দীর্ঘদিন পর বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (১১ জুলাই) রাত ৮টায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে শুরু হওয়া বৈঠক প্রায় দুই ঘণ্টা চলে এবং রাত ১০টার দিকে শেষ হয়।
বৈঠক-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচন, দলের জাতীয় কাউন্সিল, সাংগঠনিক কার্যক্রম, নেতাকর্মীদের অর্থনৈতিক পুনর্বাসন এবং দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, এসব বিষয়কে কেন্দ্র করেই মূল আলোচনা হয়। পাশাপাশি দেশের দক্ষিণাঞ্চলের চলমান বন্যা পরিস্থিতি ও ত্রাণ কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা হয়।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে থেকে শুরু করা যেতে পারে, এ নিয়ে সদস্যদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়। অধিকাংশ সদস্য চলতি বছরের শেষ দিকে নির্বাচন শুরুর পক্ষে মত দেন। তবে কোনো নির্দিষ্ট মাস বা সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়নি। আলোচনার একপর্যায়ে স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. জাহিদ হোসেনের ‘সেপ্টেম্বরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হওয়া’ সংক্রান্ত মন্তব্য নিয়েও আলোচনার টেবিলে কথা ওঠে। কিন্তু বিএনপি চেয়ারম্যানসহ উপস্থিত সদস্যরা বিষয়টি নাকচ করে দেন। বেশির ভাগ সদস্য মত দেন, দলীয় প্রতীকবিহীন এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনেক চ্যালেঞ্জিং হবে। কারণ অধিকাংশ জায়গায় দলের একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী ইতোমধ্যে নির্বাচনী মাঠে বিভিন্নভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন। সেখানে একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। তাই এখন থেকেই প্রস্তুতি শুরু করতে হবে।
আরেকটি সূত্র জানায়, বৈঠকে কোনো কোনো সদস্য বলেন, দলের নেতাকর্মীরা বিগত ১৭ বছর নানাভাবে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। কেউ চাকরি, কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য হারিয়েছেন; ঠিকমতো বাসা-বাড়িতেও থাকতে পারেন নাই। এখন তাদের কীভাবে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়। তখন বিএনপি চেয়ারম্যানসহ বেশিরভাগ সদস্য মতামত দেন যে, যাদের যোগ্যতা আছে, তাদের মূল্যায়ন করার ব্যাপারে আশ্বস্ত করা হয়। তবে বিগত আওয়ামী লীগের মতো শুধু রাজনৈতিক ইতিহাস দেখে চাকরি দেবে না বিএনপি।
স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য জানান, বৈঠকের মূল আলোচনার আরেকটি বিষয় ছিল দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমকে কীভাবে আরও গতিশীল করা যায় সেটি। এই ক্ষেত্রে দলের অঙ্গ-সংগঠনের যেসব কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে, সেগুলো ভেঙে নতুন কমিটি গঠনের পক্ষে মতামত উঠে আসে বৈঠকে। এরপর দুজন সদস্য দলের জাতীয় কাউন্সিল করার বিষয়টি আলোচনায় তোলেন। এর প্রেক্ষিতে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, দলের কাউন্সিল হবে। এই ক্ষেত্রে চলতি বছরের শেষ দিকে কাউন্সিল করার পরামর্শ আসলেও মাস কিংবা তারিখ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
এছাড়া বর্তমান বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা ও ত্রাণ কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানা গেছে। পাশাপাশি বৈঠকে দেশে কীভাবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা যায়, বেকারত্ব কমিয়ে আনাসহ ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, সারাদেশে খাল পুনঃখননসহ যেসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাকি প্রতিশ্রুতিগুলো আগামী দিনে কীভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
জানতে চাইলে স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, বৈঠকে দলের সাংগঠনিক অবস্থা, বন্যা পরিস্থিতি ও দেশের সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, অনেক দিন পর স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়েছে। এখন থেকে নিয়মিত বৈঠক হবে। আজকের বৈঠকে দেশের সমসাময়িক রাজনীতির পাশাপাশি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচনের পর এটি দলটির স্থায়ী কমিটির তৃতীয় সভা। এর আগে চলতি বছরের ৪ এপ্রিল ও ১৭ মে কমিটির দুটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. আব্দুল মঈন খান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমান প্রমুখ। এছাড়া বিদেশে চিকিৎসাধীন স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসও ভার্চুয়ালি বৈঠকে যুক্ত ছিলেন।
এএইচআর/এমএসএ
