বিজ্ঞাপন

সাক্ষাৎকারে মাহিন সরকার

‘অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে বেশ কিছু নাম রহস্যজনকভাবে এসেছে’

‘অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে বেশ কিছু নাম রহস্যজনকভাবে এসেছে’

চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কোটাবিরোধী আন্দোলন হিসেবে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন ক্রমেই রূপ নেয় গণআন্দোলনে। ৩৬ দিনের টানা আন্দোলনে হাজারো ছাত্র-জনতার জীবনের বিনিময়ে আসে বিজয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি হয়েছে। কিন্তু সেই উত্তাল দিনগুলোর অনেক প্রশ্নই থেকে গেছে অনুচ্চারিত— কীভাবে নেওয়া হয়েছিল সিদ্ধান্তগুলো, কারা ছিলেন সামনের সারিতে আর কারা কাজ করেছেন আড়াল থেকে, কী ছিল সেই সময়ের ভয় আর কী-ই বা ছিল প্রত্যাশা। এসব প্রশ্ন ঘিরে এখনো রয়ে গেছে ব্যাপক কৌতূহল।

সেই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্যসচিব মাহিন সরকার। আন্দোলনের দিনগুলোর স্মৃতি, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, জীবনের ঝুঁকি, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের নেপথ্য আলোচনা, নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের বাস্তবতা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশার কথা তিনি তুলে ধরেছেন ঢাকা পোস্টের কাছে। শুক্রবার (৭ আগস্ট) তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ঢাকা পোস্টের সহকারী বার্তা সম্পাদক রুহুল আমিন রয়েল

ঢাকা পোস্ট : কেমন আছেন?

মাহিন সরকার : আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।

ঢাকা পোস্ট : আপনার শৈশব, পরিবার ও ছাত্রজীবনের কোন অভিজ্ঞতাগুলো আপনাকে রাজনীতি এবং আন্দোলনের পথে নিয়ে এসেছে?

মাহিন সরকার : আমি ছোটবেলায় খুব বেশি ধার্মিক ছিলাম। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার আগে ক্যাম্পাসে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) সক্রিয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলাম। বিশেষত ২০২৩ সালের নভেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার সংস্কারের দাবিতে আমি আন্দোলন করি। এ ছাড়া ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে পঞ্চগড়গামী ট্রেনে অজুখানা ও নামাজের জায়গার জন্য তৎকালীন রেলসচিবকে স্মারকলিপি দিই এবং তিনি যথাযথ পদক্ষেপ নেন। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে যে বড় ফটকটি দেখা যায়, এটিও আমার আন্দোলনের ফল। সেই কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে সবচেয়ে পরিচিত মুখ হওয়ার কারণেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বাকি সমন্বয়করা আমাকে হলপাড়া থেকে আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে থাকতে অনুরোধ করেন। যেহেতু লক্ষ্য ছিল সরকারি চাকরি, তাই কোনো কিছু না ভেবে তাদের সঙ্গে একাত্ম হই এবং নিজের সবটুকু দিয়ে আন্দোলনকে সংগঠিত করায় নিয়োজিত করি। বাকিটা আপনারা জানেন।

ঢাকা পোস্ট : জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে আপনি প্রথম কীভাবে যুক্ত হন? আন্দোলনের কোন মুহূর্তটি আপনার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বা টার্নিং পয়েন্ট বলে মনে হয়?

মাহিন সরকার : ২০২৪ সালের ৫ জুন তৎকালীন অবৈধ সরকার ২০১৮ সালে কোটাব্যবস্থা নিয়ে জারিকৃত পরিপত্র বাতিল করে। তাৎক্ষণিকভাবে শিক্ষার্থীরা প্রতিক্রিয়া জানালেও এটিকে সুসংহত আন্দোলনে রূপ দেওয়ার জন্য নতুন ব্যানার প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজনীয় ছিল, যেটি হবে সর্বদলীয় ব্যানার। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় কোরবানির ছুটি শুরুর আগেই আন্দোলনকে গতিশীলতা দিতে ৬ জুন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে আন্দোলন চলে। ৯ জুন আমি সরকারকে ২১ দিনের চূড়ান্ত সময়সীমা দিই। এরপর আমরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ব্যানারটি দাঁড় করাই। মূলত একেবারে অরাজনৈতিক ও গ্রন্থাগারের পরিচিত মুখ হিসেবেই আমি আন্দোলনে যুক্ত হই।

