বিজ্ঞাপন

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক ও নৈশভোজ

সরকারের সিদ্ধান্তে ‘অংশগ্রহণ’ নেই, অনেক অভিযোগ-অনুযোগ শরিকদের

সরকারের সিদ্ধান্তে ‘অংশগ্রহণ’ নেই, অনেক অভিযোগ-অনুযোগ শরিকদের

সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর সঙ্গে প্রথমবার আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সোমবার (২০ জুলাই) সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২ দলীয় জোট, সমমনা জাতীয়তাবাদী জোট, গণতান্ত্রিক বাম জোট, ইসলামী ঐক্যজোটসহ ৪১টি দলের শতাধিক নেতা অংশ নেন।

দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে শরিক নেতারা বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে তাদের অবমূল্যায়নের অভিযোগ তোলেন। প্রধানমন্ত্রীও সরকার গঠনের পর নানা ব্যস্ততার কারণে শরিকদের সঙ্গে বসতে না পারার বিষয়টি উল্লেখ করেন এবং আগামী দিনে তাদের যথাযথ মূল্যায়নের আশ্বাস দেন।

বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতারা জানান, শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরপর শরিক দলের পক্ষ থেকে সাতজন বক্তব্য রাখার সুযোগ পান। তাদের মধ্যে ছিলেন- জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) অংশের চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ এবং ইসলামী ঐক্যজোটের একজন নেতা। পরে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

পাঁচ মাস পর একই টেবিলে যুগপৎ শরিকরা—যমুনার বৈঠকে অভিযোগ, আত্মসমালোচনা আর ‘সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলার’ প্রতিশ্রুতি | ছবি– পিএমও

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈঠকে বক্তব্য দেওয়া সাতজনের মধ্যে সরকারের নানা সিদ্ধান্তের সমালোচনা এবং শরিকদের অবমূল্যায়নের অভিযোগ তুলে সবচেয়ে সরব ছিলেন সাইফুল হক ও সুব্রত চৌধুরী।

তাদের অভিযোগ ছিল, আন্দোলনের সময় বিএনপি শরিকদের যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু সরকার গঠনের পাঁচ মাস পার হলেও তাদের খোঁজখবর নেওয়া হয়নি। আগে জোটের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় বিএনপির একটি লিয়াজোঁ কমিটি ছিল। সেই কমিটি নিয়মিত শরিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত এবং বৈঠক করত। কিন্তু এখন সেই কমিটির অনেকেই সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হয়ে গেছেন। ফলে শরিকদের সঙ্গে আগের মতো আর যোগাযোগ নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বৈঠকে অংশ নেওয়া এক নেতা জানান, এ বিষয়ে সুব্রত চৌধুরী তার বক্তব্যে বলেন, “আমরা রাজপথে ছিলাম, অনেক সম্মানের সঙ্গে ছিলাম। এখন তো আমাদের ফুটপাতে বসিয়ে দিয়েছেন। সারা দেশের মানুষ জানত, আমরা নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার অংশ। কিন্তু এখন খুব বিব্রতকর অবস্থায় আছি। বিএনপি তো সবাইকে নিয়ে সরকার চালানোর কথা ছিল। সেখানে এখন আমরা উপেক্ষিত হচ্ছি। এই দূরত্ব সবার জন্যই অসুবিধার। তবে অনেক দিন পর ডেকেছেন, সেটি ভালো লেগেছে।”

বৈঠকের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল শরিকদের অবমূল্যায়নের অভিযোগ। সাইফুল হক ও সুব্রত চৌধুরী বলেন, আন্দোলনের সময় শরিকদের গুরুত্ব দেওয়া হলেও সরকার গঠনের পর তারা উপেক্ষিত হয়েছেন। সরকারি অনুষ্ঠান, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ, এমনকি সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রেও শরিকদের সঙ্গে কোনো সমন্বয় হয়নি বলে তারা অভিযোগ করেন।

