ভারতের তৈরি ম্যালওয়্যার বঙ্গভবনের মেইলের মাধ্যমে ছড়ানো হয়

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী ডামাডোল যখন তুঙ্গে, তখন একের পর এক সাইবার হামলা ও হ্যাকিংয়ের শিকার হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। এমনটাই অভিযোগ করেছেন দলটির কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা এবং দলীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য প্রকৌশলী মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম।
তিনি বলেছেন, গত ৩১ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের শিকার হয়। সেখানে নারীদের নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট করা হয়। সেটি আবার ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদের ফেসবুক পেজ হ্যাক করে শেয়ার করা হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি বুঝতে পেরে দ্রুত সেটি রিকভার করে এবং পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করে নিয়ন্ত্রণে নেয় জামায়াতে ইসলামীর এক্সপার্ট টিম।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) রাতে রাজধানীর মগবাজারে দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সিরাজুল ইসলাম।
তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে বিএনপিসহ জামায়াতবিরোধী পক্ষ থেকে ব্যাপক হারে প্রচার করে সমালোচনা করা হয়েছে। জামায়াতবিরোধী প্রচারণায় যখন এটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তখন আবারও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে জামায়াত আমিরের সেই পোস্টকে সাফাই গেয়ে আজ রাতে পোস্ট করা হয়। বিষয়টি বোঝার পর আজ আবারও অ্যানাউন্সমেন্ট জারি করে হ্যাকিংয়ের কথা জানায় জামায়াতে ইসলামী। তবে এবার শুধু জিডি নয়, সাইবার আইনে মামলা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, গত ৩১ জানুয়ারি বিকেলে জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছিল। আমরা সেটি সমাধান করার চেষ্টা করেছিলাম।
‘অফিসিয়াল মেইল অ্যাড্রেসের মাধ্যমে ম্যালওয়্যার এসেছিল ([email protected]) থেকে। ওই মেইল থেকে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মেইলে বার্তা আসে। সিসিতে আরও বেশ কয়েকটি আইডি দেওয়া ছিল এবং এর পাশাপাশি আলাদাভাবে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের মেইলেও এসেছিল। জানতে পেরেছি আরও বেশ কিছু জায়গায় এই মেইলটি এসেছে এবং ইতোমধ্যে অনেকগুলো ডিভাইস তাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে আছে। আমরা জানি না তারা কতগুলো ডিভাইস নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। বিষয়টি আমরা সরকারকে জানিয়েছি।’
তিনি বলেন, আমরা প্রত্যাশা করতে চাই, তারাই এই তালিকাটি করুক যে কতগুলো ডিভাইস তারা অবৈধভাবে অনুপ্রবেশকারী (ইন্ট্রুডার) হিসেবে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।
প্রকৌশলী মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, আজকে জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পোস্ট করা হয়েছে। আমিরে জামায়াতের অ্যাকাউন্ট থেকে যে পোস্টটি করা হয়েছিল, সেটিরই একটি মনগড়া ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে তারা এখানে রাত ৮টা ৩১ মিনিটে পোস্ট করেছে। ওই অনাকাঙ্ক্ষিত পোস্টটি আমরা সোয়া ৯টার দিকে টের পাই। সাড়ে ৯টার মধ্যেই অ্যাকশন নেওয়ার মাধ্যমে সেটি ডিলিট করেছি। একই সাথে আমরা ১১টার পর এনাউন্সমেন্ট দিয়েছি।
তিনি বলেন, এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে যে পোস্ট দেওয়া হয়েছিল, সেটি আমাদের কোনো কথা বা বক্তব্য নয়। হ্যাকাররা আগের দিনের মতোই একইভাবে এখানে তাদের নিজেদের কথা পেশ করেছে। এটি একটি সম্পূর্ণ অবৈধ কাজ।
জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাকের ঘটনার ল্যাব রিপোর্টের বরাতে প্রকৌশলী মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমরা ডিপ ফরেনসিক অ্যানালাইসিস রিপোর্ট সংগ্রহ করেছি। সেখান থেকে দেখতে পেয়েছি, প্রথম অরিজিন মেইল বক্স হচ্ছে bcc.gov.bd। সেখান থেকে এটি ইন্ট্রোডিউস হয়েছে। অর্থাৎ সার্ভার আসলে bangabhaban.gov.bd-তে রাখা, সেখান থেকেই এটি এসেছে বলে আমরা প্রমাণ পেলাম। এটি বিভিন্ন পর্যায় ঘুরে ফাইনালি রিসিপিয়েন্টের কাছে এসেছে।