২৮ জুলাই যখন ডিবি কার্যালয়ে আটক সমন্বয়করা জোরপূর্বক কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন। তখন আন্দোলন প্রায় নিভে যাওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছায়। সেই মুহূর্তে আমি, রিফাত রশিদ, আবদুল হান্নান মাসউদ আর আব্দুল কাদের মিলে কর্মসূচি দিই।

ঢাকা পোস্ট : জুলাই আন্দোলনের সময় ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি বা ভয়াবহ অভিজ্ঞতা কী ছিল? এমন কোনো ঘটনা কি আছে, যা আজও আপনাকে তাড়া করে?

মাহিন সরকার : জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ছিল— সরকারের সঙ্গে নেগোসিয়েশন না করে সরকার পতনের উদ্দেশ্যে কর্মসূচি দিলে আমাদের মেরে গুম করে ফেলবে। তার পাশাপাশি আমাদের পরিবারকে চিরতরে জঙ্গি-সন্ত্রাসী পরিবার হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে চিহ্নিত করবে। ২৮ জুলাই যখন ডিবি কার্যালয়ে আটক সমন্বয়করা জোরপূর্বক কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন। তখন আন্দোলন প্রায় নিভে যাওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছায়। সেই মুহূর্তে আমি, রিফাত রশিদ, আবদুল হান্নান মাসউদ আর আব্দুল কাদের মিলে কর্মসূচি দিই। সে সময় ভেবেছি, যদি আমরা শেখ হাসিনার পতন না ঘটাতে পারি তাহলে কেবল আমাদের মেরে ফেলাই হবে না, শেখ হাসিনার সব খুনের দায় আমাদের ওপর চাপিয়ে আমাদের লাশও জন্মভূমিতে দাফন করতে দেওয়া হবে না। নিজের পরিবারের সদস্যদের জন্য খুব মায়া হচ্ছিল।

২৮ জুলাই যখন আন্দোলন শেষ হয় যাওয়ার মতো অবস্থা, তখন মাহিন সরকার, রিফাত রশিদ, আবদুল হান্নান মাসউদ আর আব্দুল কাদের মিলে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন

সর্বোপরি ২৮ জুলাইয়ের সেই পাল্টা প্রতিরোধের মুহূর্ত। সেখানে উপস্থিত প্রত্যেকের জন্যই ছিল আবেগ ও দেশমাতৃকার কল্যাণে আত্মোৎসর্গের পবিত্র তাগিদে পরিপূর্ণ এক মুহূর্ত। ৩০ জুলাইয়ের যে কর্মসূচি গিয়েছিল— অর্থাৎ চোখেমুখে লাল কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ, সেটির ঘোষক ছিলাম আমি। বুদ্ধিটিও হঠাৎ করেই এসেছিল। ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির ভাই আব্দুল কাদেরকে বলেছিলেন, আমরা যেন প্রতীকী কর্মসূচি দিই; সম্ভবত তিনিই লাল ব্যাজের কথা বলেছিলেন। তখন আওয়ামী লীগ আগেভাগেই শোক পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, যার রং কালো। আমি ওদের বলি, আজ আমরা লাল কাপড় চোখেমুখে বেঁধে প্রতিবাদ করবো। ওরা রাজি হয়। ২৯ জুলাইয়ের একেবারে শেষ প্রহরে আমি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠাই। এটি যে এত সাড়া ফেলবে, তা বুঝিনি।

৩০ জুলাই চোখেমুখে লাল কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ কর্মসূচি দেন মাহিন সরকার

ঢাকা পোস্ট : জুলাই আন্দোলনের সাফল্যের পেছনে সমন্বয়কদের সাংগঠনিক দক্ষতা কী ছিল? এই সফলতার মূল কারণ কী ছিল?

