জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সম্ভাব্য একীভূত হওয়ার উদ্যোগ আপাতত ধীরগতিতে এগোচ্ছে। গত কয়েক মাসে দুই দলের শীর্ষ পর্যায়ে একাধিক দফা আলোচনা হলেও নতুন দলের নেতৃত্বের কাঠামো, সাংগঠনিক বিন্যাস এবং নিবন্ধন-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া নিয়ে এখনও চূড়ান্ত ঐকমত্য হয়নি। ফলে, দল দুটির একীভূত হওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্তও আসেনি।
তবে, এনসিপির ভেতরে এ নিয়ে একক অবস্থান নেই। দলটির একটি অংশ মনে করছে, নীতিগতভাবে দুই দল এখনও একীভূত হওয়ার পক্ষে রয়েছে। বিষয়টি বাতিল হয়ে যায়নি। বরং কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সেটি নিয়েই আলোচনা চলছে। অন্যদিকে, আরেকটি অংশের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় একীভূত হওয়ার চেয়ে সাংগঠনিক বিস্তার এবং নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে, নেতৃত্বের কাঠামো নিয়ে মতভেদই আলোচনার গতি কমিয়ে দিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘নীতিগতভাবে দুই দলই একমত আছে। তবে, এটাকে কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তা নিয়ে বিস্তর আলাপ-আলোচনা চলছে। যেহেতু দুটি দলই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস করে, তাই দুই দলের তৃণমূলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতে হচ্ছে।’
‘অন্যদিকে, এবি পার্টিরও নিবন্ধন আছে। আমাদের দলও নিবন্ধিত। তাই কোন প্রক্রিয়ায় আমরা একসঙ্গে আসতে পারি সেটি নিয়ে আলোচনা চলছে। আমার ধারণা, এতে কিছুটা সময় লাগবে’— বলেন তিনি।
আরও পড়ুন
আসিফ মাহমুদ আরও বলেন, ‘একীভূত হওয়ার নীতিগত যে সিদ্ধান্ত, এটা মোটামুটিভাবে বিগত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগেই নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এরপর নির্বাচন, জুলাই সনদ, আন্দোলন— সবকিছু মিলিয়ে প্রক্রিয়াটা দ্রুত হচ্ছে না। ধীরে-ধীরে হচ্ছে। নেতৃত্বের কাঠামোটা কী হবে— সেটা নিয়ে সময় লাগছে। তবে, আলোচনা চলমান।’
অন্যদিকে, এনসিপির একাধিক নেতা বলছেন, বর্তমানে দলের ভেতরে একীভূত হওয়ার বিষয়ে আগের মতো আগ্রহ নেই। কারণ, এবি পার্টির নেতাদের দলে অন্তর্ভুক্ত করা হলে নেতৃত্বের ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে পড়বে।

এনসিপির এই অংশটির মতে, এবি পার্টির যারা নেতা আছেন, তারা এরইমধ্যে সমাজে পরিচিতি পেয়ে গেছেন। তাদেরকে এনসিপিতে আনা মানে দলের মাথাভারী করা। এছাড়া, তারা এনসিপিতে যোগ দিলে স্বাভাবিকভাবে তাদেরকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদ ও দায়িত্ব ছেড়ে দিতে হবে। তাদের পদ-পদবি ছেড়ে দিতে গেলে বঞ্চিত হবে এনসিপির নেতাকর্মীরা। তখন এনসিপির ভেতরে অসন্তোষ দেখা দিতে পারে।
তাই তারা মনে করছেন, এই মুহূর্তে এনসিপি ও এবি পার্টি আর একীভূত হওয়ার সুযোগ নেই। বরং দলের সাংগঠনিক বিস্তার এবং নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এনসিপির বর্তমান যে সাংগঠনিক অবস্থা, নতুন করে কাউন্সিল করার উপযোগী নেই। ফলে, বর্তমান আহ্বায়ক কমিটি রেখে তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধিই মূল লক্ষ্য।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা ঢাকা পোস্টকে বলেন, এবি পার্টির নেতারা যুক্ত হলে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ ও দায়িত্ব বণ্টনের প্রশ্ন সামনে আসবে। যা এনসিপির অভ্যন্তরে নতুন নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সে কারণে আপাতত অন্য কোনো দলের সঙ্গে একীভূত হওয়ার পরিবর্তে সারাদেশে সাংগঠনিক বিস্তার ও নেতৃত্ব বিকাশের দিকেই মনোযোগ দিচ্ছি আমরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলটির আরেকজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ‘ধরুন, এবি পার্টির ১০ জন নেতা এলেন। তাদেরও সাংগঠনিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। কিন্তু যেসব পদে তাদের বসানো হবে, সেখানে তো আমাদের নেতারাই কাজ করছেন। আমরা এখন নেতৃত্বের পরিধি বাড়াতে চাই, সংকুচিত করতে চাই না।’
এনসিপির একজন যুগ্ম সদস্য সচিব বলেন, ‘এবি পার্টি ও আমরা একটি জোটে আছি (জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট)। আন্দোলনও একসঙ্গে করছি। তাই এখন একীভূত হওয়ার তেমন প্রয়োজন নেই। গত কয়েক মাসে বিষয়টি নিয়ে দলীয় ফোরামেও আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি। তবে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে এলে আবার বিষয়টি সামনে আসতে পারে।’
