বিজ্ঞাপন

সংসদে শফিকুল ইসলাম মাসুদ

সংশোধন নয়, রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য জুলাই আন্দোলনে জীবন দিয়েছে ছাত্র-জনতা

অ+
অ-
সংশোধন নয়, রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য জুলাই আন্দোলনে জীবন দিয়েছে ছাত্র-জনতা

সংসদীয় আসন-১১২ পটুয়াখালীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেছেন, বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে, পা হারিয়ে, চোখ হারিয়ে আমাদের সন্তানেরা জুলাইয়ে দাঁড়িয়েছিল রাস্তা বেরিকেট দিয়ে। লেখা ছিল রাস্তা সংস্কারের কাজ না, ‘রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ চলছে’। আমরা সেই সংস্কারের কথাটা এখন মাথায় নিতেই পারছি না। আমরা সংস্কারের পরিবর্তে এখন সংশোধনের দিকে যাচ্ছি। এই সংশোধনীর জন্য আমাদের ছেলেরা আমাদের তরুণ যুবকরা, আমাদের জনতারা জীবন দেয়নি। 

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ভোটের পর নখের কালি শুকাতে না শুকাতেই উন্নয়নের কথা বলে আমরা জুলাই সনদটাকেই ভুলিয়ে দিতে বসেছি।

মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) বিকেলে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ‘জুলাই সনদ’-এর ওপর আনীত জনগুরুত্বপূর্ণ মুলতবি প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অধিবেশনের শুরুতে আলোচনার অনুমতি দেন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।

সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ তার বক্তব্য শুরু করেন একটি গল্প দিয়ে। তিনি বলেন, এক রাজা তার উজিরকে সারা দিনের কাজের একটি তালিকা করে দিয়েছিলেন। উজির সেই তালিকা দেখেই কাজ করতেন। হঠাৎ একদিন শিকারে গিয়ে রাজার পা ঘোড়ার রেকাবে আটকে যায়। পা ছাড়াতে না পেরে তিনি উজিরকে বারবার ডাকতে থাকেন। কিন্তু উজির পা ছাড়াতে যাচ্ছিলেন না, কারণ তিনি খুঁজছিলেন তালিকায় এই পরিস্থিতিতে পা বের করে দেওয়ার কোনো বিধান আছে কি না! শেষ পর্যন্ত রাজার পা আর বের করা যায় না এবং রাজাকে মুক্ত করাও সম্ভব হয়নি। মাসুদ বলেন, ‘আজকের সংসদকে আমার কাছে ঠিক এ রকম একটা গল্পের মতোই মনে হয়।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘আমাদের চার বছরের সন্তানরাও জীবন দিয়েছে। বিগত ১৭ বছর উন্নয়নের কথা বলে আমাদের নির্বাচনকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। আবার বিগত দেড় বছর আমরা লক্ষ করলাম, নির্বাচন নির্বাচন বলে আমরা বিচার এবং সংস্কারটাই ভুলে গিয়েছিলাম। এখন আবার নখের কালি শুকাতে না শুকাতেই উন্নয়নের কথা বলে জুলাই সনদটাকেই ভুলিয়ে দিতে বসেছি।’

বিব্রতবোধ করছেন উল্লেখ করে এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘আমাদের সন্তানেরা কি রাস্তায় ফ্যামিলি কার্ডের জন্য প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়েছিল? তারা বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে, পা হারিয়ে, চোখ হারিয়ে রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেখানে লেখা ছিল– ‘রাস্তা সংস্কারের কাজ নয়, রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ চলছে’। অথচ আমরা সংস্কারের কথাটা মাথায় নিতে পারছি না। আমরা সংস্কারের পরিবর্তে এখন সংশোধনের দিকে যাচ্ছি। এই সংশোধনীর জন্য আমাদের তরুণ সমাজ, আমাদের জনতা কাজ করেনি।’

শেখ হাসিনার ‘সংশোধনের’ প্রস্তাবের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনাও সেদিন বলেছিলেন– ২৪ ঘণ্টা দরজা খোলা আছে, তোমরা সংশোধনের জন্য এসো। সেদিন ছাত্র-জনতা সংশোধন মেনে নেয়নি, তারা সংস্কারের কথা বলতে চেয়েছিল। আজকে আমরা সেই সংস্কারটা মাথায় নিতে পারছি না কেন?’

বিজ্ঞাপন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষার্থী রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সূত্র টেনে বলেন, “‘Necessity knows no law’ (প্রয়োজন কোনো আইন মানে না)। আমরা এই প্রয়োজনকে আজকে সংবিধানের ধারায় আটকে ফেলেছি। আমরা লাইন, দাড়ি, কমা, সেমিকোলন খুঁজছি। ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে যে সংস্কার করার কথা ছিল, তা না করে আমরা খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ডসহ অন্যান্য কাজে গুরুত্ব দিলাম। অথচ যে সংস্কারের জন্য নির্বাচন করে আমরা এখানে কথা বলার সুযোগ পেলাম, তাতে নজর দিতে পারলাম না কেন?”

সরকারি দলের (ট্রেজারি বেঞ্চ) সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “জনগণের ৫১ শতাংশ ফ্যামিলি কার্ডের পক্ষে ভোট দিয়েছে, আর ৭০ শতাংশ তো জুলাই সনদের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে ভোট দিয়েছে। তাহলে কি আমরা ৫১ শতাংশকে গুরুত্ব দিয়ে এবং বিগত ১৭ বছরের উন্নয়নের কথা বলে দেশের জনগণকে মূল জায়গা থেকে সরিয়ে অন্য কোথাও নিয়ে যেতে চাচ্ছি?”

উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “বলা হচ্ছে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। আমরা বলি ‘সবাই মিলে বাংলাদেশ’। কিন্তু আমি তো তা লক্ষ করছি না।” উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘১১টি সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বদল হয়েছে। সবাই মিলে যদি বাংলাদেশ হয়, তবে সরকারি দলের বাইরে কি একজন যোগ্য ও সৎ মানুষ খুঁজে পাওয়া গেল না? ৪২টি জেলা পরিষদে নিয়োগ হয়েছে, অথচ ন্যায্যতার ভিত্তিতে একজনকে বা দুজনকে দেওয়া গেল না। আমরা কি সেই নতুন বাংলাদেশের দিকে যেতে পেরেছি?’

তিনি আরও বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে এক-দুই জায়গায় প্রশাসক নিয়োগ হলে আমরাই বলেছিলাম এটা সংবিধান লঙ্ঘন ও গণতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আর এখন নির্বাচনের ভিত্তিতে সরকার পেয়ে স্থানীয় নির্বাচনের দিকে না গিয়ে তড়িঘড়ি করে নিজেদের দলীয় লোক নিয়োগ করা হয়েছে। এরপরও বলা হচ্ছে সবাই মিলে বাংলাদেশ! আসলে আমরা এটা বলতে পারি না।”

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ভিত্তিতে শপথ গ্রহণের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “আমাদের ট্রেজারি বেঞ্চ থেকে বলা হয় এটাই নাকি অবৈধ হয়েছে। অবৈধ একটা কাজ জাতীয় সংসদে আমাদের কাছে প্লেস করল কে? যারা করেছে, তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত। এই অবৈধ প্ররোচনা আমাদের কে দিয়েছেন? আমরা তো জোর করে কারও পকেট থেকে এসব আনিনি বা আমি নিজে বাউফল থেকে শপথের কাগজ নিয়ে আসিনি; এখান থেকেই দেওয়া হয়েছে।”

জেইউ/বিআরইউ