বিজ্ঞাপন

জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করা আ. লীগের রাজনৈতিক বাজি ছিল নাকি পতনের শুরু?

জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করা আ. লীগের রাজনৈতিক বাজি ছিল নাকি পতনের শুরু?

২০২৪ সালের জুলাই। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হলেও তা ধীরে ধীরে সরকারবিরোধী সর্বাত্মক গণআন্দোলনে রূপ নেয়। শুরুর দিকে সরকার বিষয়টিকে একটি সীমিত পরিসরের দাবি হিসেবে দেখলেও, জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে এসে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়, কাঁপন ওঠে ক্ষমতার মসনদে। দেশজুড়ে ব্যাপক সংঘর্ষ, হতাহত, গণগ্রেপ্তার ও ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের মুখে আন্দোলনটি একপর্যায়ে সরকার পতনের ‘এক দফা’ দাবিতে পরিণত হয়।

এমনই এক উত্তপ্ত প্রেক্ষাপটে ১ আগস্ট জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। এর আগে ২৯ জুলাই শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গণমাধ্যমকে জানান, দেশব্যাপী সহিংসতা ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সংগঠন দুটিকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। 

বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে উল্টো ফল বয়ে আনে। জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তই আন্দোলনের গতি আরও বেগবান করে এবং সরকারবিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে নতুন সংহতি তৈরি হয়। ফলে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তটিই ছিল আওয়ামী লীগের শেষ রাজনৈতিক বাজি, যা সরকার পতনে রুপ নেয়। 

জামায়াতে ইসলামী বলছে, তৎকালীন সরকার মূলত আন্দোলনকে রাজনৈতিক তকমা দিয়ে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার ফাঁদ পেতেছিল। কিন্তু সে ফাঁদে পা দেয়নি জামায়াত ও শিবির। দলটি কোনো দলীয় রাজনৈতিক কর্মসূচি না দিয়ে বরং নেতা-কর্মীসহ দেশবাসীকে চলমান আন্দোলন সফল করতে রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানিয়েছিল।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কয়েক দিনের মধ্যে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে তা ছড়িয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, ছাত্রলীগের হামলার অভিযোগ এবং ক্রমবর্ধমান প্রাণহানির ঘটনায় জনমনে ক্ষোভ বাড়তে থাকে।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, আন্দোলন আর শুধু কোটার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং সাধারণ মানুষও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানাতে শুরু করেন। জুলাইয়ের শেষ দিকে আন্দোলন মূলত সরকার পতনের এক দফার দিকে ধাবিত হয়। ২৬ জুলাই জামায়াতসহ ডান, বাম ও ইসলামী দলগুলোকে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছিল বিএনপি। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিকভাবে বিরোধী দলের সমন্বিত আন্দোলনের সম্ভাব্য সমীকরণ তৎকালীন সরকারের সামনে নতুন বাধা হিসেবে আবির্ভূত হয়।

বিএনপির ওই আহ্বানের পর ৩০ জুলাই গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম বলেন, বিএনপি মহাসচিব জাতীয় ঐক্যের যে আহ্বান জানিয়েছেন, আমরা তাকে সাধুবাদ জানাচ্ছি এবং ‘জাতীয় ঐক্যে’ জামায়াতে ইসলামীর যোগদানের বিষয়ে আমরা সম্মতি জ্ঞাপন করছি।

আন্দোলন যত তীব্র হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ নেতারা ততই এর পেছনে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলতে থাকেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের একাধিক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, আন্দোলনের আড়ালে ‘জামায়াত-শিবির ও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি’ দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছে। 

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিভিন্ন বক্তব্যে বলেন, আন্দোলনে ‘সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী’ ঢুকে পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তৎকালীন সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও ১৪ দলীয় জোটের নেতারাও একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করেন।

১৪ দলের বৈঠকে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত

২০২৪ সালের ২৯ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে ১৪ দলের বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, বৈঠকে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

গণভবনের ফটকে ওবায়দুল কাদের গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, ‘১৪ দলের নেতারা মনে করেন, বিএনপি-জামায়াত, ছাত্রদল-শিবির ও তাদের দোসর, উগ্রবাদী গোষ্ঠী বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তারা সন্ত্রাস-নৈরাজ্য-হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দেশকে অকার্যকর করার ষড়যন্ত্র করছে। অতি সম্প্রতি চোরাগোপ্তা হামলা করে এবং গুলিবর্ষণ করে সরকারের ওপর দায় চাপাতে তারা দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। পুলিশ বাহিনীর সদস্যসহ মানুষ হত্যা করে লাশ পর্যন্ত ঝুলিয়ে রেখেছে। এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠী যে প্রক্রিয়ায় এসব হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তা ইতিহাসে নজিরবিহীন।’

