বিজ্ঞাপন

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে আইনগত অসঙ্গতি রয়েছে : শিশির মনির

অ+
অ-
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে আইনগত অসঙ্গতি রয়েছে : শিশির মনির

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে আইনগত অসঙ্গতি রয়েছে বলে দাবি করেছেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, গুম ও মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিলের যে ব্যাখ্যা সরকার দিয়েছে, তা, আইনগতভাবে সঠিক নয়। 

সোমবার (১৩ এপ্রিল) রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং চিফ হুইপের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। 

সংবাদ সম্মেলনে আরো বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন। 

বিজ্ঞাপন

শিশির মনির ব্যাখ্যা করেন বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে গুম (Enforced Disappearance) ‘ক্রাইম এগেইনস্ট হিউম্যানিটি’-এর একটি অংশ, যা বিচারযোগ্য হতে হলে ‘ওয়াইডস্প্রেড’ ও ‘সিস্টেমেটিক’ হতে হয়। কিন্তু কোনো ব্যক্তিকে আলাদাভাবে গুম করার ঘটনা এই আইনের আওতায় পড়ে না। ফলে গুম অধ্যাদেশ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনের সংজ্ঞা এক নয় এ কথা স্পষ্ট।

মানবাধিকার কমিশনের কমিশনারদের পদত্যাগের পর তাদের দেওয়া খোলা চিঠির উদ্ধৃতি দিয়ে শিশির মনির বলেন, খোলা চিঠিতে কমিশনাররা দেখিয়েছেন এক ধরনের অসত্য তথ্য উপস্থাপন করে আইনটিকে ল্যাপস করা হয়েছে। খোলা চিঠিতে বলা হয়েছে, গুম অধ্যাদেশের ২৮ ধারায় পদ্ধতিগত গুমের বিষয়টি বলা আছে। 

তদন্ত সংক্রান্ত আইনমন্ত্রীর তোলা প্রশ্নের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, মানবাধিকার কমিশনের ২৮, ১৬ ধারা ১৬(ঞ ও চ) তে বলা হয়েছে ৩০ দিনের মধ্যে যদি তদন্ত শেষ করতে না পারেন তাহলে কি হবে, জরিমানা কি হবে, কীভাবে আদালত জরিমানা আদায় করবে তা স্পষ্ট বলা আছে। অথচ তারা(আইনমন্ত্রী) বলছেন আইনে এসব নেই। 

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, একটি বৈধ আইন বাস্তবায়ন না হলে তার দায় দায়িত্ব সরকারের উপর থাকবে। আমরা আশা করব আপনারা (সরকার) এটিকে বাস্তবায়ন করবেন। 

কোচিং সেন্টারসহ সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্যে অভিযোগে ২৮ জন বিচারককে শোকজ করা বিষয়ে শিশির মনির বলেন, শোকজ নোটিশে সেসব বিষয় নেই। যে আইনে তাদের শোকজ করা হয়েছে সেই আইন বর্তমানে নেই। আইনটি সুপ্রিম কোর্ট একটি আদেশের মাধ্যমে বাতিল করে দিয়েছে। অথচ, আইন যে নাই, সরকার, আইন মন্ত্রণালয় তার খবরই রাখে না। সেই আইনে নোটিশ দিয়েছে। আইনটিকে সুপ্রিম কোর্ট অসাংবিধানিক বলেছেন। 

বিচারকদের স্বাধীনতার বিষয়ে শিশির মনির বলেন, বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, ছুটি ও শৃঙ্খলা সব ন্যস্ত সুপ্রিম কোর্টের উপর। অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, ছুটি ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন শুধু সুপ্রিম কোর্ট। এজন্য আলাদা সচিবালয়। শুধু বিচারকার্যে স্বাধীনতা নয়, সকল ক্ষেত্রে স্বাধীনতা থাকতে হবে। যেখানে সরকারি দল বলছে শুধু বিচারকার্যে স্বাধীনতা। 

পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ল্যাপস নিয়ে তিনি বলেন, আমরা মনে করি আইনগত যে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে সেগুলো সঠিক না হলে উপস্থাপন করা উচিত না। দেশে আইন জানা, সিনিয়র লোক, বিচারকরা রয়েছেন। কোনো অস্পষ্টতা থাকলে তাদের সাথে পরামর্শ করা যেতে পারে। কিন্তু এভাবে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বিচারবিভাগকে হেয় করার কোনো দরকার নেই। বিচারকদের অযথা নোটিশ পাঠানোর দরকার নেই। গুম কমিশন ও মানবাধিকার কমিশন আইনের বিরুদ্ধে এ ধরনের কথা বলার দরকার নেই। 

বর্তমান পরিস্থিতিতে কেউ গুম হলে কোথাও প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ নেই বলেও উল্লেখ করেন শিশির মনির। এর ফলে গুম থাকা একজন লোকের ভাগ্যে গুম থাকাটাকে আমরা উন্মুক্ত করে দিলাম। এটি খুবই খারাপ উদ্যোগ।

গণভোট অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার নিজেই একে ‘ফ্যাক্টাম ভ্যালিড’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সে ক্ষেত্রে এটি বাস্তবায়নের দায়িত্বও সরকারের ওপর বর্তায়। বৈধতা স্বীকার করে বাস্তবায়ন না করা হলে তার দায় সরকারকেই নিতে হবে। বিচারকদের শোকজ নোটিশ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। 

তার দাবি, যে আইনের আওতায় নোটিশ দেওয়া হয়েছে, সেটি ইতোমধ্যে সুপ্রিম কোর্ট অসাংবিধানিক ঘোষণা করে বাতিল করেছে। ফলে সেই আইনের ভিত্তিতে শোকজ করাকে তিনি ‘আইনগতভাবে অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেন।

এছাড়া ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশে নতুন ধারা সংযোজনের মাধ্যমে আগের মালিকদের কাছে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তার মতে, এতে আর্থিক খাতে অনিয়মের দায় নির্ধারণ ও অর্থ পুনরুদ্ধারের বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে।

জাতীয় সংসদের সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সংসদের প্রথম অধিবেশনে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। সংবিধানের ৯৩(ডি) অনুচ্ছেদের ৩০ দিনের সময়সীমা শেষে দেখা যায়, ১১৭টি অধ্যাদেশ পাস হয়েছে—কিছু হুবহু, কিছু সংশোধিত আকারে; ৭টি রহিত এবং ১৬টি ল্যাপস হয়েছে, অর্থাৎ সংসদে উপস্থাপনই করা হয়নি।

তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও পৃথক সচিবালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বিষয়গুলো ল্যাপস বা বাতিল করায় জনগণের প্রত্যাশা আন্ডারমাইন হয়েছে।

তিনি জানান, তারা দুই দফায় ওয়াকআউট করেছেন। বিশেষ কমিটিতে মতবিরোধহীন বিষয় পাস ও মতবিরোধপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার ‘জেন্টলম্যান এগ্রিমেন্ট’ থাকলেও তা মানা হয়নি। সংসদে কথা বলার সুযোগ না পাওয়ায় তারা বাইরে এসে বক্তব্য দিয়েছেন। বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে বিরোধী দলসহ কিছু সরকারদলীয় সদস্যের নোট অব ডিসেন্ট অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, যা গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থি।

স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশে অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগকে তিনি সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের পরিপন্থি উল্লেখ করে বলেন, এ কারণেই প্রথম ওয়াকআউট করা হয়; পরে প্রক্রিয়াগত অসঙ্গতির প্রতিবাদে আবারও ওয়াকআউট করা হয়।

ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে তিনি বলেন, শেষ মুহূর্তে বিলের কপি দিয়ে ১৮(ক) ধারা সংযোজনের মাধ্যমে পূর্বের মালিকদের কাছে নিয়ন্ত্রণ ফেরানোর সুযোগ রাখা হয়েছে, যা স্বচ্ছতার পরিপন্থি।

