বিজ্ঞাপন

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আজ শরিক দলগুলোর বৈঠক

দূরত্ব ঘোচানোর উদ্যোগ নাকি নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ?

দূরত্ব ঘোচানোর উদ্যোগ নাকি নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ?

সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর যুগপৎ আন্দোলনের শরিক রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ও সমন্বয় জোরদারে আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আজ (২০ জুলাই) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রায় ৪০টি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জানিয়েছেন, এই বৈঠকে অংশ নেওয়ার জন্য শরিক দলগুলোর প্রায় দেড় শতাধিক নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, যুগপৎ আন্দোলনের সহযোগী দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ আরও জোরদার করা এবং সরকারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তাদের সরাসরি অবহিত করা এই বৈঠকের অন্যতম উদ্দেশ্য। পাশাপাশি শরিকদের মতামতগুলো ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনায় বিবেচনায় নেওয়ার আশ্বাসও বৈঠকে দেওয়া হতে পারে।

তবে সরকারের বিগত কয়েক মাসের কর্মকাণ্ড ও পূর্ব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে শরিকদের একাংশের মধ্যে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হওয়ায়, এই বৈঠকটি নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ নাকি রাজনৈতিক নতুন সমীকরণের সূচনা, তা নিয়ে অনেকের কৌতূহল আছে। পাশাপাশি এই বৈঠক থেকে প্রধানমন্ত্রী শরিকদের কী বার্তা দেবেন, সেটি নিয়েও দলগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ।

বিএনপির অন্যতম শরিক দল বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, দাওয়াতপত্রে শুভেচ্ছা বিনিময় ও সৌজন্য সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। টুকটাক আলোচনা হয়তো হবে। প্রতিটি দল থেকে পাঁচজন করে আমন্ত্রণ জানানো হলে বিরাট সংখ্যক লোক হবে। ফলে এ ধরনের বড় বৈঠকে সিরিয়াস রাজনৈতিক আলোচনার সুযোগ খুব একটা থাকে না। তারপরও আমার ধারণা, কিছু আলাপ-আলোচনা তো হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শরিক দলের এক শীর্ষ নেতা বলেন, শরিকদের অবমূল্যায়নসহ নানা কারণে গত ৫ মাসে সরকারের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। সেই কারণে সৌজন্য সাক্ষাতের পাশাপাশি ডিনারের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে কোনো আলাপের সুযোগ হবে বলে মনে হয় না। তবে প্রধানমন্ত্রী যদি নিজে আলোচনা তোলেন, তখন নানা বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

এই নেতা আরও বলেন, আলোচনার সুযোগ তৈরি হলে তখন বিগত ৫ মাসে সরকারের জার্নির ভালো দিকগুলো যেমন আসবে, তেমনি রাজনৈতিক দিক থেকে সরকার কিছুটা পিছিয়েও যে পড়েছে এবং মাঠ যে কিছুটা জামায়াতকে ছেড়ে দিয়েছে, সেগুলোও আমরা আলোচনায় আনব। এছাড়া সরকার আইনশৃঙ্খলা ও জানমালের নিরাপত্তায় খুব একটা ভালো করতে পারছে না, এ বিষয়গুলোও আসবে।

শরিক দলের নেতারা বলছেন, বৈঠকের আলোচনায় সরকারের বিগত পাঁচ মাসের কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি নির্বাচনের আগে বিএনপির দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসবে। বিশেষ করে বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী ‘রেইনবো নেশন’ গঠনের জন্য ‘রেইনবো সরকার’ বা জাতীয় সরকার গঠনের যে কথা বলা হয়েছিল, তার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলবেন শরিক নেতারা।

বিএনপির নেতৃত্বে পরিচালিত যুগপৎ আন্দোলনে চারটি জোটসহ নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে প্রায় ৪০টি রাজনৈতিক দল সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় শরিক দলগুলোর মধ্যে ১১টি দলকে ১৬টি আসন ছেড়ে দেয় বিএনপি। পরবর্তীতে নতুন সরকার গঠনের পর শরিক দলগুলোর মধ্য থেকে দুজনকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়