কাদের বলেন, ‘জাতীয় স্বার্থে দেশবিরোধী এই অপশক্তিকে নির্মূল করা প্রয়োজন। ১৪ দলের এই সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয় জামায়াত-শিবির গোষ্ঠীর অপশক্তির রাজনীতি নিষিদ্ধ করার জন্য। জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।’

জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন

১ আগস্ট সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির এবং তাদের অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, গোয়েন্দা তথ্য ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন ওঠে, দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে সক্রিয় একটি দলকে আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে নিষিদ্ধ করার উদ্দেশ্য ছিল চলমান আন্দোলনকে রাজনৈতিক তকমা দেওয়া। নিষিদ্ধের ঘোষণায় জামায়াত ও শিবির রাজনৈতিক কর্মসূচি দেবে এবং দেশব্যাপী জ্বালাও-পোড়াও হবে, এই সুযোগে আন্দোলনকে রাজনৈতিক হিসেবেই দমন করা সহজ হবে। যদিও দলীয়ভাবে সেদিকে পা বাড়ায়নি জামায়াত।

নিষিদ্ধের পরও নিন্দা-প্রতিবাদেই ক্ষান্ত থাকে জামায়াত

নিষিদ্ধ ঘোষণার পর জামায়াতে ইসলামী প্রকাশ্যে কোনো দলীয় কর্মসূচি ঘোষণা করেনি। ২৯ জুলাইয়ের ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে বেআইনি উল্লেখ করে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান।

২০২৪ সালের ৩০ জুলাই গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে জামায়াত আমীর বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। একটি রাজনৈতিক দল বা জোট অন্য একটি রাজনৈতিক দলের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। বাংলাদেশের আইন ও সংবিধান কাউকে এ এখতিয়ার দেয়নি। কোনো দল বা জোটের অন্য কোনো দলকে নিষিদ্ধ করার ধারা চালু হলে এক দল অন্য দলকে নিষিদ্ধ করতে থাকবে। তখন রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বলে কিছু থাকবে না। জামায়াতে ইসলামী একটি প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংগঠন, যা বাংলাদেশের সব গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছে এবং প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। আওয়ামী লীগ জামায়াতের সঙ্গে বসে অতীতে অনেক আন্দোলন করেছে। দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য কেয়ারটেকার সরকারব্যবস্থার ফর্মুলা জাতির সামনে উপস্থাপন করেছে এবং তার ভিত্তিতে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরকম একটি গণতান্ত্রিক সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার দাবি বেআইনি, এখতিয়ারবহির্ভূত ও সংবিধানপরিপন্থি। জনগণ ১৪ দলের এই দাবি গ্রহণ করবে না।’  

জামায়াতের দাবি অনুযায়ী, তাদের নেতা-কর্মীরা দলীয় পরিচয় প্রকাশ না করে সাধারণ শিক্ষার্থী ও নাগরিকদের সঙ্গে আন্দোলনে অংশ নেন। পরবর্তীতে দলটির নেতারা বিভিন্ন সময় বলেছেন, সরকারের নিষেধাজ্ঞা তাদের রাজপথ থেকে সরাতে পারেনি; বরং কর্মীদের আরও সতর্ক ও কৌশলী করে তুলেছিল।

এ ব্যাপারে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান পরবর্তী এক বক্তব্যে বলেন, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কোনো আদর্শিক আন্দোলন বন্ধ করা যায় না। আমাদের নেতাকর্মীরা জনগণের কাতারেই ছিলেন, জনগণের দাবির পক্ষেই ছিলেন।

পরিচয় গোপন রেখে মাঠে ছিল জামায়াত

আন্দোলনের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন বহু ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে পরবর্তীতে জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের দেখা যায়। দলটির নেতারা পরে স্বীকার করেন, নিরাপত্তা এবং আন্দোলনের বৃহত্তর স্বার্থে অনেকেই পরিচয় প্রকাশ না করেই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘৫ আগস্টের আগে সরকার যখন আন্দোলন থামাতে ব্যর্থ হচ্ছিল, তখন জামায়াত ও ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল মূলত আন্দোলন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার জন্য।’

তিনি বলেন, সরকারের পরিকল্পনা ছিল জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করলে তারা প্রতিবাদে রাস্তায় নামবে এবং এতে আন্দোলনটি ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পরিবর্তে একটি ‘রাজনৈতিক মুভমেন্ট’-এর রূপ নেবে। তবে জামায়াত সচেতনভাবে সরকারের এই ফাঁদে পা দেয়নি এবং কোনো দলীয় কর্মসূচি ঘোষণা করেনি। জামায়াত এই পরিস্থিতিকে ধৈর্যের মাধ্যমে মোকাবিলা করেছে। তারা দলীয় স্বার্থের চেয়ে জাতীয় স্বার্থ এবং জাতির মুক্তিকে বড় করে দেখেছে।

