জামায়াতের ‘প্রথম জয়’ নাকি ২০ বছর পর বিএনপির ‘প্রত্যাবর্তন’?

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষণগণনা শুরু হতেই নির্বাচনী আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানীর রাজপথে। সারাদেশের মতো যাত্রাবাড়ী, ডেমরা ও কদমতলীর (আংশিক) একাংশ নিয়ে গঠিত ঢাকা-৫ আসনেও বইছে ভোটের হাওয়া।
এই আসনের প্রার্থীরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা ও গণসংযোগে; ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে চাইছেন সমর্থন ও ভোট।
নির্বাচনী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এ আসনে বেশ কয়েকজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ভোটের মূল লড়াইটা হবে মূলত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মধ্যে। তবে ভোটারদের মতে, মাঠের লড়াইয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীও বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। বড় দলগুলোর প্রার্থী পরিবর্তনের সমীকরণ আর আঞ্চলিক জনপ্রিয়তার ওপর ভিত্তি করে এই আসনে এবার ত্রিমুখী এক লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।.
ঢাকা-৫ আসনে ভোটার ৫ লাখ
ঢাকা-৫ আসনে প্রায় ৫ লাখ ভোটার রয়েছেন। যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, ধলপুর, গোলাপবাগ, নুরপুর, পাটেরবাগ, ইসলামবাগ, জনতাবাগ, স্মৃতিধারা, রায়েরবাগ, জনতাবাগ, দনিয়া, সরাই, রসুলপুর, কুতুবখালী, ছনটেক, শেখদী, গোবিন্দপুর, কাজলার পাড়, মাতুয়াইল, কোনাপাড়া, ডগাইর, মোমেনবাগ, রহমতপুর, মুসলিমনগর, মধুবাগ, খানবাড়ী, আদর্শবাগ, রায়েরবাগ, বামৈল, ডগাইর, সারুলিয়া— এসব এলাকা নিয়ে আসনটি গঠিত।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নানাভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন প্রার্থীরা। এই এলাকায় এখন নির্বাচনী আমেজ বিরাজ করছে।
আসন্ন নির্বাচনে ঢাকা-৫ আসনে মোট ১১ জন প্রার্থী চূড়ান্তভাবে ভোটের লড়াইয়ে নেমেছেন। তারা হলেন- বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মো. নবী উল্লা, জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ কামাল হোসেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. ইবরাহীম, গণঅধিকার পরিষদের সৈয়দ মোহাম্মদ ইব্রাহিম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির তোফাজ্জল হোসেন মোস্তফা, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের (মুক্তিজোট) মো. তাইফুর রহমান রাহী, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) শাহিনুর আক্তার সুমি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপির মো. হুমায়ূন কবির, জাতীয় পার্টি-জেপির মীর আব্দুস সবুর, বাংলাদেশ লেবার পার্টির মো. গোলাম আযম এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. সাইফুল আলম।
প্রতীকের চেয়ে এলাকার উন্নয়নই এখন বড় ইস্যু
যাত্রাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা নাসের হোসাইন বলেন, “এই আসনে বেশ কয়েকজন প্রার্থী থাকলেও বিএনপি ও জামায়াত মনোনীত প্রার্থীর প্রচারণা ও গণসংযোগ সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে। তাই মনে হচ্ছে, মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই দুই প্রার্থীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীও বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন বলে আমার ধারণা।”

মাতুয়াইলের বাসিন্দা রহমত হোসেন তার এলাকার দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে বলেন, “আমাদের এলাকায় সমস্যার শেষ নেই। রাস্তাঘাটের বেহাল দশা আর জলাবদ্ধতার কারণে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। তাই এবার কোনো প্রতীক দেখে নয়, বরং যিনি এই সমস্যাগুলো সমাধানে আন্তরিকভাবে কাজ করবেন, তাকেই আমরা ভোট দেব।”
তিনি আরও যোগ করেন, “প্রার্থীরা নির্বাচনের আগে অনেক বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু ভোটের পর সেগুলো কতটুকু বাস্তবায়ন হয়, সেটিই দেখার বিষয়। আমরা এবার প্রতিশ্রুতির চেয়ে কাজের প্রতিফলন বেশি দেখতে চাই। এলাকার টেকসই উন্নয়নই প্রধান দাবি।”
আসন পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপি
স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত এই আসনে ঘুরেফিরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। সর্বশেষ ২০০১ সালে ঢাকা-৫ আসনে ধানের শীষের টিকিটে জয় পেয়েছিলেন বিএনপি নেতা কামরুল ইসলাম। এরপর থেকে দলটি আর এই আসনে জয়ের দেখা পায়নি। দীর্ঘ দুই দশক (২০ বছর) পর নিজেদের এই দুর্গ পুনরুদ্ধারে এবার মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছে বিএনপি।