মাহিন সরকার : জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত প্রায় প্রত্যেক সমন্বয়কই বিভিন্ন সামাজিক বা রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যা অতীতের যেকোনো ছাত্র আন্দোলনের চেয়ে এই আন্দোলনকে দৃঢ় ভিত্তি দিয়েছে। সারা দেশের ছাত্রদের একত্রিত করার ক্ষেত্রে সেই সাংগঠনিক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন যে, কোনো সমন্বয়ক এই অভ্যুত্থানে শহীদ হননি। এটি সম্পূর্ণ ভুল কথা। গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক এবং তাকে কেন্দ্রীয়ভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন আবু বাকের মজুমদার।

ঢাকা পোস্ট : আন্দোলনের সময় আপনাদের সঙ্গে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের কোন নেতাদের যোগাযোগ ছিল। আন্দোলনে তারা কীভাবে সহায়তা করেছে?

মাহিন সরকার : আমাদের সাথে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কথা হতো। ছাত্রশিবিরের মধ্যে এসএম ফরহাদ, সাদিক কায়েমের সাথে কথা হয়েছে। তবে তারা (ছাত্রশিবির) সালমান, সাইমুম প্রভৃতি ছদ্মনামে যোগাযোগ করতো। মূলত ওই পাশে কে আছে আমরা তাদের সাথে কথা বলার সময় জানতে পারিনি। ২০২৪ সালের ২৬ জুলাই উত্তরার বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে আমাদেরকে গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সশস্ত্র অবস্থায় চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবির ও মহানগর ছাত্রশিবির যৌথভাবে আমাদেরকে সহায়তা করে। তারা একটি অ্যাম্বুলেন্স পাঠায়। আমি রোগী সাজি এবং রিফাত ও হান্নান মাসউদ আমার স্বজন সেজে কোনোমতে ওই জায়গা ত্যাগ করি। কিন্তু তারা আমাদের পেছনে গাড়ির বহর নিয়ে ছিলো। পরে দূতাবাসের কাছে পৌঁছালে ওরা ধাওয়া করা থামায়। বিএনপির শেরপুর-২ আসনের বর্তমান এমপি ফাহিম চৌধুরী ভাই তার বাসায় আমাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। ছাত্রদলের রাকিব ভাই আর নাছির ভাই সবসময়ই আমাদের খোঁজ রেখেছেন, কিন্তু স্থান গোপন থাকায় সরাসরি কোনো সহায়তা করা সম্ভব ছিলো না।

অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু নাম রহস্যজনকভাবে এসেছে বলে মনে হয়েছে। সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও মোস্তফা সরয়ার ফারুকী অন্যতম। তাদের বিরুদ্ধে তো আমরা আন্দোলন ও লেখালেখিও করেছি। যদিও ফারুকী নিজের কাজ করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু অন্যজন ব্যর্থ হয়েছেন।

ঢাকা পোস্ট : অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সময় সমন্বয়কদের ভূমিকা নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। সরকার গঠনের পুরো প্রক্রিয়ায় সমন্বয়কদের ভূমিকা কী ছিল? কে কোন দায়িত্ব পালন করেছিলেন?

মাহিন সরকার : অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সমন্বয়কদের মধ্যে নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদের সংশ্লিষ্টতা ছিল, বাকি সমন্বয়করা এ ব্যাপারে ওয়াকিবহাল ছিলেন না। ৬ আগস্ট হঠাৎ ৬ সদস্যের লিয়াজোঁ কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়; এরাই রাজনৈতিক অংশীজনদের সঙ্গে চূড়ান্ত আলোচনা করে তালিকা প্রস্তুত করে। এ নিয়ে বাকি সমন্বয়করা সন্তুষ্ট ছিলেন না। আমিও নিজে এই ঘটনায় অসন্তুষ্ট।

ঢাকা পোস্ট : সমন্বয়কদের মধ্যে কতজন সরাসরি সরকারে থাকতে বা দায়িত্ব নিতে আগ্রহী ছিলেন? এ বিষয়ে আপনার অভিজ্ঞতা বা পর্যবেক্ষণ কী?