তিনি বলেন, বিএনপির একটা ইতিহাস আছে। গত ১৬ বছর দেখে এসেছি তারা সবসময় বলতেন ঈদের পরে আন্দোলন হবে। কিন্তু সেই ঈদ কিন্তু কখনোই আসেনি। এখন যেই বিলগুলার ব্যাপারে তারা আন্তর্জাতিকভাবে চাপের মুখে পড়েছে। সেই মানবাধিকার কমিশন বিল, গুম কমিশনের বিল, স্বাধীন বিচার বিভাগের সচিবালয়ের বিল। তারা বলছেন অধিকতর সংশোধন করে তারা স্টেকহোল্ডারদের সাথে আলোচনা করে আনবেন কিন্তু এটা কবে আনবেন এটা কি আবার সেই ঈদের পরের আন্দোলনের মত ১৬ বছর আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে কিনা এটাই জাতির সামনে প্রশ্ন। জনগণ যদি তাদের অধিকার বাস্তবায়ন করার জন্য সংসদের উপর রাস্তা হারিয়ে রাস্তায় নেমে আসে সেজন্য জনগণকে দায় দিতে পারবেন না এর জন্য সরকার দলকে সরকার দলীয় সংসদ সদস্যদেরকে দায় নিতে হবে এই গভমেন্টকে দায় নিতে হবে।

সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, আমরা সংসদে এ বিষয়গুলো নিয়ে ওয়াকআউট করেছি। তারা (সরকারি দল) বলেছে, বিশেষ কমিটিতে যেভাবে আলোচনা হয়েছে বিলগুলো সেভাবে উত্থাপিত হয়েছে, ল্যাপস হয়েছে কিংবা সংশোধিত আকারে উত্থাপিত হয়েছে। আমরা বিশেষ কমিটিতে যেভাবে আলোচনা করেছি, একমত হয়েছিলাম- যে বিষয়গুলোতে কোনো আপত্তি নেই সেগুলো কোনো আলোচনা ছাড়াই আমরা সমর্থন করব, বিলগুলো পাস হয়ে যাবে। যেসব বিষয়ে আপত্তি রয়েছে, নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিলাম- সেগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। এই ওয়াদা ওরা(সরকারদলীয় এমপি) ভঙ্গ করেছেন। 

তিনি বলেন, জনগণের সঙ্গে স্পর্শকাতর ইস্যু হওয়ায় সংসদের ভিতরে কথা বলতে না দেওয়ায় আমরা সংসদের বাইরে এসে কথা বলছি। বিশেষ কমিটির একটি প্রকাশিত রিপোর্টে হিউম্যান রাইটস কমিশনের বিষয়ে এবং মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের বিষয়, সুপ্রিম কোর্টের বিষয়ে আমরা ও সরকারদলীয় সংসদ সদস্যরা যেসব নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন- সেগুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সত্যের অপলাপ করে তাদের বক্তব্যগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। রিপোর্টে থাকা ৯৮টি বিল হুবহু পাস করার কথা বলা হয়েছে। 

তিনি আরও বলেন, সংসদে আলোচনার জন্য সরকারদলীয় এমপিদের পজিশনকে তুলে ধরার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় দেওয়া হলেও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের কম সময় দেওয়া হয়। পরে বিরোধীদলীয় নেতার প্রতিবাদের পর সময় বাড়ানো হয়। 

জুলাই জাদুঘর বিলের বিষয়ে তিনি বলেন, এই বিলের বিষয়ে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করেননি। মন্ত্রীকে প্রধান করে একচ্ছত্র ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এমনকি পরিচালক যারা থাকবেন তাদের অপসারণের ক্ষমতা প্রধানকে দেওয়া হয়েছে। বিলটি সংশোধিত আকারে পেশ করা হলেও আমাদের কোনো প্রকার নোট অব ডিসেন্ট দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। এর ফলে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা চূড়ান্তভাবে ওয়াকআউট করে।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। এছাড়াও সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন- ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি কামাল হোসাইন, সংসদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন, সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুব সালেহী, জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমান এবং মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, সিনিয়র সাংবাদিক ওলিউল্লাহ নোমান।

জেইউ/এমএন