নতুন-পুরোনোর লড়াইয়ে ছড়াচ্ছে উত্তাপ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র কয়েকদিন। ভোটের এ আবহে ঢাকা-৮ আসনে চলছে জোর প্রচার-প্রচারণা। পোস্টার-ব্যানার, মাইকিং আর গণসংযোগে সরব নির্বাচনী মাঠ। প্রতীক নিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটছেন প্রার্থীরা, শোনাচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতির কথা। বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াত জোটের দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে এ আসনে ভোটের আমেজ আরও বেড়েছে। প্রতিনিয়ত অভিযোগের তীরও ছুড়ছেন একে অপরের দিকে, যা এ আসনকে সারা দেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। তবে প্রার্থীদের এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ভোটাররা।
অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র মতিঝিল, যেখানে লেনদেন হয় হাজারও কোটি টাকার; দাবি আদায়ের তীর্থভূমি পল্টন, যা ক্ষোভে-উল্লাসে বারবার বদলে দিয়েছে দেশের রাজনৈতিক গতিপথ– শক্তিশালী দুই মেরুর ঠিক মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়। এই তিন শক্তির কৌশলগত মিলনস্থলই হলো ঢাকা-৮ সংসদীয় আসন। এ আসনকে শুধু একটি নির্বাচনী এলাকা বলা ভুল, কারণ এটি যেন দেশের অর্থনৈতিক গতিপথ আর রাজনীতির স্পন্দন নির্ধারণের ‘কন্ট্রোল রুম’।
ভোট এলেই ঢাকা-৮ আসনে দেশের সব মহলের আলাদা নজর থাকে। কারণ এখানকার ভোটারদের মুহূর্তের সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে জাতীয় রাজনীতির দৃশ্যপট। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট ঘিরে বরাবরের মতোই এ আসনে তৈরি হয়েছে অন্যরকম এক আবহ। অলিগলিতে চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সব জায়গায় চলছে প্রার্থীদের সমর্থকদের তীব্র বাক্য বিনিময়।

এবারের নির্বাচনে বৈধতা পেয়ে ঢাকা-৮ আসনে ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন ১১ প্রার্থী। এর মধ্যে ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ আর জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী লড়ছেন শাপলা কলি প্রতীকে। লাঙ্গল নিয়ে মাঠে রয়েছেন জাতীয় পার্টির মো. জুবের আলম খান।
এ ছাড়া গণঅধিকার পরিষদ থেকে ট্রাক প্রতীকে সকাল-সন্ধ্যায় প্রার্থীদের কাছে ভিড়ছেন আলোচিত মডেল মেঘনা আলম আর হাতপাখা নিয়ে আশার বাণী শোনাচ্ছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেফায়েত উল্লাহ। প্রার্থী হিসেবে এ আসনে আরও রয়েছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির ত্রিদীপ কুমার সাহা, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের রাসেল কবির, জাসদের এএফএম ইসমাইল চৌধুরী, সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) রফিকুজ্জামান আকন্দ ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের এসএম সরওয়ার।
ছোট-বড় রাজনৈতিক দলের একাধিক প্রার্থী থাকলেও মূল লড়াই চলছে বিএনপি ও জামায়াত জোটের প্রার্থীর মধ্যে। যদিও হৃদয়বিদারক এক ঘটনায় মাস দেড়েক আগে খানিকটা জৌলুস হারিয়েছিল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-৮ আসনের নির্বাচনী মাঠ। ঘাতকের গুলিতে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি শহীদ হলে ভোটারদের উত্তেজনা অনেকটা থেমে যায়। তবে শহীদ হাদির দেখানো পথ ধরে এখানকার ভোটারদের সামনে হাজির হন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। এ আসনে আগে থেকেই কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। প্রার্থিতার বৈধতা আর দলীয় প্রতীক পেয়ে এখন দুজনই নিজেদের শক্তি জানান দিতে চাইছেন ভোটারদের কাছে।

