বিজ্ঞাপন

গুম প্রতিরোধ আইনের খসড়া নিয়ে আপত্তি, সরকারের সমালোচনা

গুম প্রতিরোধ আইনের খসড়া নিয়ে আপত্তি, সরকারের সমালোচনা

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত খসড়া আইন নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা। তারা বলেছেন, মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে হলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দলীয়করণ বন্ধ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে গুমের অভিযোগের তদন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিবর্তে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার দাবি জানান তারা।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিকেলে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আয়োজিত ‘জাতীয় মানবাধিকার ও গুম প্রতিরোধ খসড়া আইন, ২০২৬ : আইনি পর্যালোচনা ও করণীয় নির্ধারণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন বক্তারা। আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনা করেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুমসংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির সাবেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস।

বৈঠকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয় মাস পার হয়েছে। এই সময়ে আগের সরকারের আমলে সম্পন্ন হওয়া কিছু কাজ বাতিল করায় একই বিষয় নিয়ে নতুন করে আলোচনা করতে হচ্ছে। বিশেষ করে মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো সংসদের প্রথম অধিবেশনে পাস করা হলে এ ধরনের আলোচনার প্রয়োজন হতো না।

এনসিপির সদস্য সচিব বলেন, বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে গুম নিয়ে ভয়াবহ ধরনের ট্রমা রয়েছে। অসংখ্য মানুষ গুম হয়েছেন এবং অনেকে ফিরে এসে কীভাবে তাদের বন্দী করে রাখা হয়েছিল, সে বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন। আবার অনেকেই গুম হওয়ার পর আর ফিরে আসেননি। কিন্তু গুমের ঘটনায় ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার এখনো যথাযথ বিচার পাননি।

তিনি বলেন, অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন, তারা বাংলাদেশে গুম বন্ধের দাবি জানিয়েছিলেন। গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ কোনোভাবেই দেশে চলতে দেওয়া যায় না। কিন্তু বর্তমান সরকার আরও ভালো আইন করার কথা বলে আগের অধ্যাদেশগুলো বাতিল করেছে।

আখতার হোসেনের অভিযোগ, মানবাধিকার কমিশনের খসড়া আইনে কমিশনের তদন্তের ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে কমিশনকে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। একইভাবে কমিশনের চেয়ারম্যান বা চেয়ারপার্সন নিয়োগের ক্ষেত্রেও এমন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে সরকারের পছন্দ অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত আইনের খসড়া নিয়েও আপত্তি জানান তিনি। তিনি বলেন, যেসব বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠতে পারে, তাদেরই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হলে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা কঠিন হবে। এতে গুমের ঘটনা তদন্তের নামে আড়াল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কোনো গুমের ঘটনায় ভুক্তভোগীর পরিবার অভিযোগ করতে গেলে মিথ্যা অভিযোগের দায়ে শাস্তির বিধান তাদের ভয় দেখানোর কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। ফলে গুমের শিকার পরিবারগুলো অভিযোগ করতে নিরুৎসাহিত হবে এবং প্রকৃত ঘটনা সামনে আসার পথও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

আলোকচিত্রী, লেখক ও মানবাধিকার কর্মী শহীদুল আলম বলেন, হাসিনা চলে যাবার পর আমরা ভিন্ন একটা বাংলাদেশ পাবো এই আশা করেছিলাম। আমি এখনও আশা করি।

তিনি বলেন, আমাদের দেশ থেকে চুরি করে অনেক টাকা দেশের বাইরে নিয়ে গেছে। এগুলো তো আমাদের উতরাতে হবে। নাহলে দেশের অবস্থা সামনে আরও খারাপ হবে। রাজনীতিবিদদের ভোট দিয়ে আমরা ক্ষমতায় এনেছি। তারা ঠিক করবে দেশ কিভাবে চলবে। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীর কথায় দেশ চলবে না। সরকারকে নিয়ে আমরা গর্ব করবো, সেটা যেন শুধু কথায় না হয়ে কাজে হয়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, যেখানে জাতীয় আদর্শগত ঐক্য থাকে না, সেখানে রাষ্ট্র গঠন কষ্টকর হয়। আমরা এখন পর্যন্ত রাষ্ট্র গঠনের মতো কোনো লিডারশিপ পাইনি। আর প্রতিবেশী রাষ্ট্র আমাদের স্থিতিশীল হতে দেয়নি। আজও ডিবেট হয় কে রাজাকার আর কে রাজাকার না। দেশের মানুষ বিদ্যুৎ পায় না, গ্যাস পায় না, বাসায় চুলা জ্বলে না আর সংসদে রাজাকার নিয়ে বিতর্ক হয়। পলিটিশিয়ানরা এটাকে দেশ মনে করে না। তারা এটাকে জনপদ মনে করে। কারণ জনপদ মনে করলে লুটপাট করে খাওয়া যাবে। 

