তারেক রহমান, শফিকুর রহমানসহ সংসদে নতুন মুখ যারা

বিগত কোনো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হননি—এমন দেড় শতাধিক নতুন মুখ নিয়ে গঠিত হতে যাচ্ছে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় থাকা বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও এবারই প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। শুধু তাই নয়, বিরোধী দলে যেতে যাওয়া জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানও প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রথমবার সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিতদের সংখ্যা সরকার গঠন করতে যাওয়া বিএনপিতেই সবচেয়ে বেশি। দলটির প্রায় ৭১ জন প্রার্থী এবার প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে সারাদেশে জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত ৬৮ জনের মধ্যে ৩ জন ছাড়া বাকি ৬৫ জনই প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়েছেন।
বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর বাইরে আরও পাঁচটি দল রয়েছে, যাদের কোনো প্রতিনিধিই আগে সংসদ সদস্য ছিলেন না। এবার প্রথমবারের মতো এসব দলের জনপ্রতিনিধিরা সংসদে প্রবেশ করছেন। এর মধ্যে ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টির ৬ জন, খেলাফত মজলিসের ২ জন, গণসংহতি আন্দোলনের ১ জন, ইসলামী আন্দোলনের ১ জন এবং এনডিএমের ১ জন প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। তবে এনডিএমের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ সংসদ নির্বাচনের আগে নিজ দল থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেন এবং ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি সংসদে দেড় শতাধিক নতুন মুখ—অর্থাৎ প্রথমবারের মতো নির্বাচিত সংসদ সদস্য—থাকা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দিক। বিগত সময়ে বহু সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপরাধ ও অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। তবে তারা আশা করছেন, নতুনদের আগমনে পুরোনোদের সৃষ্ট যে দুর্নাম, তা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে। নতুন সদস্যরা ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দেবেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার ঢাকা পোস্টকে বলেন, এত বেশি নতুন মুখ থাকা অবশ্যই ইতিবাচক দিক। কারণ আমাদের বিগত সংসদ সদস্যদের নামে অনেক দুর্নাম রয়েছে। তাদের নানা ধরনের অপরাধে জড়িত হতে আমরা দেখেছি। সে জায়গা থেকে এত বেশি প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়াকে আমি ইতিবাচক হিসেবে দেখি।
তিনি আরও বলেন, আমরা আশা করি, তারেক রহমানসহ নতুনরা আমাদের সংসদের যে দুর্নাম তৈরি হয়েছে, তা গোছাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।
এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরও আশাবাদ ব্যক্ত করেন, নতুন সংসদ সদস্যরা ব্যক্তিগত স্বার্থের পরিবর্তে জনস্বার্থে কাজ করবেন।
অন্যদিকে, নতুন সংসদ সদস্যরা বলছেন, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পরে মানুষের আশাঙ্কার ‘নতুন বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে তারা সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চান। যে যার পেশাগত ও সামাজিক পটভূমি থেকে দেশের সংশ্লিষ্ট খাতের উন্নয়নে কাজ করবেন। পাশাপাশি নিজ নিজ এলাকার জনগণের কল্যাণকে তারা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোট ২১২টি আসনে জয়লাভ করে। এরমধ্যে বিএনপি থেকে ৭১ জনের অধিক, যারা প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকা-১৭ ও বগুড়া ৬ আসন থেকে জয়লাভ করেন।
ঢাকা-১ খন্দকার আবু আশফাক, ঢাকা-৩ গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ঢাকা-৬ ইশরাক হোসেন, ঢাকা-৭ হামিদুর রহমান হামিদ, ঢাকা-৯ হাবিবুর রশিদ হাবিব, ঢাকা-১৩ ববি হাজ্জাজ, ঢাকা-১৮ এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন।
গাইবান্ধা-৪ মোহাম্মদ ফারুক আলম সরকার, জয়পুরহাট-২ সাবেক সচিব আব্দুল বারী, নওগাঁ-১ মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান, নওগাঁ-৩ আসনে ফজলে হুদা বাবুল, নওগাঁ-৪ একরামুল বারী টিপু, নওগাঁ-৬ আসনে শেখ মোহাম্মদ রেজাউল ইসলাম।
