বিজ্ঞাপন

মোস্তাফিজুর রহমান

বাজেট বাস্তবায়নের ভিত্তি ঠিকভাবে প্রাক্কলন হয়নি

বাজেট বাস্তবায়নের ভিত্তি ঠিকভাবে প্রাক্কলন হয়নি

প্রস্তাবিত বাজেটে জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও অঙ্গীকার থাকলেও এর প্রাক্কলন বা অর্থনৈতিক ভিত্তিগুলো বাস্তবসম্মত হয়নি বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। তার মতে, ‘বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে যে গাণিতিক ভিত্তি ব্যবহার করা হয়েছে, তা সঠিক হয়নি। ফলে এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি ও শৃঙ্খলাহীনতা তৈরি হতে পারে।’

শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর লেকশোর হোটেলে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: সিপিডির পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহকারী তামিম আহমেদসহ প্রতিষ্ঠানটির অন্যান্য গবেষকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সরকারের জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র নির্মাণের প্রতিশ্রুতিকে ইতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ‘একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি, উচ্চ প্রবৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন— এই তিনটি মূল শক্তির ওপর ভিত্তি করে সরকার কাজ করতে চাচ্ছে। বাজেটে রপ্তানিমুখী ও আমদানি প্রতিস্থাপক শিল্পকে সুরক্ষা দিতে শুল্ক হারের যে সমন্বয় করা হয়েছে এবং সামাজিক সুরক্ষায় ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ডের মতো যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাকে স্বাগত জানাই।’

তবে, এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘প্রথম যে ঝুঁকিটি আমি দেখি, তা হলো চলতি অর্থবছরের যে ভিত্তি ধরে প্রবৃদ্ধি, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব আহরণ বা বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে, সেই ভিত্তিটিই দুর্বল।’

সুনির্দিষ্ট কিছু তথ্য তুলে ধরে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, গত ১০ মাসে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি যেখানে ১.৮ শতাংশ ঋণাত্মক (নেতিবাচক), সেখানে বাজেটে ৮.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে। একইভাবে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের উপরে থাকলেও বাজেটে এই লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৭ শতাংশ ধরা হয়েছে। পাশাপাশি রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।

অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, বাজেটের প্রাক্কলনগুলো এমনভাবে করা হয়েছে যেন মনে হচ্ছে চলতি অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে (চতুর্থ কোয়ার্টারে) হঠাৎ করে অর্থনীতিতে একটি ‘চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি’ তৈরি হবে; যেখানে প্রবৃদ্ধি হঠাৎ বেড়ে যাবে, মূল্যস্ফীতি কমে আসবে এবং বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ ও সম্পদ আহরণ আকস্মিকভাবে বৃদ্ধি পাবে।

এই ধরনের প্রাক্কলন বাস্তবসম্মত নয় এবং এটি বাজেটের শৃঙ্খলা নষ্ট করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রেই কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব ও অর্থনৈতিক দুর্বলতা পেয়েছে। তাই ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পর মার্চ থেকে জুনের মধ্যে কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। এমন পরিস্থিতিতে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দুর্বলতাগুলোকে স্বীকার করে যদি ভিত্তিটি বাস্তবসম্মতভাবে নির্ধারণ করা হতো, তবে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাগুলো আরও টেকসই হতো।’

মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, বাজেটের যাবতীয় প্রস্তাবনার সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে সম্পদের সঠিক বণ্টন এবং বরাদ্দ দক্ষতার ওপর। সেপ্টেম্বরে যখন গত অর্থবছরের সব সূচক চূড়ান্তভাবে সামনে আসবে, তখন ভিত্তি নির্ধারণের এই ভুলগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।

সিপিডির এই সম্মাননীয় ফেলো বলেন, ‘আমি একটি বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। বর্তমানে যে প্রশ্নগুলো আসছে, সেগুলো নিয়ে আমরাও বলেছি যে সবটাই নির্ভর করবে বণ্টনের দিক থেকে এবং বরাদ্দের অগ্রাধিকার নির্ধারণের দিক থেকে। এগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের দ্বিমত করার অবকাশ আমি দেখি না। তবে, আমাদের লক্ষ্যমাত্রা তখনই অর্জিত হবে, যখন আমরা এটি বাস্তবায়ন করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অর্জন করতে পারব।’

বিনিয়োগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিনিয়োগকে চাঙ্গা করার জন্য আমদানির বিকল্প শিল্প ও রপ্তানিমুখী শিল্পের ক্ষেত্রে বাজেটে বিভিন্ন রাজস্ব প্রণোদনা ও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে, সঠিকভাবে আমাদের চিন্তা করতে হবে যে আমরা যদি ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ করিও, তারপরও যদি গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারি, তবে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। সুতরাং এই অবকাঠামোগত বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, বাজেটের এই প্রচেষ্টাটি একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ এবং এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি ‘ডিপার্চার’ (নতুন যাত্রা) হিসেবে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে। তবে, সুযোগের সদ্ব্যবহার করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং গ্যাস-বিদ্যুতের মতো অবকাঠামোগত প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু এগুলো নিশ্চিত করার জন্য এক বছর যথেষ্ট সময় নয়।

রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে আমাদের এখন প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি করতে হবে, ১৮ শতাংশ নয়। কারণ, এবার আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অনেক বড়, তা আমরা সবাই জানি। লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন করতে হলে যেসব খাতে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর অনেক জায়গাতে সংশোধন করতে হবে।

রপ্তানিমুখী শিল্পে দেওয়া প্রণোদনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই সুযোগ নিয়ে নতুন বিনিয়োগ আসতে সময় লাগবে। বেসরকারি খাত এই সুযোগগুলো ব্যবহার করে বিনিয়োগ ও আয় বাড়াবে এবং সেখান থেকে বেশি রাজস্ব আসবে— এই সমীকরণটি ফলপ্রসূ হতে আরও সময় প্রয়োজন।’

বাজেটের চ্যালেঞ্জ নিয়ে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই বাজেটে এক বছরে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম এবং এটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। এতদিন আমাদের একটি ‘লো লেভেল ইকুইলিব্রিয়াম’ বা নিম্ন পর্যায়ের ভারসাম্য ছিল; আমরা রাজস্ব আহরণ কম করেছি এবং ব্যয়ও কম করেছি, যার ফলে ঘাটতি সীমানার মধ্যে ছিল। কিন্তু এখন সরকার যদি ব্যয় ঠিকমতো করতে চায় এবং আয় কম হয়, তবে ব্যাংক বা বৈদেশিক ঋণের ওপর চাপ বাড়বে। তখন টাকা ছাপিয়ে ঘাটতি মেটাতে গেলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বৈদেশিক ঋণের বিষয়ে তিনি বলেন, নিট বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা অনেক বড়। গত বছরও আমরা প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের মতো নিট বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ (সার্ভিসিং) করেছি। এত বড় প্রাক্কলনের ফলে এবং সুদ পরিশোধের পরিমাণ এখনই প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা হওয়ায়, এটি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কাঠামোগত দিক থেকে বাজেটের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং শুল্ক ও রাজস্ব নীতিমালা ভালো হলেও প্রাতিষ্ঠানিক ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর এর ফলাফল নির্ভর করবে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। স্বাস্থ্য খাতের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “সেখানে প্রকৃত ব্যয় ও বরাদ্দের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সংস্কারের দিকে আরও নজর দেওয়া দরকার ছিল যাতে বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার এবং ‘গুড ভ্যালু ফর মানি’ নিশ্চিত করা যায়।”

এমএমএইচ/