তিনি বলেন, বিএনপি প্রথম থেকেই মানুষকে ধোঁকা দিয়ে যাচ্ছে। দলটি জুলাইয়ের প্রতিজ্ঞা থেকে পিছু হাঁটছে।

সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ আইন— এগুলো প্রয়োজন কারণ আমরা এগুলো দিয়ে সরকারকে দায়বদ্ধ করতে পারি। এগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। এখন এই প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে কি না— তা নির্ভর করে এগুলোর নিয়োগ প্রক্রিয়ার উপর। নিয়োগে দলীয়করণ হওয়া যাবে না। তাহলে সরকারকে আমরা জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারবো। এত হাজার হাজার মানুষ জীবন দিয়েছে, আমরা চেয়েছিলাম দেশটা পরিবর্তন হবে। মূল কথা হলো, এই প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার অংশ না। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ হলো, সরকার কাজ ঠিকভাবে করছে কিনা সেগুলো দেখা। এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের আগে এবং পরে সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।

বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ব্যারিস্টার তানিম হোসেন শাওন বলেন, গুম আইনের মূল উদ্দেশ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের গুমের কাজ থেকে বিরত রাখা। কিন্তু আইনের খসড়ায় আইনের এই ধারাকে হাস্যকরভাবে দুর্বল করে রাখা হয়েছে। আইনের শুরুতে ছিলো গুমের ঘটনা তদন্ত করবে নিরপেক্ষ কমিশন। আমরা এই কাজটি মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়ার সুপারিশ করেছিলাম। কিন্তু আইনে রাখা হলো, তদন্ত করবে পুলিশ। তাহলে আইন করে কী লাভ হলো? সরকার একটা কথাও রাখছে না। 

আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া ফুয়াদ বলেন, আমি চিন্তা করছি, বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের পুরানো খাসলত বদলায় না কেন? এর উত্তর আমার কাছে নাই। আমি যখন দেশের বাইরে থাকতাম, সারাদিন পর বাসায় এসে আলোচনা করতাম, কী রান্না করবো। অনেকক্ষণ আলোচনা করে বাহির থেকে খাবার অর্ডার করে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম। বাংলাদেশেও এরকমভাবেই রাজনীতিবিদরা প্রতিশ্রুতি দেয়, পালন করে না।

তিনি বলেন, শেখ মুজিব বাংলাদেশে জহির রায়হানকে গুম করে গুমের উদ্বোধন করলেন, সিরাজ শিকদারকে ক্রসফায়ার দিয়ে ক্রসফায়ারের উদ্বোধন করলেন। উনি পাকিস্তান আমলে এগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। পরে আবার একই কাজ করলেন। 

গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর বলেন, সরকার অলরেডি জুলাই সনদকে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছে। যদিও তারা বলছে, নোট অব ডিসেন্ট সহ বাস্তবায়ন করবে। সেভাবে করলে ওটা আর জুলাই সনদ থাকবে না। সংস্কার না হলে মানবাধিকার কমিশনে যারা আসবেন, তারা দলীয় লোক হবেন। তাদের থেকে কতটা সেবা পাওয়া যাবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির উপ-প্রধান সারোয়ার তুষার বলেন, বিএনপির ১৮০ দিন পার হয়েছে। এখন তারা বলতে শুরু করেছে, ৬ মাস কী যথেষ্ট? অথচ তারা অন্তর্বর্তী সরকারকে তারা ৬ দিনও সময় দেয়নি। আমরা দেখেছি, তখন বিএনপির উসকানিতে যমুনার সামনে অনেক আন্দোলন হয়েছে। বাজেটের আগে অর্থমন্ত্রীর কথার ঝুড়িতে টিকে থাকা কঠিন হয়েছিল। এত এত কর্মসংস্থান হবে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে অথচ বাস্তবে অগ্রগতি নেই। বিএনপি আসলে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

তিনি বলেন, হবিগঞ্জে পুলিশের আচরণ দেখেছেন। পুলিশ আগের মতোই আছে। যার একটা কেরানির যোগ্যতা নেই, তাকে রাজনৈতিক সচিব পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর পাশে বসে রেখেছেন। বিএনপি মূল খেলা খেলবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সময়। এজন্য তারা নির্বাচন কমিশনে দলীয় লোক বসিয়েছে। এভাবেই বিএনপির প্ল্যান এগিয়ে যাচ্ছে। যা আওয়ামী লীগের জন্য ১৫ বছর, তা আপনার জন্য ৫ বছর নাও হতে পারে।

গোলটেবিলের সঞ্চালনা করেন এনসিপির কেন্দ্রীয় সংগঠক অ্যাডভোকেট আরমান হোসাইন।

এমএসআই/এসএএস