ফিশিং ম্যালওয়্যার সম্পর্কে সিরাজুল ইসলাম বলেন, যে ম্যালওয়্যার ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি বিশ্লেষণ করে আমরা পেয়েছি যে এই ম্যালওয়্যার তৈরি হয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশ ইন্ডিয়ায়। অর্থাৎ তারা এই ম্যালওয়্যারটি ইন্ট্রোডিউস করেছে এবং পরবর্তীতে এটি আমাদের দেশে এসেছে।
সাইবার হামলা প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি বলেন, এভাবে জামায়াতে ইসলামীর যে জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছে তা রোখা যাবে না। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নারীদের সম্মান, নিরাপত্তা ও নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী। ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে তা জামায়াতের ওপর চাপানো কোনোভাবেই সমীচীন নয়, এটি দেশের মানুষ বুঝে গেছে। তাদের এই অপপ্রয়াসগুলো মানুষ আমলে নেবে না এবং এসব অপপ্রয়াস ধোপে টিকবে না।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বঙ্গভবনের সরকারি অফিসিয়াল মেইল থেকে এটি পাঠানো হয়েছে। সেটির ব্যাপারে তদন্ত করার জন্য তারা আমাদের কথা দিয়েছেন। বঙ্গভবন থেকে তদন্ত করা হচ্ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে তা জানাতে অনুরোধ করেছি।

এত বড় একটি সংগঠন সোশ্যাল মিডিয়া হ্যাকিং ঠেকাতে পারছে না, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশের সাইবার সিকিউরিটি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন— জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা অল্প সময়ের মধ্যে হ্যাকিং ও হামলা ঠেকাতে পেরেছি। অল্প সময়ে আইডেন্টিফাই করে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছি, তদন্ত করেছি এবং পুরো অবস্থাটি জানিয়েছি। এটি আমাদের সক্ষমতার একটি প্রমাণ দেয়। একই সাথে সরকারি দপ্তরে বসে যারা এই কাজগুলো করছেন, তারা অন্যায় করছেন।
তিনি বলেন, আমরা সেই সরকার গঠন করতে চাই, যে সরকার গঠন করলে এই জাতীয় অন্যায় কার্যক্রম হবে না। সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এসব সিস্টেমকে অসৎ উদ্দেশ্যে কোনোভাবেই ব্যবহার করা হবে না।
আরেক প্রশ্নের জবাবে সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত সেক্রেটারি জেনারেলের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার বিষয়টি ইনভেস্টিগেশনের মধ্যে রেখেছি। খুব দ্রুততার সাথে ইনশাআল্লাহ সেটি বের করে ফেলতে পারব। অল্প সময়ের মধ্যে তা বের করা কঠিন। আমরা যা জানাব, তা দায়িত্ব নিয়ে জানাতে চাই। আন্দাজের ওপর আমরা কোনো কিছু বলতে চাই না।
ভারতের সংশ্লিষ্টতা কিংবা রাজনৈতিক কোনো দলের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে কি না— জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে মনে করছি। কারণ জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার পর আপনারা দেখেছেন নানাবিধ চক্রান্তমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। একটি নির্দিষ্ট দলের কর্মীবাহিনী অপতৎপরতা চালাচ্ছে।
তিনি জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের লড়াই আদর্শ দিয়ে করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আপনারা পলিসির বিষয়ে ডিবেট করতে চান। আমিরে জামায়াত পলিসি ডিবেটের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রয়োজনে সেখানে আসুন। কিন্তু এই জাতীয় চোরাই পথে হামলা করে আমাদের সাথে আদর্শের লড়াইয়ে আপনারা টিকে থাকতে পারবেন না। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সেটি ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। এখন তারাই জামায়াতের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তাদের ছাত্র সংগঠনের অবস্থা ছাত্র সংসদে ভোটের পরিমাণে প্রমাণিত হয়েছে। একই পথে যদি এই জাতীয় ম্যালপ্র্যাকটিসের মাধ্যমে চলেন এবং শিক্ষা গ্রহণ না করেন, তবে আগামী নির্বাচনে আপনাদের অবস্থা কী হবে তা দেখার জন্য জাতি অপেক্ষা করছে। চব্বিশের জুলাই-পরবর্তীতে দেশের মানুষের মনস্তত্ত্ব পরিবর্তন হয়ে গেছে। মানুষ এখন পজিটিভ রাজনীতি দেখতে চায়, নেগেটিভ রাজনীতি নয়।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সাংবাদিক ওলিউল্লাহ নোমান ও ব্যারিস্টার সাইফুদ্দিন খালেদ।
জেইউ/এমজে