সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা ভারতে প্রেস কনফারেন্সকে নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) রাতে ভারতের নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন প্রসঙ্গে দলের অবস্থান জানাতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পক্ষ থেকে ঢাকায় বাংলামোটরে দলের অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ভারতের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে দলটি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুইয়া। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক সেলের ইনচার্জ আলাউদ্দীন মোহাম্মদ।
লিখিত বক্তব্যে বলেন, আমরা, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গভীর উদ্বেগ ও তীব্র হতাশার সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর মতো একটি ঐতিহাসিক ও জাতীয় গুরুত্ববহ দিনে সার্বভৌম বাংলাদেশের আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় নয়াদিল্লি তার বাংলাদেশ নীতি আবারও স্পষ্ট করেছে যে তারা বাংলাদেশের বা বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে নয়, তারা তাদের তাবেদার আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক দিয়েই বাংলাদেশকে দেখতে চায়।
তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, বাংলাদেশের রায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন আসামি। এমন একজন ব্যক্তিকে, যাকে বাংলাদেশের জনগণ গণহত্যার জন্য দায়ী বিবেচনা করে সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে বাংলাদেশ থেকে উৎখাত করেছে, দেশের ইতিহাসের এক গৌরবময় ও শোকস্মারক দিনে মিথ্যা, বিভ্রান্তি ও বিদ্বেষ ছড়ানোর সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে নয়াদিল্লি বাংলাদেশের জনগণের ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা, গণতান্ত্রিক চেতনা এবং জাতীয় মর্যাদার প্রতি চরম অসম্মান ও ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করেছে।
এনসিপি মনে করে, শেখ হাসিনাকে ঘিরে যেকোনো নীতি বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা এবং বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতির প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করা আবশ্যক। আমরা ভারত সরকারের এরকম বিবেচনাহীন কর্মকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। পাশাপাশি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও সুস্থ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার স্বার্থে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে আসামি প্রত্যার্পন চুক্তির আওতায় দ্রুত ফিরিয়ে দিতে আহ্বান জানাই। আপনারা বাংলাদেশের জনগণ দ্বারা প্রত্যাখ্যাত ও নিষিদ্ধ গোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে, তাদের পক্ষাবলম্বন করে বাংলাদেশের জনগণকে আপনাদের প্রতি চিরন্তন ঘৃণার দিকে ঠেলে দেবেন না। একই সঙ্গে, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের রায় কার্যকরের লক্ষ্যে যথেষ্ট কার্যকর, দৃশ্যমান ও ফলপ্রসূ পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হওয়ায় আমরা বাংলাদেশ সরকারের প্রতিও জবাবদিহিতা দাবি করছি।
‘বাংলাদেশের জনগণ এমন একটি বিশ্বাসযোগ্য, সমন্বিত এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী প্রক্রিয়া প্রত্যাশা করে, যা রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকারকে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করবে। এই প্রশ্নকে কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য বা কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না; এর জন্য প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর উদ্যোগ এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সুস্পষ্ট দায়িত্বশীলতা।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট জানিয়ে লিখিত বক্তব্যে আলাউদ্দীন মোহাম্মদ বলেন, আমরা গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা এবং সব ধরনের ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সম্পূর্ণ বিলোপ বা অবসানের পক্ষে। আমরা শেখ হাসিনাকে কোনো দ্বিপাক্ষিক রাজনৈতিক সমীকরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের বিরোধিতা করি এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, বিচারিক প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে—এমন যেকোনো সমঝোতা বা ব্যবস্থা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করি।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পুনর্গঠনের লক্ষ্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপি বিশ্বাস করে, প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার স্থায়ী অবসান নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের সার্বভৌমত্ব বিনষ্টকারী ও জনগণের বিরুদ্ধে সংঘটিত গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে যথাযথ জবাবদিহিতা ও বিচার নিশ্চিত না করে পুনরায় রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের কোনো সুযোগ দেওয়া চলবে না।
এমএসআই/এসএম
