‘সংসদে’ সমাধান না হলে রাজপথ বেছে নেবে এনসিপি

জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার সমাধান সংসদে না হলে রাজপথে আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির দাবি, গণভোটের রায় অনুযায়ী দ্রুত সংস্কার পরিষদ গঠন ও অধিবেশন আহ্বান করার উদ্যোগ নেওয়া প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব।
বিজ্ঞাপন
এদিকে, রাষ্ট্রপতির জারি করা এই সংস্কার আদেশ নিয়ে সংসদে বিএনপি ও জামায়াত-এনসিপি জোটের বিপরীতমুখী অবস্থান রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
আরও পড়ুন
সংবিধান সংস্কার বিষয়ে রাষ্ট্রপতির জারিকৃত আদেশের আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি। দলটির নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে দাবি করেছেন, রাষ্ট্রপতির জারি করা এই আদেশ কোনো আইন বা অধ্যাদেশ নয়; এমনকি সংবিধান বিষয়ে এ ধরনের আদেশ জারির কোনো এখতিয়ারও রাষ্ট্রপতির নেই। এই মতপার্থক্যের কারণে নির্বাচনের পর জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের প্রতিনিধিরা সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দ্বৈত শপথ নিলেও বিএনপির নির্বাচিত এমপিরা শুধুমাত্র সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন

বিষয়টি গত রোববার সংসদে উত্থাপন করেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। তিনি যুক্তি দেন, বর্তমান সংসদ কোনো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় গঠিত হয়নি, বরং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে একটি ‘প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার’-এর মাধ্যমে এসেছে। ১৫টি নির্দেশিকা সম্বলিত এই আদেশের প্রেক্ষিতে অনুষ্ঠিত গণভোটের ৩০ দিন পার হলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বানের অনুরূপ পদ্ধতিতে এই পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকতে হবে। এছাড়া পরিষদ গঠিত হওয়ার পর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই সনদ ও গণভোটের নির্দেশনা অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার কাজ সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে
শফিকুর রহমান ‘জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ উদ্ধৃত করে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শেই রাষ্ট্রপতি এই অধিবেশন আহ্বান করবেন। আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, সংসদের প্রথম অধিবেশন যে পদ্ধতিতে আহ্বান করা হবে, ঠিক একই পদ্ধতিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভাও আহ্বান করতে হবে। অধিবেশন ডাকার এই প্রক্রিয়া সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিজ্ঞাপন

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে যা আছে
‘জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’-এর ৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গণভোটে প্রস্তাবের পক্ষে জনরায় (হ্যাঁ সূচক) এলে নবনির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠিত হওয়ার কথা। এই পরিষদ সংবিধান সংস্কারে গাঠনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। আদেশের শর্তানুসারে, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা একইসঙ্গে জাতীয় সংসদের সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দ্বৈত দায়িত্ব পালন করবেন।
আদেশে আরও উল্লেখ আছে, সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বানের অনুরূপ পদ্ধতিতে এই পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকতে হবে। এছাড়া পরিষদ গঠিত হওয়ার পর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই সনদ ও গণভোটের নির্দেশনা অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার কাজ সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

তবে গত ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি সংসদের অধিবেশন আহ্বান করলেও এখন পর্যন্ত সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো অধিবেশন ডাকেননি।
আরও পড়ুন

বিদ্যমান এই পরিস্থিতিতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শীর্ষ নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, বর্তমান সরকারের সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদের শপথ গ্রহণ করলেও এখনো ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। অথচ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্যই ছিল একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠন এবং প্রচলিত সংবিধানের আমূল সংস্কার। এই লক্ষ্য অর্জনে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ও শপথের উদ্যোগ নিতে হবে।
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব ঢাকা পোস্টকে বলেন, গণভোটে জনগণের যে রায় এসেছে, তা বাস্তবায়ন করতে হবে। জুলাই সনদের আদেশ বাস্তবায়নে আমরা সংসদ ও রাজপথে আন্দোলন করবো। তবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া মেনেই আমরা প্রথমে সংসদের ভেতরে আমাদের দাবি আদায়ের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।

বিএনপি নেতাদের বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিএনপি নেতাদের নানা মন্তব্য দুঃখজনক। মনে রাখতে হবে, এই রায় গণভোটের মাধ্যমে জনগণই দিয়েছে, যা বাস্তবায়ন করা এখন বাধ্যতামূলক। ঈদের পর সংসদ অধিবেশন শুরু হলে আমাদের দলের সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বানের দাবি তুলবেন। সংসদে যদি জনগণের এই প্রত্যাশার প্রতিফলন না ঘটে, তবে আমরা রাজপথে আন্দোলনের কর্মসূচি দিতে বাধ্য হব।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার উদ্যোগ নেওয়ার দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীরই ছিল। সুতরাং এর দায়ভার তাকেই নিতে হবে। সংবিধানের দোহাই না দিয়ে জনগণের অভিপ্রায় বাস্তবায়নে দ্রুত সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকতে হবে।
এমএসআই/এমএসএ