ঢাকা-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক নবী উল্লাহ। তিনি নির্বাচনী এলাকায় ধারাবাহিক প্রচার-প্রচারণা ও গণসংযোগ করছেন। স্থানীর নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে সাধারণ ভোটারদের কাছে ভোট চাচ্ছেন।
নবী উল্লাহ নবী ঢাকা পোস্টকে বলেন, “আমি দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে স্থানীয় রাজনীতি করে আসছি। আমি একা বের হলেও হাজার হাজার মানুষ আমার সঙ্গে নির্বাচনী মাঠে নামে। বর্তমানে আমি ঘরে ঘরে গিয়ে গণসংযোগ ও প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছি এবং সাধারণ মানুষের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। মানুষ একটি বড় পরিবর্তন চেয়েছিল, তাই আমি যতটা প্রত্যাশা করেছি, তার চেয়েও বেশি সমর্থন পাচ্ছি।”
এলাকার বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, “স্বাধীনতার পর থেকে এই আসনে কোনো সরকারি হাসপাতাল বা আধুনিক খেলার মাঠ নির্মিত হয়নি। এখানে সরকারি কোনো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় নেই, এমনকি ওয়ার্ডভিত্তিক কোনো কমিউনিটি সেন্টারও নেই। রাস্তাঘাটের তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি; সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এলাকার মানুষ সব ধরনের নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। মনে হয় যেন এই এলাকার কোনো অভিভাবক নেই, এটি বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।”
নবী উল্লাহ নবী আরও বলেন, “নির্বাচিত হলে আমাকে ‘জিরো থেকে হিরো’র মতো সব কাজ শুরু করতে হবে। যাত্রাবাড়ী হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে ফুলের বাগান হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে সেখানে মানুষ মলমূত্র ত্যাগ করছে। ফ্লাইওভার নির্মাণকারী কোম্পানিটি সম্ভবত কৌশলগত কারণে নিচের রাস্তা ঠিক করে না, যাতে মানুষ বাধ্য হয়ে উপরে গাড়ি তোলে। আমি নির্বাচিত হলে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, খেলার মাঠ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি গ্যাস সংকট ও জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করব ইনশাআল্লাহ।”

জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “এই আসনের মানুষ আমাকে ভালোবাসে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে আমি ৭০ হাজার ভোট পেয়েছিলাম, যা সেই সময়ের প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সারাদেশের বিএনপি প্রার্থীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল। এবার যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, তবে মোট ৫ লাখ ভোটের মধ্যে আমি সাড়ে তিন লাখেরও বেশি ভোট পাব বলে বিশ্বাস করি। ইনশাআল্লাহ, আমিই জয়যুক্ত হব।”
প্রথমবারের মতো আসন জয়ের স্বপ্ন দেখছে জামায়াত
ঢাকা-৫ আসনে এবার বড় চমক দেখাতে চায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। প্রথমবারের মতো এই আসনে জয়ের লক্ষ্যে ১১টি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মোহাম্মদ কামাল হোসেন। তিনি ও তার দলের নেতাকর্মীরা নিয়মিত গণসংযোগ ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন।

মোহাম্মদ কামাল হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, “আমি প্রার্থী হওয়ার আগে থেকেই জনস্বার্থ রক্ষায় কাজ করে আসছি। জুলাই বিপ্লবের সময় আমাদের এই এলাকার মানুষের ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল। আমার কাছে ৭৮ জন শহীদের এবং ১৫৪ জন আহতের তালিকা আছে। আমরা প্রতিটি শহীদ পরিবারকে দুই লাখ টাকা করে সহায়তা দিয়েছি এবং আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি। জনগণের সঙ্গে মিশে এবং সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে আমি অভাবনীয় সাড়া পাচ্ছি।”
তিনি আরও বলেন, “জুলাই বিপ্লবের শহীদদের আকাঙ্ক্ষা এবং নতুন বাংলাদেশ গড়তে জনগণ এবার সৎ, যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্ব বেছে নেবে বলে আমার বিশ্বাস। ঢাকা-৫ আসনের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এখানে পর্যাপ্ত সরকারি হাসপাতাল, কলেজ ও খেলার মাঠ নেই। রাস্তাঘাট অপ্রশস্ত এবং জলাবদ্ধতা এখানকার নিত্যদিনের সমস্যা। নির্বাচিত হলে এসব সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি এলাকাকে চাঁদাবাজিমুক্ত করতে কঠোর ভূমিকা রাখব।”
জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “জনগণ এখন আদর্শিক পরিবর্তন চায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেভাবে পরিবর্তন এসেছে, এই আসনেও তেমনটি ঘটবে। ইনশাআল্লাহ, বিপুল জনসমর্থন নিয়ে এবার ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক বিজয়ী হবে। আমি জয়ের ব্যাপারে পুরোপুরি আশাবাদী।”

প্রচারণা চালাচ্ছেন অন্য প্রার্থীরাও
বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ছাড়াও অন্যান্য প্রার্থীরাও এই আসনে প্রচার-প্রচারণা ও গণসংযোগ করছেন। এর মধ্যে নির্বাচনে শক্ত অবস্থানে আছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. ইবরাহীম। তিনিও নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা ও গণসংযোগ চালাচ্ছেন।
এ বিষয়ে কথা বলতে তাকে একাধিকবার কল দিলেও ধরেননি তিনি।
এ ছাড়া, গণঅধিকার পরিষদের সৈয়দ মোহাম্মদ ইব্রাহিম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির তোফাজ্জল হোসেন মোস্তফা, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের (মুক্তিজোট) মো. তাইফুর রহমান রাহী, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) শাহিনুর আক্তার সুমি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপির মো. হুমায়ূন কবির, জাতীয় পার্টি-জেপির মীর আব্দুস সবুর, বাংলাদেশ লেবার পার্টির মো. গোলাম আযম এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. সাইফুল আলমও নানাভাবে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন।
এসএইচআর/এমজে