রাজশাহী-৫ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, নাটোর-১ আসনে ফারজানা শারমিন, সিরাজগঞ্জ-৩ আসনে আইনুল হক, পাবনা-৫ আসনে মোহাম্মদ শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, ঝিনাইদহ-১ মো. আসাদুজ্জামান, খুলনা-৩ রকিবুল ইসলাম।
ভোলা-৪ আসনে মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম নয়ন, বরিশাল-৪ আসনে মোহাম্মদ রাজিব আহসান, পিরোজপুর-২ আসনে আহমেদ সোহেল মনজুর, পিরোজপুর-৩ মো. রুহুল আমিন দুলাল, টাঙ্গাইল-৪ আসনে মোহাম্মদ লুৎফর রহমান মতিন, টাঙ্গাইল-৫ আসনে সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, টাঙ্গাইল-৬ আসনে রবিউল আউয়াল লাভলু, টাঙ্গাইল-৮ আসনে আহমেদ আযম খান, ময়মনসিংহ-৮ আসনে লুতফুল্লাহেল মাজেদ, ময়মনসিংহ-৯ আসনে ইয়াসের খান চৌধুরী।
কিশোরগঞ্জ-২ মো. জালাল উদ্দিন, মুন্সীগঞ্জ-১ শেখ মো. আবদুল্লাহ, মুন্সীগঞ্জ-২ আব্দুস সালাম আজাদ, গাজীপুর-১ মো. মজিবুর রহমান, গাজীপুর-২ এম মঞ্জুরুল করিম রনি, গাজীপুর-৩ অধ্যাপক ডা. এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু।
নারায়ণগঞ্জ-১ মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দীপু, নারায়ণগঞ্জ-২ নজরুল ইসলাম আজাদ, নারায়ণগঞ্জ-৩ মো. আজহারুল ইসলাম মান্নান।
ফরিদপুর-৩ নায়াব ইউসূফ আহমেদ, ফরিদপুর-৪ শহীদুল ইসলাম বাবুল, গোপালগঞ্জ-১ মো. সেলিমুজ্জামান মোল্লা, গোপালগঞ্জ-২ ডা. কে এম বাবর আলী, গোপালগঞ্জ-৩ এস এম জিলানী, শরীয়তপুর-১ সাইদ আহমেদ আসলাম, শরীয়তপুর-৩ মিয়া নুরদ্দিন আহাম্মেদ অপু, সুনামগঞ্জ-১ কামরুজ্জামান কামরুল, সুনামগঞ্জ-৩ মোহাম্মদ কয়সর আহমেদ, সুনামগঞ্জ-৫ কলিম উদ্দিন মিলন, সিলেট-২ তাহসিনা রুশদীর, সিলেট-৩ মোহাম্মদ আবদুল মালিক, সিলেট-৬ এমরান আহমেদ চৌধুরী, মৌলভীবাজার-২ সওকত হোসেন সকু, হবিগঞ্জ-২ আবু মনসুর সাখাওয়াত হাসান জীবন, হবিগঞ্জ-৪ এস এম ফয়সাল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ এস এ হান্নান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ মুশফিকুর রহমান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ মো. আব্দুল মান্নান।
দিনাজপুর-৬ ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, পঞ্চগড়-১ মুহাম্মদ নওশাদ জমির, পঞ্চগড়-২ ফরহাদ হোসেন আজাদ, কুমিল্লা-৫ মো. জসিম উদ্দিন, লক্ষীপুর-১ শাহদাত হোসেন সেলিম, নোয়াখালী-৫ মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, ফেনী-১ রফিকুল আলম মজনু, ফেনী-৩ আব্দুল আওয়াল মিন্টু, চট্টগ্রাম-৫ মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম-৭ হুম্মাম কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৮ এরশাদ উল্লাহ এবং চট্রগ্রাম-১০ সাঈদ আল নোমান, যশোর-৩ অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, ফরিদপুর-২ শামা ওবায়েদ ইসলাম, হবিগঞ্জ-১ রেজা কিবরিয়া প্রমুখ।
ফরিদপুর-২ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর নতুন যারা সংসদে যাবেন, তারা সবাই সবার জায়গা থেকে ভালো ভূমিকা রাখবেন আশা করি।
তিনি আরও বলেন, নতুন সদস্যরা প্রত্যেকে একটা ব্যাকগাউন্ড থেকে এসেছে, সবার নিজ-নিজ সেক্টরের কাজের যোগ্যতা ও পারদর্শিতা আছে, সেটাকে কাজে লাগিয়ে দেশকে বিনির্মাণে কাজ করবে।
লক্ষীপুর-১ আসন থেকে প্রথমবারের মতো ধানের শীষ প্রতীকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন শাহদাত হোসেন সেলিম। তিনি বলেন, বিগত ১৭ বছর পর শান্তিপূর্ণ পরিবেশে জনগণ উৎসবমুখর পরিবেশে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। ভোটাররা আমাকে জয়ী করেছেন। আমি অত্যন্ত আনন্দিত। আশা করছি, সংসদে গিয়ে দেশের মানুষের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারব। আমার নির্বাচনী এলাকার মানুষের কল্যাণে কাজ করতে পারবো।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়নকারী ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ জোনায়েদ সাকি, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, ইসলামী আন্দোলনে বরগুনা-১ মাহমুদুল হোসেন ওলিউল্লাহ।
জাতীয় নগতান্ত্রিক পার্টি (এনসিপি) থেকে ঢাকা-১১ নাহিদ ইসলাম, নোয়াখালী-৬ আবদুল হান্নান মাসউদ, কুমিল্লা-৪ হাসনাত আবদুল্লাহ, রংপুর-৪ আখতার হোসেন, নারায়ণগঞ্জ-৪ আব্দুল্লাহ আল আমিন, কুড়িগ্রাম-২ ড. আতিক মুজাহিদ (এনসিপি)।
এএইচআর/এএমকে