জুলাই আন্দোলনে শহীদ পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশ্যে সাবেক সমাজকল্যাণ ও নারী ও শিশু বিষয়ক উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ বলেছেন, শুধু শোক প্রকাশ বা বারবার স্মরণসভা আয়োজন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। শহীদ পরিবারের সদস্যদের নিজেদের সংগঠিত হতে হবে। দেশ গড়ার কাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে হবে। একই সঙ্গে সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ থেকে দূরে থাকতে হবে।
শনিবার (১ আগস্ট) দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা আয়োজিত 'জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের মায়েরা ও পরিবার : অশ্রুর শক্তিতে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়' অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
শহীদ পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে শারমিন এস মুরশীদ বলেন, আপনাদের নিয়ে রাজনীতি করার চেষ্টা হবে। নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে। কিন্তু আপনারা সংকীর্ণ রাজনীতি থেকে নিজেদের মুক্ত রাখুন এবং দেশের কল্যাণে কাজ করুন।
তিনি বলেন, আপনারা যতবার একত্র হবেন, ততবার কাঁদবেন। কিন্তু একসময় এ কান্না থামিয়ে দেশ গড়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করতে হবে। চিরকাল কেউ আপনার হাত ধরে থাকবে না। আপনাদের নিজেদের জায়গা নিজেরাই তৈরি করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শহীদ ও আহত পরিবারের জন্য যতটুকু সম্ভব কাজ করেছে। বর্তমান সরকারের কাছেও প্রত্যাশা রয়েছে, তারা এসব পরিবারকে পুনর্বাসন ও স্বাবলম্বী করে তুলতে কার্যকর উদ্যোগ নেবে।
সাবেক সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা বলেন, এ আন্দোলনের কারণেই আজ অনেক রাজনৈতিক দল দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছে। তাই শহীদ পরিবারের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি অভিযোগ করেন বলেন, জুলাই আন্দোলনের শহীদ ও যোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনো তৈরি হয়নি। আমার বিশ্বাস, সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক বেশি মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। গণকবরগুলোতে কতজন দাফন হয়েছেন, সেটিও আমরা জানি না। এ তালিকা সম্পূর্ণ করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনকালে জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া নারীদের নিয়ে একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রথম ধাপে প্রায় ৯ হাজার জুলাই কন্যাকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তবে অনেক নারী যোদ্ধা নিজেদের নাম নিবন্ধন করতে চাননি, আহত হওয়ার পর হাসপাতাল থেকে গোপনে বাড়ি ফিরে গেছেন। ফলে নারী যোদ্ধাদের প্রকৃত সংখ্যাও এখনো অজানা রয়ে গেছে।
শারমিন এস মুরশিদ বলেন, জুলাই আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস সংরক্ষণ করতে হলে শহীদ, আহত ও নারী যোদ্ধাদের সঠিক তালিকা তৈরি করতে হবে। এ কাজ অসম্পূর্ণ রেখে দেওয়া যাবে না।
তিনি বলেন, সরকার যে আর্থিক সহায়তার কাঠামো তৈরি করেছে, তা দীর্ঘ চিন্তাভাবনার ফল। বিশেষ করে যেসব শহীদ ছোট সন্তান রেখে গেছেন, তাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতেই এ সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেই অর্থ যথাযথভাবে সন্তানদের লালন-পালন ও ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার কাজে ব্যয় করার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, দেশের জন্য রাষ্ট্র গঠনের লড়াই চলমান রয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে কি না। কিন্তু ইতিহাসে বড় ধরনের গণ-আন্দোলনের পূর্ণ রূপ নিতে সময় লাগে। বাংলাদেশেও জুলাই আন্দোলনে নারীদের সাহসী ভূমিকা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো এর স্মৃতি ও প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণ করা। অতীতের মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্রেও সঠিক তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ না হওয়ায় নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তাই শহীদের সংখ্যা বা নির্যাতিতদের তথ্য নিয়ে রাজনীতি না করে নির্ভুল তথ্য সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করে ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কয়েক মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। আহত ও শহীদ পরিবারের পুনর্বাসন, চিকিৎসা এবং ট্রমা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানটির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের বিষয়ে আগেই সতর্ক করা হলেও সরকার পরিবর্তনের পর বাকি অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, শহীদ ও আহত পরিবারকে ঘিরে ইতোমধ্যে বিভিন্ন সংগঠন ও পক্ষভিত্তিক রাজনীতি শুরু হয়েছে, যা উদ্বেগজনক। এসব পরিবারকে কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানারে নয়, বরং স্বাধীন ও শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। এমন একটি সংগঠন গড়ে উঠতে হবে, যার সঙ্গে সব রাজনৈতিক দল নীতিগত বিষয়ে আলোচনা করবে।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক বলেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো আহত ও শহীদ পরিবারের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও মর্যাদা নিশ্চিত করা। এসব বিষয়ে সরকারের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার, সংস্কার এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের লড়াইয়ে সবাইকে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের গণকবর শনাক্ত, শহীদদের পরিচয় নির্ধারণ এবং তথ্য সংরক্ষণের কাজ যথাযথভাবে হচ্ছে না। এ জন্য স্বাধীন কমিশন গঠন করে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পেশাদারিত্বের সঙ্গে তদন্ত পরিচালনার করতে হবে।
তিনি বলেন, রায়েরবাজার গণকবর পরিদর্শনে গিয়ে নিহতের সংখ্যা নিয়ে অসংগতি দেখতে পেয়েছি। পূর্বে বিভিন্ন সূত্রের ভিত্তিতে সেখানে ১২৭ জনকে দাফনের তথ্য পাওয়া গেলেও বর্তমানে ৬৭ বা ৬৮ জনের তথ্য উপস্থাপন করা হচ্ছে। বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের দাবি রাখে।
তিনি আরও বলেন, শুধু রায়েরবাজার নয়, জুরাইন, মাতুয়াইল, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, সুন্দরবন এবং বরগুনার পাথরঘাটাসহ বিভিন্ন এলাকায় আরও গণকবর থাকার সম্ভাবনার কথা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) প্রধান কৌঁসুলিও উল্লেখ করেছেন। এসব স্থানে বিজ্ঞানভিত্তিক তদন্ত ও পরিবারের সদস্যদের সম্পৃক্ত করে তথ্য সংগ্রহের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে 'ব্যবসা' করার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, তাদের দাবি শুধু বিচার, সংস্কার এবং শহীদদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করা। তিনি অভিযোগ করেন, সংস্কারের নামে নানা ধরনের বিলম্ব হচ্ছে, একই সঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতাও আবার ফিরে আসছে।
তিনি বলেন, কারও বক্তব্য বা মতের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে তার জবাব যুক্তি, সমালোচনা কিংবা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মাধ্যমে দেওয়া উচিত। মতপ্রকাশের কারণে হামলা, গাড়ি ভাঙচুর বা শারীরিক আক্রমণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় যারা ক্ষমতায় আছেন, তাদের শহীদ ও আহত পরিবারের প্রতি আরও সংবেদনশীল হওয়া উচিত। তাদের সম্মান, পুনর্বাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এমএসআই/আরএফ
