩ বছরের। ১৯৮২ সালে রাজনীতিতে যোগ দেন তিনি। ১৯৮৪ সালের ১০ মে কাউন্সিলের মাধ্যমে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপি চেয়ারপাসন নির্বাচিত হন। এরপর থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
নব্বইয়ের দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ায় খালেদা জিয়াকে দেওয়া হয় আপসহীন নেত্রীর উপাধি। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ইতিহাস গড়েন।
এএইচআর/এমজে
