রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘদিনের মিত্র ও সমমনা দলগুলোকে পাশ কাটিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপি একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা বা ‘একলা চল’ নীতি অবলম্বন করছে বলে অভিযোগ তুলেছেন নির্বাচনের আগে যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া জোটের বিভিন্ন শরিক দলের নেতারা।
সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্ত, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতিতে জোটের শরিকদের উপেক্ষা করা হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ। এর মধ্য দিয়ে দলটির একলা চল নীতি বা কৌশলগত অবস্থান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন তারা।
দীর্ঘদিনের মিত্র দলগুলোর নেতাকর্মীরা জানান, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল যুগপৎ আন্দোলনের শরিক গণতন্ত্র মঞ্চ ও ১২ দলীয় জোটসহ বেশ কিছু সমমনা রাজনৈতিক দল। তবে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে চেহারা পাল্টাতে শুরু করেছে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া দলটি। তারা হয়তো মনে করছে এই মুহূর্তে দেশে তাদের জনপ্রিয়তাই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট ছিল, যার ফলে অন্য কোনো দলকে ক্ষমতার ভাগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তারা অনুভব করছে না।
তারা বলেন, ক্ষমতার সমীকরণ সবসময়ই জটিল। আন্দোলনে একতাবদ্ধ থাকলেও ক্ষমতার চূড়ায় পৌঁছে দলগুলো সাধারণত নিজেদের একক আধিপত্য ধরে রাখতে চায়। বিএনপিও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধুদের এভাবে দূরে ঠেলে দিলে ভবিষ্যতে যেকোনো রাজনৈতিক সংকটে দলটি একাকীত্বে ভুগতে পারে বলেও জানান তারা।

শরিক দলগুলোর একাধিক নেতার অভিযোগ, রাষ্ট্র সংস্কার বা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিএনপি এখন আর আগের মতো আমাদের সঙ্গে আলোচনা করছে না বা পরামর্শ নিচ্ছে না। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে শরিকদেরকে পাশ কাটিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় একক কর্তৃত্ব বা ‘একলা চল’ নীতি অবলম্বন করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি দলের শীর্ষ এক নেতা বলেন, "আন্দোলনের সময় আমরা সবাই রাজপথে ছিলাম। কিন্তু এখন দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো এক অদৃশ্য কারণে বিএনপি আমাদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে চলছে। এটা জোটের ঐক্যের জন্য শুভলক্ষণ নয়।"

বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর সদস্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়ক আবু হানিফ ঢাকা পোস্টকে বলেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক লড়াইয়ে পাশে থাকা শরিক দলগুলোকে সরকার পরিচালনায় বিএনপির যথাযথ মূল্যায়ন করা উচিত।
তিনি বলেন, শরিকদের কেবল প্রয়োজনের সময় ব্যবহার করে পরে উপেক্ষা করলে জোট দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বিএনপি যদি দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে চায়, তবে শরিক দলগুলোর সম্মান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে ভবিষ্যতে দলটি মিত্রহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে গণঅধিকার পরিষদসহ শরিক দলগুলো বিএনপিকে সব সময় সমর্থন জুগিয়েছে। এছাড়া, আন্দোলনের সময় জাতীয় সরকার গঠনের বিষয়ে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছি। আমরা আশা করি, জোটের যোগ্য নেতাদের মন্ত্রিসভা ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অন্তর্ভুক্ত করে জনগণের কাছে সরকারের সেবা ও সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দিতে সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে সরকার।
ভাসানী জনশক্তি পার্টির চেয়ারম্যান শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গে কাজ করেছি। ভবিষ্যতেও সেই রাজনৈতিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
এ বিষয়ে ১২-দলীয় জোটের মুখপাত্র ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব শাইখুল হাদিস ড. গোলাম মহিউদ্দিন ইকরাম বলেন, সরকার গঠনের পর বিএনপির সঙ্গে শরিক দলের এখনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়নি। তবে দেশ ও জাতির স্বার্থে বিএনপির আমন্ত্রণ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করব।
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক ঢাকা পোস্টকে বলেন, এখন পর্যন্ত সরকারের সঙ্গে শরিক দলের নেতাকর্মীদের আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়নি। আমরা সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছি। পাশাপাশি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও চিন্তা-ভাবনা করছি।
তবে ‘একলা চল’ নীতির বিষয়টি সরাসরি স্বীকার করছে না বিএনপির হাইকমান্ড। তাদের দাবি, বিএনপি কোনো দলকে বা জোট শরিকদের বাদ দিয়ে চলছে না, বরং রাষ্ট্র সংস্কারের প্রাথমিক কাজগুলো দ্রুত সম্পন্ন করার স্বার্থে কিছু সিদ্ধান্ত এককভাবে নিতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিএনপি নির্বাচন করেছে এককভাবে। শেষের দিকে আন্দোলন সংগ্রামও করেছে এককভাবে। আর এখন যেহেতু আওয়ামী লীগ নেই। তাই জোট প্রার্থীরাও যদি সরকারে আসে তাহলে সরকারের বিরোধী পক্ষ বলে কিছু থাকে না। স্বাভাবিক কারণেই তখন রাজনীতিতে একটি শূন্যতা তৈরি হবে। এছাড়া আমরা আরেকটু অপেক্ষা করে দেখি, সামনে পরিবেশ-পরিস্থিতি কোন দিকে যায়।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, প্রথম তিন চার মাস তো আমাদের একটু সময় লেগেছে দেশটাকে গোছাতে। আমাদের যে চ্যালেঞ্জ ছিল, যে সমস্ত প্রতিশ্রুতিগুলো ছিলো সেগুলোকে আমাদের ঠিক করে সামনে নিয়ে আসতে একটু সময় লেগেছে। এখন দেখবেন সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে, কোন অসুবিধা নেই।
এদিকে জানা গেছে, সংসদ নির্বাচনে শরিক দলগুলোর মধ্যে আসন বন্টন নিয়ে যে অসন্তোষ বা রাজনৈতিক টানাপোড়ন রয়েছে, সেসব বিষয়ে শরিক দলগুলোর মান ভাঙাতে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামীকাল ২০ জুলাই যমুনায় একটি বৈঠক ও নৈশভোজের আয়োজন করতে যাচ্ছেন। সেখানে তারেক রহমানের সঙ্গে শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের খোলামেলা আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান ঢাকা পোস্টকে বলেন, আগামী ২০ জুলাই যমুনায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে বৈঠকে অংশগ্রহণকারী দল বা আলোচ্যসূচি সম্পর্কে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের আগে বিএনপির নেতৃত্বে যুগপৎ আন্দোলনে চারটি জোটসহ নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে প্রায় ৪০টি রাজনৈতিক দল সক্রিয় ছিল। নির্বাচনের সময় শরিকদের মধ্যে ১১টি দলকে ১৬টি আসন ছেড়ে দেয় বিএনপি। সরকার গঠনের পর শরিকদের মধ্য থেকে দুজন নেতা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেও অধিকাংশ দল এখনো কোথাও কোনো দায়িত্ব পাননি।
এএএম/জেইউ/এমএসএ