পাশাপাশি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের নীতি ও পদক্ষেপের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ তুলে ধরার আশা প্রকাশ করছেন তারা। এর মধ্যে অন্যতম হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া এবং সরকারের খাল খনন কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের এলাকার খালগুলোকে দখল ও দূষণমুক্ত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শরিক একটি দলের শীর্ষ নেতা বলেন, শরিকদের সঙ্গে সরকার তাদের সম্পর্কটা এখানেই শেষ করবে, নাকি সেটাকে ভবিষ্যতেও চালিয়ে যাবে, এগুলো আলোচনায় আসবে। বিএনপি ২০২২ সাল থেকে জাতীয় সরকারের কথা বলে আসছিল। শরিকদের মধ্য থেকে ২ জনকে মন্ত্রী করলেই তো সেটা জাতীয় সরকার হয়ে যায় না। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে ‘রেইনবো নেশন’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। রেইনবো সরকার না হলে রেইনবো নেশন কীভাবে হবে? আমাদের ধারণা, সুযোগ পেলে সবাই এই বিষয়গুলো তুলবে। এ ছাড়া সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আছে, এটাও আলোচনায় আসবে।

বাংলাদেশ জাতীয় দলের (বিলুপ্ত) সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা, যিনি নির্বাচনের আগে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন। এই বৈঠকে তাকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের ডেকেছেন, আমরা যাব। যাওয়ার পর কী ধরনের আলোচনা হবে, তখন আসলে বলতে পারবো।

গণসংহতি আন্দোলনের নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল বলেন, বৈঠকে আলোচনার সুযোগ তৈরি হলে আমাদের পক্ষ থেকে সরকারের বিভিন্ন নীতি ও পদক্ষেপের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ তুলে ধরা হবে।

বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের অন্যতম শরিক জোট ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই জোটের শরিক দল নাগরিক ঐক্য ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) থেকে কাউকে প্রার্থী না করায় নির্বাচনের আগমুহূর্তে বিএনপির সঙ্গে দল দুটির কিছুটা তিক্ততা তৈরি হয়েছিল। তবে অতীতের সেই মান-অভিমান ভুলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে এ বৈঠকে দল দুটিকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

তবে জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন জানিয়েছেন, তাদের দল এই বৈঠকে অংশ নেবে না এবং বিষয়টি ইতোমধ্যে বিএনপিকে চিঠির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে।

দলটির পক্ষ থেকে দেওয়া চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, রাষ্ট্র সংস্কার, জুলাই সনদ ও গণভোটের প্রশ্নে একটি সুস্পষ্ট জাতীয় অবস্থান ও রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে ওঠার আগে বিএনপির সঙ্গে পৃথক কোনো রাজনৈতিক বৈঠকে অংশগ্রহণ করা ঠিক হবে না। এটি জেএসডির বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান, অগ্রাধিকার এবং জনগণের কাছে দেওয়া অঙ্গীকার সম্পর্কে অনাকাঙ্ক্ষিত বিভ্রান্তির জন্ম দিতে পারে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, এই মুহূর্তে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে রাখাই তাদের মূল রাজনৈতিক দায়িত্ব। সার্বিক এই বিবেচনা থেকে বিএনপির প্রস্তাবিত বৈঠকে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে জেএসডি।

অন্যদিকে মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্য বৈঠকে অংশ নেবে কি না, সে বিষয়ে ১৯ জুলাই রাত ৮টা পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আমি এই মুহূর্তে বগুড়ায় আছি। আমরা এখনও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেব কি না, সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিনি।

উল্লেখ্য, বিএনপির নেতৃত্বে পরিচালিত যুগপৎ আন্দোলনে চারটি জোটসহ নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে প্রায় ৪০টি রাজনৈতিক দল সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় শরিক দলগুলোর মধ্যে ১১টি দলকে ১৬টি আসন ছেড়ে দেয় বিএনপি। পরবর্তীতে নতুন সরকার গঠনের পর শরিক দলগুলোর মধ্য থেকে দুজনকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এএইচআর/এমএসএ

বিজ্ঞাপন