তিনি আরও বলেন, দলীয়ভাবে কোনো কর্মসূচি না দিলেও জামায়াত তাদের কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছিল সাধারণ মানুষের সঙ্গে জুলাই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়ে সরকার পতনের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে। ছাত্র-জনতার সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীদের একাত্ম প্রচেষ্টার ফলেই দীর্ঘদিনের অপশাসন থেকে মুক্তি লাভ করা সম্ভব হয়েছে।

আওয়ামী লীগ নেতাদের রাজপথে ফেরার দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি কর্মীদের চাঙ্গা রাখার একটি কৌশল মাত্র। 

তিনি ব্যঙ্গ করে বলেন, শেখ হাসিনা যখন ফিরবেন, তখন যেন ভারত থেকে নিজের জন্য একটি ফাঁসির দড়ি কিনে নিয়ে আসেন, যাতে বাংলাদেশের মানুষের টাকা খরচ করতে না হয়।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ঢাকা পোস্টকে বলেন, সরকার যখন জামায়াত ও শিবিরকে নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে এবং সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে, তখন তারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং দলীয়ভাবে নীরব থাকাটাকেই প্রতিবাদ হিসেবে দেখেছেন। তারা আইন ভঙ্গ করতে চাননি।

তিনি বলেন, জামায়াত মনে করেছিল যে, সেই মুহূর্তে নিষিদ্ধ হওয়ার বিরুদ্ধে আলাদাভাবে বিক্ষোভ করা নিরর্থক। তখন আসলে আমাদের প্রধান লক্ষ্যই ছিল চলমান এক দফার আন্দোলন, যার মাধ্যমে ‘ফ্যাসিবাদের পতন’ অনিবার্য ছিল বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেছিলাম। তাছাড়া দলীয় নেতা-কর্মীদের অনিয়ন্ত্রিত করতে চাইনি এবং আন্দোলনকে অন্য খাতে প্রবাহিত হতে দিতে চাইনি। নিষিদ্ধ হওয়াকে রাজনীতির একটি সংকীর্ণ ইস্যু না বানিয়ে চলমান আন্দোলনকে একমুখী রাখতে চেয়েছি। আত্মবিশ্বাস ছিল যে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই সরকারের পতন ঘটবে, তাই আলাদা করে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদের প্রয়োজন মনে করিনি।

গোলাম পরওয়ার বলেন, সে সময়কার সরকারি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো রিপোর্ট দিয়েছিল যে আন্দোলনের পেছনে জামায়াত-শিবিরই মূল শক্তি এবং তাদের নিষিদ্ধ করলে আন্দোলন থেমে যাবে। কিন্তু জামায়াত কৌশলী হয়ে আলাদা কোনো ইস্যু তৈরি না করায় সরকারের সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। কারণ দলীয় ব্যানারে মাঠে নামলে সরকার আন্দোলনকে সহজেই ‘জামায়াত-শিবিরের আন্দোলন’ বলে প্রচার করার সুযোগ পেত। 

জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টিকে ‘আওয়ামী লীগ সরকারের মিসক্যালকুলেশন’ উল্লেখ করে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানটা ছিল অর্গানিক অভ্যুত্থান, যেখানে আপামর জনসাধারণের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল। সরকার এই আন্দোলনকে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ হিসেবে না দেখে বরং একটি ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে বিবেচনা করেছিল এবং আন্দোলনের প্রকৃত গতিপ্রকৃতি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনা সরকার মনে করেছিল বিএনপি যেহেতু আন্দোলনে সরাসরি নেই, তাই নিশ্চয়ই জামায়াত এর পেছনে কাজ করছে। 

এই ভুল ধারণা থেকেই ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যাকে তিনি শেখ হাসিনার একটি বড় ‘মিসক্যালকুলেশন’ হিসেবে অভিহিত করেন।

কারণ হিসেবে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলকে দমানো গেলেও জাগ্রত জনতাকে গুলি করে থামানো সম্ভব হয় না। জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের কারণে আন্দোলন বেগবান হয়নি, বরং ১৮ জুলাই থেকে রামপুরা ও শনির আখড়াসহ সারাদেশে যে ভয়াবহ সহিংসতা হয়েছিল এবং সাধারণ মানুষের ওপর পুলিশের পক্ষ থেকে ভারী অস্ত্র ব্যবহারের ফলে আন্দোলন তীব্রতর হয়। তাছাড়া সহিংসতার দৃশ্যগুলো সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সরাসরি মানুষের চোখের সামনে চলে আসায় যারা রাস্তায় নেমেছিলেন তারা তো বটেই, এমনকি ঘরে বসে থাকা মানুষও তীব্রভাবে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, যা এই গণঅভ্যুত্থানকে আরও বেগবান করে তোলে।

জেইউ/জেইউ