মাহিন সরকার : দুই-একজন তো ছিলেনই। কিন্তু আমি, রিফাত, মাসউদ, কাদের— এসবের বাইরে ছিলাম। ২ আগস্ট রাতে আমাদের যারা নিরাপদ আশ্রয়ে রেখেছিলেন, তারা খুব পীড়াপীড়ি করেন যেন আমরা অনলাইনেই এক দফা দিই, কারণ তখন ক্ষেত্র প্রস্তুত ছিল। কিন্তু সেদিন আন্দোলনের বহু ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আমরা দেখেছি, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কিছু অজ্ঞাত ব্যক্তি স্লোগান দিচ্ছে— ‘এই মুহূর্তে দরকার, সেনাবাহিনীর সরকার’। আমরা বাকি সমন্বয়ক ও রাজনৈতিক অংশীজনদের বাদ দিয়ে এই ধরনের বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নিইনি। ফলে সে রাতে অনলাইনে এক দফা আমরা নাকচ করে দিই এবং একই সঙ্গে আমাদের মন্ত্রিত্বের প্রস্তাবও নাকচ করি। ভারতীয় প্রভাব-বলয় থেকে বেরিয়ে এসে, তা যা-ই হোক না কেন, আরও বড় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ছায়ায় সেনাশাসিত সরকার প্রতিষ্ঠার বিনিময়ে তুচ্ছ মন্ত্রিত্বের কাছে আমরা নিজেদের বিক্রি করিনি।

৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সংবাদ সম্মেলন করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়করা

ঢাকা পোস্ট : মন্ত্রিত্বের প্রস্তাব কারা দিয়েছিল, কীভাবে দিয়েছিল?

মাহিন সরকার : আমাদেরকে যারা আশ্রয় দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে কেউ দেশি-বিদেশি প্রভাবশালী মিডিয়ার সাথে জড়িত ছিলেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ বিদেশে থাকতেন। মূলত তাদের মাধ্যমেই প্রস্তাব এসেছিলো। এই মুহূর্তে আমি নাম বলছি না, কিন্তু কখনো প্রয়োজন হলে বলবো অবশ্যই।

ঢাকা পোস্ট : অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সময় কোনো বিষয়ে সমন্বয়কদের মধ্যে মতপার্থক্য বা বিতর্ক হয়েছিল কি? হয়ে থাকলে সেগুলো কীভাবে সমাধান করা হয়েছিল?

মাহিন সরকার : অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু নাম রহস্যজনকভাবে এসেছে বলে মনে হয়েছে। সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও মোস্তফা সরয়ার ফারুকী অন্যতম। তাদের বিরুদ্ধে তো আমরা আন্দোলন ও লেখালেখিও করেছি। যদিও ফারুকী নিজের কাজ করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু অন্যজন ব্যর্থ হয়েছেন। এছাড়াও আকিজ-বশিরের মতো একজন কোম্পানির মালিককে ( শেখ বশির উদ্দিন) উপদেষ্টা বানানো স্বার্থের সংঘাত তৈরি করে। এই সিদ্ধান্তগুলো ছিল রহস্যজনক।

ঢাকা পোস্ট : জুলাই আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম থেকে রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপি গঠনের প্রয়োজনীয়তা কেন অনুভূত হয়েছিল? সেই সিদ্ধান্তের পেছনের প্রধান যুক্তিগুলো কী ছিল?

মাহিন সরকার : কোনো ঐতিহাসিক ঘটনাকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হলে সেই ঘটনার পরপরই তার সাপেক্ষে একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা প্রয়োজন। ৭১-এ সে রকম প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠায় একাত্তরের চেতনা বেহাত ও কুক্ষিগত হয়েছে। ৯০-এ হয়নি বলে তা কেবল ঘটনাই থেকেছে, ইতিহাস হয়নি। আজও ৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের দুজন ছাত্রনেতার নাম মানুষ বলতে পারে না, অথচ সেই সময়ে একটি প্রজন্মের স্বপ্ন রাজপথে ঝরে গিয়েছে। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা সেই ভুল করতে চাইনি। তারপরও এনসিপি গঠনে খানিকটা বিলম্ব হয়েছে। নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ যদি উপদেষ্টা না হয়ে ৫ আগস্টের পরই দল গঠন করে জনগণের মাঝে যেতেন, তবে হয়তো এতদিনে এনসিপি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলে পরিণত হতে পারত। মূলত একটি প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে রাজনৈতিক সাফল্যে রূপ দেওয়াই এনসিপি গঠনের মূল কারণ।

