ভাগ্নে মোবারক হোসেন আকাশকে মারপিট করছে রমনা থানা যুবদলের আহ্বায়ক দিদারুল ইসলাম বাবুসহ তার অনুসারীরা। ঘটনা জানতে পেরে ভাগ্নে আকাশকে বাঁচাতে এসে নিজ দলের নেতাকর্মীদের হাতেই খুন হন রমনা থানার স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা বিল্লাল হোসেন তালুকদার।
নিহত বিল্লালের ভাগিনা মো. মোবারক হোসেন আকাশ ঢাকা পোস্টকে বলেন, গতকাল (সোমবার) সন্ধ্যায় আনারকলি মার্কেটের সামনে চাঁদা তোলার সময় আমার সঙ্গে রশিদের কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে আমাদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি হলে সে দিদারুল ইসলাম বাবুকে ফোন দেয়। বাবুকে ফোন দেওয়ার পর বাবু তার ডান হাত সিরাজুল, রেজাউল, আল আমিন, মিরাজসহ চার-পাঁচজন লোক নিয়ে আসে। সিরাজ, মিরাজুলসহ তাদের আরও দুই ছোট ভাই মিলে আমাকে মারধর শুরু করে। আমাকে তারা মারতে মারতে পাশে একটা ফুডের দোকানের পাশে নিয়ে যায়।
‘এর কিছুক্ষণের মধ্যে থানা যুবদলের আহ্বায়ক দিদারুল ইসলাম বাবুর নেতৃত্বে এক থেকে দেড়শো লোকজন এসে জড়ো হয়ে আমাকে ঘিরে ধরে। পরে বাবু আমার মামাকে মোবাইল ফোন করে আমাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য। এর আগে আনারকলি মার্কেটের সামনে ফুটপাতে চাঁদাবাজি না করতে বলা হয়েছে। থানা বিএনপির সভাপতি হাজী আশরাফ বলেছেন, ফুটপাত থেকে কেউ কোনো চাঁদাবাজি করতে পারবে না।’
তিনি আরও জানান, ওই সময় বাবু এসে বলে, এখানে কী হয়, না হয়, তোর এগুলোতে কী দরকার? তুই কী নেতা হয়ে গেছিস? এগুলো সব যুবদল দেখবে।
বাবু এসেই আমাকে বলে, ‘তোর মামাকে ছাড়া তোরে যাইতে দিবো না। তোর মামা আসবে, বিচার করবে এরপর তোরে যাইতে দিমু। আমি কোন কথা না বলে স্বেচ্ছাসেবকদলের সাবেক আহ্বায়ক বিল্লাল তালুকদারকে (মামা) ফোন করি। তিনি আমার মামা। মামা আসার পর বাবুর লোকজন হকিস্টিক দিয়ে পেছন থেকে আমাকে আঘাত করে। আমার ওপর আঘাত করা দেখে মামা তাদেরকে ধরেছেন। এরপর দুইপক্ষের হাতাহাতি শুরু হয়।’
‘ওই সময় বাবুর কাছে একটা ছুরি ছিলো আমরা কেউ বিষয়টা টের পাইনি। প্রথমে বাবু উল্টাপাল্টা যেভাবে পারছে সবাইকে ছুরি দিয়ে আঘাত করছিল। আমি তখন নিচে পড়ে যাই। তখন বাবুর হাত থেকে বাবুর ডান হাত রেজাউল ছুরিটা নিয়েই মামার (বিল্লাল তালুকদারকে) বুকের ডানপাশে ছুরিকাঘাত করে। মামা যখন বলেন, আমাকে ছুরি মারছে বুকে, তখন তারা দৌড়ে পালিয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে আমি মামাকে নিয়ে কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে নিয়ে যাই। তারা দ্রুত আমাদেরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে পাঠায়। ইমার্জেন্সিতে যাওয়ার পর ডাক্তার দেখে আমার মামাকে মৃত ঘোষণা করেন। ডাক্তার দেখার পর বলেন, তার ফুসফুস ছিদ্র হয়ে গেছে।’
বিল্লাল হোসেনের বড় ছেলে হৃদয় হোসেন তালুকদার জানান, সামান্য বিষয় নিয়ে তারা আমার বাবাকে হত্যা করেছে। আমার বাবা দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এমন কাজ হয়নি যা দল ক্ষমতায় থাকাকালীন সময় হলো। আমার বাবাকে যারা হত্যা করেছে, আমি তাদের ফাঁসি চাই।
পুলিশের অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, মৌচাক-আনারকলি এলাকার ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে পূর্বশত্রুতার বিষয়টিই তাদের প্রাথমিক সন্দেহের তালিকায় রয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ ও পেছনের কুশীলবদের খুঁজতে পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে এবং এই ঘটনায় রমনা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে।
হত্যার ঘটনায় নিহতের স্ত্রী আম্বিয়া খাতুন সদ্য বহিষ্কৃত রমনা থানা যুবদলের আহ্বায়ক দিদারুল ইসলাম বাবুকে প্রধান আসামিসহ ২১ জনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
সর্বশেষ অগ্রগতি সম্বন্ধে জানতে চাইলে রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার রাব্বানী জানান, বিল্লাল হোসেন হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত আমরা দুইজনকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছি। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
এদিকে, বিল্লাল হত্যাকাণ্ডের পর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও রমনা থানা যুবদলের আহ্বায়ক দিদারুল ইসলাম বাবুকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং একই সঙ্গে রমনা থানা যুবদলের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। জাতীয়তাবাদী যুবদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়ন আজ (মঙ্গলবার) এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন।
অন্যদিকে, মঙ্গলবার (৯ জুন) দুপুরে ঢামেক হাসপাতাল মর্গে বিল্লাল হোসেন তালুকদারের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে বিএনপির পার্টি অফিসের সামনে বিল্লাল হোসেন তালুকদারের জানাজা সম্পন্ন করে তার গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরে নিয়ে যাওয়া হয়।
এসএএ/এসএএস/বিআরইউ