আরেকটি সূত্র জানায়, সরকারের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শরিক নেতাদের আমন্ত্রণ না পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন সুব্রত চৌধুরী। তিনি অভিযোগ করেন, “সরকারের অনেক অনুষ্ঠান হয়, কিন্তু সেখানে শরিক দলের নেতাদের দাওয়াত দেওয়া হয় না।”

জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন থেকে চেষ্টা করব, সবাইকে নিয়ে চলার।’

যুগপৎ শরিক দলের একাধিক নেতা জানান, বৈঠকে কেউ কেউ রসিকতার সুরে বলেন, ‘এটা কি আমাদের ফেয়ারওয়েল নৈশভোজ?’ উত্তরে প্রধানমন্ত্রীও রসিকতা করে বলেন, ‘না, এটা ওয়েলকাম ডিনার।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সুব্রত চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘এটা তো সঠিক যে গত পাঁচ মাসে শরিকদের সঙ্গে বিএনপির তেমন কোনো যোগাযোগ ছিল না। সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও শরিকদের মতামত নেয়নি। এসব বিষয়ই বৈঠকে উঠে এসেছে। তবে দেরিতে হলেও এই বৈঠকের আয়োজন করায় আমরা প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছি।’

হাত মেলালেন প্রধানমন্ত্রী, শরিকদের অভিযোগের জবাবে দিলেন নিয়মিত সমন্বয়ের আশ্বাস | ছবি– পিএমও

নাম প্রকাশ না করার শর্তে শরিক দলের একাধিক শীর্ষ নেতা জানান, বৈঠকে সাইফুল হক বলেন, ‘শরিকদের যেভাবে বৈঠকের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, সেটি মর্যাদাপূর্ণ হয়নি। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মাধ্যমে সরাসরি যোগাযোগ করে আমন্ত্রণ জানানো উচিত ছিল। সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর বৈঠক হলেও এরই মধ্যে শরিকদের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে।’

সূত্রটি আরও জানায়, বিএনপি সরকার গঠনের পর সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ প্রশাসকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগে শরিকদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা না হওয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সাইফুল হক। তিনি বলেন, ‘আপনাদের সঙ্গে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, বিএনপির ‘একলা চলো’ নীতির প্রমাণই হচ্ছে গত পাঁচ মাসে সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন পর্যায়ে শত শত নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অথচ যুগপৎ শরিকদের সঙ্গে কোনো পর্যায়ে আলাপ বা পরামর্শ করা হয়নি।’

সংরক্ষিত নারী আসনে জোটের কাউকে মনোনয়ন না দেওয়া নিয়েও সাইফুল হক ও সুব্রত চৌধুরী প্রশ্ন তোলেন বলে জানা গেছে। শরিক দলের দুই শীর্ষ নেতা ঢাকা পোস্টকে জানান, এই দুই নেতা বৈঠকে বলেন, বিএনপি সংরক্ষিত ৩৬টি নারী আসনে মনোনয়ন দিলেও শরিকদের সঙ্গে কোনো সমন্বয় করেনি। অথচ জামায়াত তাদের সংরক্ষিত মাত্র ১৩টি আসন থেকেও শরিকদের সঙ্গে সমন্বয় করেছে।

রাজপথের ঐক্য থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার সমীকরণ, বিএনপি সরকার গঠনের পর যুগপৎ জোটে ফিরে এলো সংলাপ ও অংশীদারিত্বের প্রশ্ন | ফাইল ছবি

এ প্রসঙ্গে শরিক দলের আরেক শীর্ষ নেতা জানান, রসিকতার সুরে সাইফুল হক বলেছেন, ‘১০০টি আপেল থাকলে যদি মনে করেন ১০০টিই বিএনপির ঝুড়িতে থাকতে হবে, তাহলে সেটা কেমন কথা? এতে বন্ধুত্বের কোনো নমুনা দেখা যায় না। সবাইকে নিয়ে চলতে হলে কী ধরনের নীতি অনুসরণ করা হবে, সেটি বিএনপির স্পষ্ট করা উচিত।’

