সত্তর ভাগ মানুষের রায়ের পরও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকার পৃষ্ঠপ্রদর্শন করছে। এক কোটি কর্মসংস্থানের ঘোষণা দিলেও সরকার এখনো ৫০ হাজার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করতে পারেনি। বরং তারা বিভিন্ন পদে দলীয় কোটায় নিয়োগ দিচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বিকেল ৫টায় রাজধানীর ইন্সটিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইইবি) সেমিনার হলে বক্তারা এসব কথা বলেন। ন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশের উদ্যোগে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ প্রকৌশলীদের স্মরণে স্মরণসভা ও আলোচনা অনুষ্ঠান’ আয়োজিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দ্য ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্সের ফেলো এবং দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক প্রকৌশলী ড. মাহমুদুর রহমান। প্রধান বক্তা হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য ড. আতিক মুজাহিদ, সংসদ সদস্য প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজো, জাতীয় নাগরিক পার্টির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, জাতীয় যুব শক্তির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট তারিকুল ইসলাম এবং কুয়েটের সাবেক উপাচার্য ও বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মাকসুদ হেলালী।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশের আহ্বায়ক প্রকৌশলী মো. আব্দুল হামিদ। কোরআন থেকে তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর সমস্বরে গাওয়া হয় জাতীয় সংগীত।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান তিনটি কারণে ইউনিক। প্রথমত, এটি একটি নিরস্ত্র বিপ্লব ছিল। নিরস্ত্র ছেলেমেয়েরা দাঁড়িয়েছিল। দ্বিতীয়ত, এই বিপ্লবে কোনো বিদেশি শক্তি সহায়তা করেনি। যেটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একটি দুর্বলতা ছিল। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের ভারত থেকে সহায়তা নিতে হয়েছিল। আজও তারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকার করে না। তারা বলে, একাত্তর আসলে তারা পাকিস্তানকে পরাজিত করে দুভাগ করে দিয়েছে। তৃতীয়ত, এখানে কোনো একক নেতৃত্ব ছিল না। এখানে সবাই নেতা, সবাই যোদ্ধা। এগুলো স্মরণে রাখলে, এই বিপ্লব দীর্ঘায়িত হবে, ব্যর্থ হবে না।
মাহমুদুর রহমান জুলাই অভ্যুত্থানকে বিপ্লব হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আন্দোলন ও অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তন হয়। আমার দৃষ্টিতে জুলাই একটি বিপ্লব এবং এটি চলমান রয়েছে। কারণ এটি পুরো রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তনের জন্য হয়েছে। বক্তব্যে জুলাইয়ের সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বর্তমান সংকটের জায়গা কয়েকটি জায়গায়। এখানে ধর্মভিত্তিক দলগুলো ক্ষমতাপাগল হয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতাকেন্দ্রিক দলগুলো ইন্ডিয়াপাগল হয়ে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের যে সংকটটা রয়ে গেছে, এখানে কেউ ভালো মানুষ হলে ডিসিশন মেকিং প্রসেসে যেতে পারে না। আর যদি কেউ খারাপ মানুষ হয়, আমরা ভালো কোনো ডিসিশন তার থেকে আশা করতে পারি না। এই অবস্থা থেকে উন্নতির জন্য বাংলাদেশের সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক যে সংস্কৃতি সেটার পরিবর্তন ঘটাতে হবে।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী আরও বলেন, সংবিধান সংস্কার কমিশনে আমি বারবার বলেছি, এমনকি আমি সালাহউদ্দিন সাহেবের বাসায় গিয়েও বলেছি, আপনি কেন সংস্কারের পক্ষে আসছেন না? উনি বললেন যে, যে সংস্কারের পক্ষে যদি আমি আসি, তাহলে যে সরকার চালাতে পারব না। সরকারের কাছে ক্ষমতা থাকবে না। কিছু ক্ষমতা চলে যাবে বিরোধী দলের কাছে, কিছু ক্ষমতা চলে যাবে মিডিয়ার কাছে, কিছু ক্ষমতা চলে যাবে বিচারালয়ের। আমি বললাম, এটাই তো হলো বাংলাদেশ। আপনি তাহলে বাংলাদেশের এটা ভিন্ন কোনো জিনিসটা নিয়ে আসছেন?' তিনি বললেন, যেভাবেই বাপ-দাদারা চালিয়েছে, এভাবেই চালাতে হবে। তাহলে ১৭ বছর ধরে ৩১ দফার ভেল্কিভাজি কেন দেখাল, এই কথা বললে তারা গরম হয়ে যায়।
আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, সরকারের প্রথম মাসে সরকার আমাদের সামনে বিভিন্ন গল্পগাথা উপস্থাপন করছেন। কিন্তু বিএনপি যে ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের যে রাজনীতি সেটির ধারাবাহিকতা সেটা আমরা জিয়া পরিবারের উত্তরসূরি থেকে দেখতে পাচ্ছি। ১৯৯১ সালে তিন জোটের রূপরেখা থেকে পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার না মানা, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে নিজেদের মন্ত একজনকে রাখার জন্য রাষ্ট্রপতির মেয়াদ দু-বছর বাড়িয়ে তারা জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। বিএনপি মুখে মুখে সংস্কারের কথা বললেও তাদের অন্তরে ক্ষমতার চেয়ার এবং একক কতৃত্ব নেওয়ার বাসনা। গত পাঁচ মাসে বিভিন্ন জায়গায় দলীয় লোক নিয়োগ দিতে বিএনপি উঠেপড়ে লেগেছে।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ড. আতিক মুজাহিদ এমপি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র তৈরি করা একটা অন্যতম প্রধান আকাঙ্ক্ষা ছিল। আমাদের রাষ্ট্রটা যে সরকারেই আসুক মেধাভিত্তিক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুঃখজনক হল রাষ্ট্র এখনো কোটাভিত্তিক। এখন বিএনপির দলীয় কোটাভিত্তিক বাংলাদেশ চলছে। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান কি কোনো দলীয় শাখা? বিএনপি আমাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় শাখা পরিণত করা হচ্ছে মনে হচ্ছে।
মারদিয়া মমতাজ এমপি বলেন, আমাদের জন্য যেখানে আইন বানানো হয়, সেখানে যেতে কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগে না। আরও অপমানজনক হচ্ছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতার একটা মিনিমাম লেভেল বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। আমরা যখন বিরোধীদল হিসেবে একটা বিল পাস হওয়ার ২০ মিনিট আগে টেবিলে দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তুলি, তখন সেটি সরকারি দলের কাছে হাস্যকর মনে হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন এনইএবির আহ্বায়ক প্রকৌশলী আব্দুল হামিদ। এছাড়া অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা আব্দুল্লাহিল আমান আজমী, জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট তারিকুল ইসলাম, এনসিপির ঢাকা উত্তরের আহ্বায়ক ইন্জিনিয়ার নাবিলা তাসনিদ, শহীদ জাহিদুজ্জামান তানভীনের মা বিলকিস জামান, জুলাইযোদ্ধা প্রকৌশলী ইফফাত আহমেদ, জুলাইযোদ্ধা শাহেদ ইসলাম ও জুলাইযোদ্ধা মোরসালিন ইসলাম বক্তব্য রাখেন।
এমএসআই/এসএম
