ক্ষমতা ভোগ নয়, আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার জন্য রাজনীতি করি : মামুনুল হক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিকশা প্রতীকে ভোট এবং প্রস্তাবিত গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। তিনি বলেছেন, আমার রাজনীতি ক্ষমতা ভোগের জন্য নয়। এটা আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতা আর জনগণের আমানত রক্ষার রাজনীতি।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে মাওলানা মামুনুল হক এসব কথা বলেন। বক্তব্যে তিনি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্র সংস্কার, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও ইসলামী সুশাসনভিত্তিক একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক রূপরেখা তুলে ধরেন।
বক্তব্যের শুরুতেই মাওলানা মামুনুল হক ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শহীদ, শাপলা চত্বরের নিহতরা এবং ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, এই আত্মত্যাগ কোনো আনুষ্ঠানিক স্মরণে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় নৈতিক দায়বদ্ধতার ভিত্তি।
তিনি বলেন, এবারের লড়াই কেবল ক্ষমতা বদলের নয়, বরং রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক পুনর্গঠনের। কারণ সরকার বদলালেই জনগণের মুক্তি আসে না, আসে তখনই, যখন লুটপাট ও দমননির্ভর সিস্টেম ভেঙে ফেলা যায়। তিনি ১৯৪৭ সালের দেশভাগের প্রেক্ষাপট টেনে বলেন, ইসলামী সুশাসন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন থেকেই সেই ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়েছিল।
বর্তমান রাষ্ট্র কাঠামোর তীব্র সমালোচনা করে খেলাফত মজলিসের আমির বলেন, গত ১৬ বছরে উন্নয়নের প্রচারের আড়ালে একটি দমনমূলক ও দুর্নীতিনির্ভর ব্যবস্থা কায়েম হয়েছে। সমস্যার মূল কোনো একক সরকার নয়, বরং একটি লুটেরা ও অনিয়মপ্রসূত সিস্টেম।
এই বাস্তবতায় তিনি ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর প্রণীত ‘জুলাই সনদ’-কে রাষ্ট্র সংস্কারের বাস্তব ভিত্তি হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, সনদের সব বিষয়ের সঙ্গে তার শতভাগ ঐকমত্য নেই, তবে বর্তমান সংকটে এর চেয়ে কার্যকর বিকল্প নেই। তাই আসন্ন গণভোটে জনগণকে স্পষ্টভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে তিনি প্রস্তাব করেন ‘এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টিধারী কর্মসূচি’, যার মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের অন্তত একজনের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার কথা বলেন। তার মতে, উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে তরুণ উদ্যোক্তা ও শ্রমজীবী মানুষ।
তিনি আরও বলেন, কৃষকের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া হবে, পণ্য ও সেবায় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করা হবে এবং কৃষি উপকরণে ভর্তুকি এবং শ্রমিকদের জন্য ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা হবে। বাজার নিয়ন্ত্রণ আর শ্রমের মর্যাদা ছাড়া অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার সম্ভব নয়।
প্রবাসীদের তিনি ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ অভিহিত করে বলেন, রাষ্ট্র তাদের অবদানকে যথাযথভাবে সম্মান দেয়নি। খেলাফত মজলিস ক্ষমতায় গেলে প্রবাসীদের জন্য ডিজিটাল সেবা কাঠামো, বিমানবন্দরে হয়রানি বন্ধ এবং বিনা সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা হবে।
নারীদের বিষয়ে তিনি বলেন, ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করাই আমার রাজনৈতিক অঙ্গীকার। কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ ও পৃথক পরিবেশ, পাশাপাশি সম্পত্তিতে নারীর ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।
রাষ্ট্র পরিচালনায় কোরআন ও সুন্নাহকে সর্বোচ্চ নির্দেশনা হিসেবে প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়ে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, নৈতিকতা ছাড়া শিক্ষা আর ন্যায়বিচার ছাড়া রাষ্ট্র টেকসই হয় না। তার ঘোষণায় রয়েছে—কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার মানোন্নয়নে স্বায়ত্তশাসিত কওমি শিক্ষা মঞ্জুরি কমিশন গঠন এবং শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সমন্বয়।
তিনি জানান, ১১ দলীয় নির্বাচনী সমঝোতার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সারাদেশে ২৬টি আসনে ‘রিকশা’ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। অন্যান্য আসনে তারা জোটের শরিক দলগুলোকে সমর্থন দেবে। ২২ দফার ইশতেহার কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং একটি ঈমানী দায়িত্ব।
সবশেষে তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ভয় নয়, ইনসাফ বেছে নিন। আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের পথে হাঁটুন এবং জাতীয় নির্বাচনে ‘রিকশা’ প্রতীকে ভোট দিয়ে বাংলাদেশকে তার প্রকৃত মালিক জনগণের হাতে ফিরিয়ে দিন।
টিআই/এমজে