এই মুহূর্তে বিএনপি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল। তাই তাদের দায়িত্বও বেশি। স্বাভাবিকভাবেই তাদের কাছে জনগণের, এমনকি আমাদেরও প্রত্যাশা বেশি ছিল। কিন্তু তারা হতাশ করেছে এবং করে যাচ্ছে।

ঢাকা পোস্ট : নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপির সবচেয়ে বড় তিনটি চ্যালেঞ্জ কী? সাংগঠনিক বিস্তার, জনআস্থা নাকি অর্থায়ন— কোনটি সবচেয়ে কঠিন?    

মাহিন সরকার : এনসিপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রজন্মের সংঘাত এড়ানো। আমরা যারা ২৪-এর প্রজন্ম, আমরাই কিন্তু এনসিপি গঠন করেছি। কিন্তু রাষ্ট্রের সব নাগরিক জেন-জি নয়। এই মুহূর্তে দেশের সংসদ থেকে সচিবালয়— সবখানেই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থাকা বেশির ভাগ মানুষ ৯০-এর প্রজন্ম। ফলে কোনো বিষয়ে যখন সেই প্রজন্মের মানুষ কিংবা ৭১-এর প্রজন্মের কেউ খানিকটা লাগামহীন কথা বলেন, বয়সের তারতম্যের কারণে আমাদের তরফ থেকে তার প্রত্যুত্তর তাদের প্রজন্ম কিছু ক্ষেত্রে অপছন্দ করে ফেলে। বস্তুত বাবার বয়সী কারও সঙ্গে ছেলের বয়সী কেউ প্রত্যুত্তর করলে তারা কিছুটা মনক্ষুণ্ন হন। আমি মনে করি এই দায়িত্বও এনসিপিকেই নিতে হবে এবং দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রবীণ রাজনীতিবিদদের বসাতে হবে। এরপর এনসিপির চ্যালেঞ্জ হলো সংগঠন গোছানো ও তহবিল ব্যবস্থাপনা করা।

ঢাকা পোস্ট : আগামী জাতীয় নির্বাচনে যদি জোট গঠনের প্রয়োজন হয়, তাহলে এনসিপি কোন নীতিগত বা রাজনৈতিক মানদণ্ডকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে?

মাহিন সরকার : রাজনীতিতে চিরস্থায়ী বলে কিছু নেই। দেশ ও দলের স্বার্থে যেকোনো সিদ্ধান্তই গৃহীত হতে পারে। এনসিপির রাজনীতির মূল লক্ষ্য নাগরিক অধিকার আদায়, আর উদ্দেশ্য রাষ্ট্র সংস্কার করা। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের রক্তের দায় থেকে খুনিদের বিচার ও রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিতে আগামী অন্তত ১০ বছরের জোট নির্ধারিত হবে বলে আমি মনে করি। কেননা, প্রাচীনপন্থি দলগুলো ক্ষমতাসর্বস্ব রাজনীতি করে— এই ধারণা ইতিমধ্যে আমাদের মধ্যে গেড়ে বসতে শুরু করেছে। এই লাইনে যে রাজনৈতিক দল কথা বলবে, তার সঙ্গেই জোট হতে পারে। এই রাজনৈতিক লাইনে এনসিপি আপস করবে না।

ঢাকা পোস্ট : জুলাই আন্দোলনের আগে ও পরে বিএনপির রাজনীতি এবং সাংগঠনিক আচরণে আপনি কী ধরনের পরিবর্তন দেখেছেন? কোন পরিবর্তনগুলো ইতিবাচক, আর কোন বিষয়গুলো নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে?