এই নেতা আরও বলেন, একীভূত হওয়ার বিষয়ে আমাদের মতো এবি পার্টির ভেতরেও ভিন্ন মত রয়েছে। তাই যারা আগ্রহী, তাদের কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে এনসিপিতে যোগ দিচ্ছেন।’
তবে, সাংগঠনিকভাবে একীভূত হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলেও অন্য দলের নেতাকর্মীদের এনসিপিতে যোগ দেওয়ার পথ খোলা রাখা হয়েছে। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, এবি পার্টির কয়েকজন নেতা ইতোমধ্যে এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন। আরও কয়েকজনের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এনসিপি যুগ্ম সদস্য সচিব ও লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য আকরাম হোসাইন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘এবি পার্টি থেকে কিছু নেতাকর্মী আমাদের দলে যোগ দিয়েছে। আরও কিছু নেতাকর্মী যোগদানের বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। আমাদের আলোচনা ইতিবাচকভাবে সামনে এগোচ্ছে।’

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া সামনের সারির নেতাদের নিয়ে গঠিত হয় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির ছয়জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
এদিকে এবি পার্টির নেতারা বলছেন, এবি পার্টি ও এনসিপির একীভূত হওয়া নিয়ে দলে আলোচনা হলেও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার পর দলের সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আবার দুই দলের একীভূত হওয়ার বিষয়ে দলটির ভেতরে মতৈক্যও গড়ে ওঠেনি।
দলটির কেন্দ্রীয় দুইজন নেতা মনে করছেন, এনসিপির সঙ্গে একীভূত হলে দলের নতুন নাম, নেতৃত্বের কাঠামো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের যথাযথ মূল্যায়ন নাও হতে পারে। এসব কারণে আপাতত তারা একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সময় নিতে চান।
এসব বিষয়ে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘এ ব্যাপারে বলার মতো কোনো অগ্রগতি নেই। দুটি রাজনৈতিক দলের একীভূত হওয়া সহজ বিষয় না। এর জন্য উভয় দলের তৃণমূল থেকে শুরু করে দলের সর্বোচ্চ পর্ষদে একমত হওয়ার ব্যাপার আছে।’
এ বিষয়ে যদি কোনো অগ্রগতি থাকে তাহলে তা অবশ্যই জনপরিসরে ঘোষণা করা হবে বলেও উল্লেখ করেন মঞ্জু।
দলটির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘এটা নিয়ে কথাবার্তা চলছে। আলোচনা থেমে যায়নি। আবার খুব বেশি অগ্রগতিও হয়নি।’
দলীয় ফোরামে কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না— জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেহেতু কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তাই এ বিষয়ে দলীয়ভাবে এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ারও কিছু নেই।’
উভয় দলের নেতার বলছেন, এবি পার্টি ও এনসিপির মধ্যে আদর্শগতভাবে বেশকিছু জায়গায় মিল আছে। বিশেষ করে, বর্তমান দ্বি-দলীয় রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে গিয়ে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলা, সরকারি দলের একচ্ছত্র ক্ষমতার অবসান ঘটানো এবং বর্তমান রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কার ইস্যুতে দুই দলের অবস্থান কাছাকাছি। এ কারণেই একীভূত হওয়ার আলোচনা শুরু হয়েছিল।
তারা আরও বলছেন, বর্তমানে একীভূত হওয়ার উদ্যোগ ধীরগতিতে চললেও ১১ দলীয় জোটের শরিক হিসেবে বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দলের মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সমন্বয় রয়েছে। রাজপথে একসঙ্গে কর্মসূচিও পালন করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, একীভূত হওয়ার উদ্যোগ আপাতত ধীরগতিতে চললেও বিষয়টি পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়নি। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তন এলে দুই দলের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে। তবে, বর্তমান পরিস্থিতিতে উভয় দলই নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
এএইচআর/এমএসআই/জেডএস