নির্বাচনী গণসংযোগে নেমে প্রায় প্রতিদিনই পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিচ্ছেন এই দুই প্রার্থী। নির্বাচনী পথসভায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে ডিম, ময়লা পানি ছোড়াসহ বাধা দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন এনসিপির নাসীরুদ্দীন। এমনকি মির্জা আব্বাসের নামে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দলের কাছে নালিশও দিয়েছেন তিনি। ভয় দেখিয়ে নির্বাচন থেকে সরানোর চেষ্টা চলছে বলে দাবি নতুন রাজনৈতিক দলের এ নেতার। যদিও এসবে তেমন কান দিচ্ছেন না মির্জা আব্বাস। তার মতে, অতীতে এর চেয়েও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। তবুও কেউ কারো বিরুদ্ধে বিষোদগার করেননি। নির্বাচনী মাঠে নতুনদের স্বাগতও জানিয়েছেন বিএনপির এই হেভিওয়েট প্রার্থী।
মাঠে দারুণ শক্তিতে মির্জা আব্বাস
নির্বাচন কমিশন গেল ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই চূড়ান্ত গন্তব্যের দিকে ছুটতে শুরু করে নির্বাচনী ট্রেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দিন নিজেদের জয় ছিনিয়ে আনতে আঁটঘাট বেঁধে মাঠে রয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বী সব পক্ষ। তবে ‘সাবেক সংসদ সদস্য’ পরিচয়ের সুবাদে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোট পাওয়ার আশা করছেন মির্জা আব্বাসের কর্মী-সমর্থকরা। বড় ব্যবধানে জয়ী হবেন বলেও প্রত্যাশা অনেকের।
এবারের নির্বাচনে তুলনামূলক নীরবে জনসম্পৃক্ততা বাড়াচ্ছেন ধানের শীষের সমর্থকরা। পছন্দের প্রতীককে জেতাতে অবলম্বন করছেন ভিন্ন কৌশল। স্থানীয় সমস্যা চিহ্নিত করে বাসায় গিয়ে সরাসরি ভোটারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করছেন তারা, এক্ষেত্রে বসে নেই নারী সমর্থকরাও। আবার মতিঝিল-পল্টনের মানুষ শুধু উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি শুনতে চান না বলে যুক্তি কর্মী-সমর্থকদের। তারা ভাষ্য, ভোটাররা চান এলাকার দীর্ঘদিনের যানজট, জলজট আর নাগরিক ভোগান্তির স্থায়ী সমাধান। মির্জা আব্বাস এই এলাকার নাড়ি-নক্ষত্র চেনেন বলে সেসব বার্তা তারা পৌঁছে দিচ্ছেন সাধারণ মানুষের কাছে।

অন্য আসনের মতো ঢাকা-৮ আসনেও বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটি করা হয়েছে। কমিটির প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে রয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শ্রমিক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিদ্দিকুর রহমান মিন্টু। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, ঢাকা-৮ আসনের রূপকার হলেন মির্জা আব্বাস। অবকাঠামোগত উন্নয়নের সর্বত্রই তার হাতের ছোঁয়া রয়েছে। এজন্যই তাকে গ্রহণ করছেন সব শ্রেণিপেশার ভোটাররা। তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হবেন বলে আমরা আশাবাদী।
নির্বাচনী প্রচারে কেমন সাড়া মিলছে– জানতে চাইলে মিন্টু বলেন, মির্জা আব্বাসের ইমেজ বেশ ভালো। বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। ভোটারদের মধ্যে আমরা ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। ১২ ফেব্রুয়ারি ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিতে অধীর আগ্রহে বসে আছেন ভোটাররা। এক কথায় তারা উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যে রয়েছেন।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর অভিযোগ নিয়ে তিনি বলেন, আমরা শালীন ভাষায় প্রচার চালিয়ে যাচ্ছি। মা-বোনদের কাছে আমাদের নারীরা যাচ্ছেন। এ ছাড়া মির্জা আব্বাস সবসময়ই গরিব-দুঃখীসহ সব ধরনের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বহু মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তার কোনো খারাপ রেকর্ড নেই। তবে ভোটের মাঠে অভিযোগ-অনুযোগ থাকা স্বাভাবিক। নিরপেক্ষ ভোটের জন্য এটা প্রয়োজন।