মাহিন সরকার : এই মুহূর্তে বিএনপি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল। তাই তাদের দায়িত্বও বেশি। স্বাভাবিকভাবেই তাদের কাছে জনগণের, এমনকি আমাদেরও প্রত্যাশা বেশি ছিল। কিন্তু তারা হতাশ করেছে এবং করে যাচ্ছে। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান সফল হওয়ার দুই দিন পরই নির্বাচনের দাবিতে সমাবেশ করেছে বিএনপি। আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, নির্বাচন কি খারাপ কিছু? কিন্তু তখন তো সরকারই ছিল না। মূলত তারা ছাত্র-জনতার মনের কথাটা ধরতে পারেনি। ছাত্র-জনতার মনের কথা ছিল বিচার ও সংস্কার। যে কারণে তারা দেয়ালে লিখেছে ‘স্বাধীনতা এনেছি, সংস্কারও আনবো' কিংবা 'এই মুহূর্তে দরকার, বিচার আর সংস্কার'-এর মতো স্লোগান। এটি কিন্তু ছাত্র-জনতাকে কেউ শেখায়নি। কিন্তু তারা (বিএনপি) নির্বাচিত হওয়ার পর এই স্লোগানগুলোকেই বলেছে ‘ডিপ স্টেটের পরিকল্পনা’। এ ছাড়া গুম কমিশন সংক্রান্ত তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, সাইবার আইন, সংবিধান সংস্কার, গণভোট প্রভৃতি বিষয়ে গণআকাঙ্ক্ষা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে তারা।

ঢাকা পোস্ট : এনসিপিকে নিয়ে প্রায়ই বলা হয়- দলটি জামায়াতের 'বি' টিম। এই ধারণা কেন তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন? বাস্তবে এনসিপির অবস্থান কী?

মাহিন সরকার : এই কথা কারা বলা শুরু করেছে, সেটা বোঝা প্রয়োজন। আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির তরফ থেকে এই অভিযোগ বেশি আসে। এর মূল কারণ হিসেবে তারা নির্বাচনী জোটকেই দায়ী করে। এনসিপি নির্বাচনের আগেই জানিয়েছে, এই জোট কেবলমাত্র নির্বাচনী জোট, কোনো আদর্শিক জোট নয়। সংসদে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল বিল ২০২৬ পাসের সময় এনসিপি এটি কাগজে-কলমে প্রমাণ করেছে। সেখানে এনসিপি ১৯৭১ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক অবস্থানকে সুসংহত করেছে। এরপরও 'বি' টিম বললে গত ১৭ বছরের জোট নিয়েও প্রশ্ন আসতে পারে। শেখ হাসিনার মতো ৭১-এর ইতিহাস কুক্ষিগত করা নারীও জামায়াতের সঙ্গে জোট করেছেন। তাহলে তারা সবাই কোন পক্ষ?

ঢাকা পোস্ট : আপনারা প্রায়ই বলেন- এনসিপি একটি 'নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি' গড়ে তুলতে চায়। বাস্তবে ক্ষমতায় গেলে সেই নতুন সংস্কৃতির দৃশ্যমান পার্থক্য কী হবে?

মাহিন সরকার : আমি আগেই বলেছি, এনসিপির রাজনীতির মূল লক্ষ্য নাগরিক অধিকার আদায়। আমাদের দেশে প্রচলিত দলগুলো নাগরিক সমস্যা সমাধানের চেয়ে মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকে। ফলে বিরোধী দলে থাকলে তাদের ডাকে মানুষ নামে না, আর সরকার গঠন করলে সব প্রতিষ্ঠান দলীয়করণ করে। ফলে নাগরিক অধিকার নির্ভর করে, নাগরিক আসলে তার দলের প্রতি কতটুকু অনুগত তার ওপর। আমরা ঠিক এই জায়গাতেই পরিবর্তন আনতে চাই। মতাদর্শকেন্দ্রিক ঝামেলার চেয়ে নাগরিক অধিকারকেন্দ্রিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করলে রাজনৈতিক সংস্কৃতিও সুন্দর হবে। আর এটা আমাদের যেকোনোভাবে করতেই হবে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার, আহত ও অংশগ্রহণকারী মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা তখনই তৈরি হবে, যখন রাষ্ট্র সর্বোচ্চ অন্তর্ভুক্তিমূলক অবস্থায় পৌঁছাবে। রাষ্ট্র কিন্তু এখনো সেই অবস্থায় নেই।

ঢাকা পোস্ট : এনসিপি থেকে একবার আপনাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল এবং এক মাস পর আবার পদে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এ বিষয়ে কী বলবেন?