তবে শরিক দলের নেতারা জানিয়েছেন, বিলম্বে হলেও সরকারের পক্ষ থেকে শরিকদের সঙ্গে বসার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা হয়েছে। এজন্য তারা প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান এবং ভবিষ্যতে নিয়মিত রাজনৈতিক সংলাপের প্রত্যাশা করেন তারা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাইফুল হক ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘বৈঠকটি ছিল মূলত শুভেচ্ছা বিনিময়ের। সেখানে আমরা বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছি। সরকারের গত পাঁচ মাসের জনঘনিষ্ঠ কাজের প্রশংসা করেছি। আবার রাজনৈতিক দিক থেকে সরকার যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে, সেটিও উল্লেখ করেছি। সরকারকে আমরা মাঠে দেখছি, কিন্তু দল হিসেবে মাঠে বিএনপির উপস্থিতি দেখছি না। এমনকি যুগপৎ আন্দোলনের শরিকরাও আগের মতো মাঠে সরব নয়– এ বিষয়গুলো তুলে ধরেছি। আমরা প্রশ্ন রেখেছি, এতে কি মাঠ জামায়াত ও এনসিপির জন্য ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে না?’

শরিকদের সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বীকার করেন, সরকারের বিভিন্ন কাজের ব্যস্ততায় এতদিন বৈঠক করা সম্ভব হয়নি। তবে তিনি ভবিষ্যতে সবাইকে সঙ্গে নিয়েই সরকার পরিচালনা, নিয়মিত রাজনৈতিক সংলাপ এবং শরিকদের যথাযথ মূল্যায়নের আশ্বাস দেন। পাশাপাশি যুগপৎ আন্দোলনের ৩১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেন।

তিনি আরও বলেন, ‘গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই সময়ে ৩১ দফা ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় কাজ। এটি যৌথভাবে বাস্তবায়নের ওপর আমরা গুরুত্বারোপ করেছি। কোনো দেনদরবারের উদ্দেশ্যে এই বৈঠক হয়নি।’

তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমাতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসা করে এক শরিক নেতা বলেন, ‘তার প্রতিফলন নৈশভোজের আয়োজনেও দেখা গেছে।’ রসিকতার সুরে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের দেড়শ টাকার নৈশভোজ করিয়েছেন। অথচ সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এক মাসের খাবারের বিলই ছিল প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। বর্তমান সরকার হয়তো সেটিকে লাখ টাকায় নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে।’

আলোচিত এ বৈঠক শেষে সোমবার রাতে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, এটা একটা বড় ঘটনা যে প্রধানমন্ত্রী অন্যান্য যারা যুগপৎ আন্দোলন করেছেন, তাদের সবার সঙ্গে বসেছেন, কথা বলেছেন এবং ভবিষ্যতের কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, এই ৫ মাসের মধ্যে বিভিন্ন কাজের তাড়াহুড়ার জন্য বা কাজের অগ্রাধিকারের কারণে দলগুলোর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে সরকার যে কাজগুলো করেছে, সেগুলো ছিল জনগণের একদম কাছাকাছি যাওয়ার কাজ। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে যে, সরকারকে গুছিয়ে জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়ার কাজটা তিনি শুরু করেছেন।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শরিকদের বলেছেন তিনি এরপরে প্রায়শই এবং যতটা দ্রুত সম্ভব হবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসবেন। রাজনৈতিক দলগুলো আবারও একসঙ্গে কাজ করবে। সবচেয়ে বড় বিষয়, তিনি বলেছেন, যে ৩১ দফা কর্মসূচি আমরা একসঙ্গে দিয়েছিলাম, সেই ৩১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়ন হবে।

এএইচআর/বিআরইউ