ভোটের মাঠের উত্তাপ
নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ঢাকা-৮ আসন। কারণ প্রচারণা শেষে ফেরার পথে দুষ্কৃতকারীর অতর্কিত হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে সাত দিন লড়ে শেষে পৃথিবী ছাড়তে হয়েছিল এ আসনের সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে। এরপর তার জায়গায় ভোটের মাঠে নামেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। জামায়াত-এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী তিনি। জোটবদ্ধ হওয়ায় আসনটি তাকে ছেড়ে দেন জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমির ড. হেলাল উদ্দিন।
চব্বিশের জুলাই গণঅভুত্থান ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিতি পেলেও ভোটারদের কাছে নতুন মুখ নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। ওসমান হাদির মৃত্যুর পর তিনি ভোটের মাঠে নামতেই ফের বাড়তে থাকে রাজনৈতিক উত্তাপ। সম্প্রতি তার নির্বাচনী প্রচারণায় হামলাসহ একাধিক অভিযোগ উঠেছে। আর এ নিয়ে চলছে পাল্টাপাল্টি দোষারোপ।
ভোটের প্রচারসহ সার্বিক বিষয়ে জানতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সঙ্গে একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের এক নেতা বলেন, ঢাকা-৮ আসনের ভোটের মাঠ আমরা আগেই গুছিয়ে রেখেছি। দিনরাত পরিশ্রম করেছেন ড. হেলাল উদ্দিন। জোটের সিদ্ধান্তে তিনি সরে গেলেও সাংগঠনিক শক্তি আগের মতোই রয়েছে। ভোটাররাও নতুন কাউকে দেখতে চান। সেই হিসাবে জোটের প্রার্থী শাপলা কলিই এবারের নির্বাচনে জিতে আসবে বলে আশা করছি। কারণ তরুণদের অনেকেই এনসিপিকে চাইছেন।

যা বলছেন ভোটাররা
পল্টন মোড়ে একটি চায়ের দোকানে কথা হয় আজাদ, মিজানসহ কয়েকজন ভোটারের সঙ্গে। তাদের মতে, ঢাকা-৮ আসনে মির্জা আব্বাসই বেশ পরিচিত। দীর্ঘদিন একই এলাকায় রাজনীতি করায় অন্য প্রার্থীদের তুলনায় তাকেই বেশি চেনেন তারা। যদিও এবারের নির্বাচনে অন্য দলের প্রার্থীর পোস্টার-ব্যানারও চোখে পড়ার মতো। এর মধ্যে রাজনৈতিক মঞ্চে বা পথসভায় কথার কারণে মির্জা আব্বাসের পর আলোচনায় এসেছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তবে ভোটব্যাংকের দিক থেকে বিএনপিই এ আসনে এগিয়ে রয়েছে বলে ধারণা তাদের।
স্থানীয় ভোটার নয়াপল্টন এলাকার বাসিন্দা ফারুক বলেন, এ আসন থেকে স্বতন্ত্র হিসেবে ভোটে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের শরিফ ওসমান হাদি। তার মৃত্যুর পর এসেছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, যিনি শুরুতে ছিলেন না। জামায়াত থেকে নির্বাচন করার কথা ছিল একজনের। তিনি প্রচার-প্রচারণাও চালিয়েছেন। কিন্তু জোটে আসায় নাসীরুদ্দীনকে ছেড়ে দিতে হয়েছে। কিন্তু এনসিপির প্রার্থীকে অনেকেই চেনেন না। ইদানিং প্রচারণায় তার পরিচয় কিছুটা বেড়েছে। বিশেষ করে চাঁদাবাজদের নিয়ে তার কিছু বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক ভাইরালের পর কেউ কেউ তার পক্ষ নিচ্ছেন। তবে জয়-পরাজয়ের হিসাবনিকাশ ভোটের দিনই বোঝা যাবে।

ভোটারদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ভোট দিতে পারেননি তারা। এজন্য প্রত্যেকেই নিজের পছন্দের প্রার্থীকে জেতাতে ভোট দেবেন। এ ছাড়া প্রার্থীদের কথার লড়াইয়েই নির্বাচনী পরিবেশ জমে ওঠে। ঢাকা-৮ আসনও ব্যতিক্রম নই। এখানে একাধিক প্রার্থী থাকলেও হাড্ডাহাড্ডি লড়াই ধানের শীষের সঙ্গে শাপলা কলির চলছে। তাদের এ লড়াইয়ে ভোটারদের মধ্যেও উৎসাহ বেড়েছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-৮ আসনে মোট ভোটার ২ লাখ ৭৫ হাজার ৪৭১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫২ হাজার ৭৯৫ ও নারী ভোটার ১ লাখ ২২ হজার ৬৭৫ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন একজন।
এমআরআর/এএসএস/এসএসএইচ