মাহিন সরকার : এনসিপি আমাকে সাংগঠনিক শাস্তি দিয়েছিলো কেননা জাতীয় রাজনীতিতে যুক্ত থাকা অবস্থায় আমি ছাত্ররাজনীতিতে গিয়েছিলাম। মূলত আমার তখনো ছাত্রত্ব ছিলো এবং প্রথম দিন থেকে হলে অবস্থান করার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে আমার গ্রহণযোগ্যতা ছিলো। ছাত্ররাজনীতিতে একটি সর্বদলীয় ফোরাম রাখাটা আমার অন্যতম রাজনৈতিক এজেন্ডা, যেটি ছাত্ররাজনীতিতে যারা আছে তাদেরকেই বাস্তবায়ন করতে হয়। এসব কারণে আমার ডাকসু নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া। এটি এনসিপির রাজনীতির জন্য খুব ভালো কিছু না হওয়ায় তারা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্ররাজনীতি এবং জাতীয় রাজনীতির দূরত্ব অনেকটাই কমে এসেছে। মানসুরা আলম ছাত্রদল থেকেই এমপি হয়েছেন। সুতরাং, এটি হতেই পারে এবং অবস্থা বিবেচনায় এনসিপির অবস্থান সঠিকই ছিল। পরবর্তীতে ডাকসুর প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলে এনসিপিও তার কথা রেখেছে এবং আমাকে পুনরায় এনসিপিতে এনেছে।

ঢাকা পোস্ট : জুলাই আন্দোলনের শহীদ পরিবার, আহত ব্যক্তি এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে এনসিপির নির্দিষ্ট পরিকল্পনা কী?

মাহিন সরকার : জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার, আহত ও অংশগ্রহণকারী মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা তখনই তৈরি হবে, যখন রাষ্ট্র সর্বোচ্চ অন্তর্ভুক্তিমূলক অবস্থায় পৌঁছাবে। রাষ্ট্র কিন্তু এখনো সেই অবস্থায় নেই। শহীদ পরিবারগুলোর মধ্যে অনেককে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা অনুযায়ী অনুষ্ঠানে ডাকা হচ্ছে; বিভিন্ন স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে অপেক্ষাকৃত অপরিচিতরা পিছিয়ে পড়ছেন। রাষ্ট্র কম কার্যকর থাকলে সামাজিক অবস্থানই হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় অবস্থান। রাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ অন্তর্ভুক্তিমূলক অবস্থানে নিয়ে আসার জন্যই জাতীয় নাগরিক পার্টি তার রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে ঠিক করেছে নাগরিক অধিকার আদায়কে। বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী সব নাগরিক কেবল নাগরিক পরিচয়েই যেদিন তাদের সব অধিকার বুঝে পাবেন, সেদিনই ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার, আহত ও সব অংশগ্রহণকারী নিজেদের সফল ভাববেন। সে কারণেই জাতীয় নাগরিক পার্টি বারবার মতাদর্শিক দ্বন্দ্বকে পাশ কাটিয়ে নাগরিক অধিকার আদায়ের ওপর জোর দেয়।

ঢাকা পোস্ট : ১০ বছর পর এনসিপিকে এবং নিজেকে আপনি কোথায় দেখতে চান?

মাহিন সরকার : ১০ বছর পর এনসিপি ক্ষমতায় থাকবে, ইনশাআল্লাহ। আমার জীবনে আমি আর যা-ই অর্জন করি না কেন, তা ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ও গর্বের নয়। কেননা আমরাই বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ অবস্থায় নেতৃত্ব দেওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছি এবং বিজয় লাভ করেছি। তবুও যদি বলতেই হয়, ১০ বছর পর নিজেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাই।

ঢাকা পোস্ট : ঢাকা পোস্টকে সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

মাহিন সরকার : আপনাকেও ধন্যবাদ।