জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, যে নিজের পরিচয় গোপন করে অপকর্ম ও দুর্নীতি করে, সেই সবচেয়ে বড় গুপ্ত।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাতে চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে ১১ দলীয় জোটের লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ঢাকা বিমানবন্দরে এক প্রবাসীর স্বর্ণ ছিনতাইয়ের প্রসঙ্গ তুলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কয়েক দিন আগে তিনজন ছিনতাইকারী একজন প্রবাসীর স্বর্ণ ছিনতাই করেছে। ছিনতাইয়ের সময় তারা নিজেদের আওয়ামী লীগের লোক পরিচয় দিয়ে ভয় দেখিয়েছিল। কিন্তু ধরা পড়ার পর দেখা গেল, তারা বিএনপির লোক।
তিনি বলেন, এরা গুপ্ত। যে নিজের পরিচয় গোপন করে অপকর্ম করে, দুর্নীতি করে, সেই হচ্ছে সবচেয়ে বড় গুপ্ত।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখ জনগণ দুটি ভোট দিয়েছিল। একটি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচনের জন্য, আরেকটি বাংলাদেশের রাজনীতির পরিবর্তনের জন্য সংস্কার পরিষদের সদস্য নির্বাচনের উদ্দেশ্যে। একই ব্যক্তিকে দুটি ভোট দিতে হয়েছিল। নির্বাচনের আগে বর্তমান সরকারি দল এবং আমরা সবাই বলেছিলাম, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলুন। ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে আমরা বদ্ধপরিকর। বিএনপিও এ কথা বলেছে, আমরাও বলেছি। ছয় মাস চলে গেল, বিএনপি কি তাদের কথা রেখেছে?
তিনি বলেন, ওই সময় বাংলাদেশের মানুষ বুকভরা আশা নিয়ে ভেবেছিল, এবার একটা পরিবর্তন আসবে। বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের জন্ম হবে না। মানুষ আদালতে গেলে আর শোষণ-বঞ্চনার শিকার হবে না, ন্যায়বিচার পাবে। সন্তানরা ভালো শিক্ষা পাবে, হাতে ভালো কাজ পাবে এবং তারা দেশ গড়বে। দেশ থেকে চাঁদাবাজি, ঘুষ ও দুর্নীতি নির্মূল হবে। কিন্তু তার একটাও হয়নি।
জামায়াত আমির বলেন, তারা তখন বলেছিল, অনির্বাচিত সরকার যত দ্রুত বিদায় নেবে, দেশের তত মঙ্গল হবে। আমি জিজ্ঞেস করতে চাই, অনির্বাচিত সরকার আমাদের জান্নাতে পাঠায়নি, এটা ঠিক। কিন্তু অনির্বাচিত সরকারের সময় আপনারা যেমন ছিলেন, এখন কি সেই সুবিধাগুলো পাচ্ছেন?
সমাবেশে উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এখন গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই। বিদ্যুৎ না থাকলেও বিদ্যুতের বিল আসছে। গ্যাস দেবে না, কিন্তু গ্যাসের বিল জমা দিতে হচ্ছে। তেল পাই না, জ্বালানি পাই না। চারদিকে হাহাকার।
তিনি আরও বলেন, সমাজে বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাস ও হানাহানি চলছে। দলীয় আনুকূল্য ও প্রশ্রয়ে সরকারি দলের লোকেরা সন্ত্রাস ও চুরি-ছিনতাইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
লংমার্চের কর্মসূচি ঘিরে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়ার প্রসঙ্গ তুলে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আজকে আমরা যখন লংমার্চের ডাক দিলাম, তখন বিভিন্ন জায়গায় চরম প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কিছু প্রতিক্রিয়া আপনারা শুনতে পেয়েছেন। আমরা পরিষ্কার একটা কথা বলি– আমাদের এই আন্দোলন জনগণের প্রাণের দাবি বাস্তবায়নের আন্দোলন।
‘আমরা কাউকে ক্ষমতা থেকে বিদায় করার জন্য আন্দোলন শুরু করিনি। কেউ যদি বিদায় নেওয়ার মতো আমল করতে থাকে, তাহলে আমরা কি তাদের ইয়াসিন সূরা পড়ে পানি পড়া খাওয়াব? সেই পথেই সরকার হাঁটছে। আগের সরকার যে রাস্তা ধরে হেঁটেছে, এই সরকারও একই রাস্তা ধরে হাঁটছে। চট্টগ্রাম তার আরেকটি বাস্তব প্রমাণ।’
জামায়াতের আমির বলেন, এখানে একজন মেয়র আছেন। উনার মেয়াদ কি এখনো আছে? উনাকে কি আমরা মেয়াদোত্তীর্ণ বলব না? এখন শুনে যাবেন, উনি যতদিন ইচ্ছা ততদিন থাকবেন। বলেন, এর নাম সুশাসন, না এর নাম ফ্যাসিবাদ? আপনি আসেন, আবার নির্বাচিত হয়ে আসেন। জনগণের ভোটে এসে সম্মানের সঙ্গে নেতৃত্ব দেন– আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু ভোটে যদি জনগণ অন্য কাউকে নির্বাচিত করে, তাও আপনাকে মেনে নিতে হবে।

চট্টগ্রামবাসী, এই তো একটা তাজা উদাহরণ দিলাম বাংলাদেশকে। এটা কি বৈষম্য নয়? তারা জাতির সামনে নির্বাচনী ইশতেহারে এবং তাদের সংস্কারের ৩১ দফায় ওয়াদা করেছিলেন যে, সমাজের সব স্তরের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই দেশ পরিচালনা করবেন। এখন জায়গায় জায়গায় তারা যে প্রশাসক বসালেন, তারা কি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি?
তিনি বলেন, আমাদের আজকের এই লংমার্চ সরকারকে সতর্ক করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু পরের লংমার্চ এমন হবে না। এতগুলো মানুষ মারা গেল, তাদের দলের প্রচুর লোক মারা গেছে, গুম হয়েছে, আয়নাঘরে বন্দি হয়েছে। এই মানুষগুলোর রক্ত ও জীবনের প্রতি আমাদের কি কোনো দায়বদ্ধতা নেই? আফসোস, ক্ষমতায় বসেছেন ছয় মাস। বলেন, আমাদের সরকারটা শিশু সরকার। জনগণ কোন শিশুকে ভোট দিয়েছে? ২৫ বছরের আগে কেউ সংসদ সদস্য হতে পারে না। উনারা কি ২৫ বছরের শিশু, নাকি প্রাপ্তবয়স্ক? জনগণ আপনাদের ভোট দিয়েছে। আপনারা ওয়াদা করেছেন, কথা দিয়েছেন। এখন সেই সবকিছু আপনারা লঙ্ঘন করছেন।
তিনি বলেন, আমরা সাফ জানিয়ে দিচ্ছি, আপনারা উল্টাপাল্টা করবেন আর বিরোধী দল বসে বসে আঙুল চুষবে– এটা হবে না। এখন পর্যন্ত আঙুল আমাদের সোজা। প্রয়োজনে এটা বাঁকা হবে, ইনশাআল্লাহ। আপনারা আমাদের বাধ্য করেছেন রাজপথে আসতে। আমরা তো এই দাবি নিয়ে রাজপথে আসতে চাইনি। আমরা তো চেয়েছিলাম ফ্যাসিবাদের কবর রচনা হবে এবং সংসদের ভেতরেই তার ফয়সালা হবে। আপনারা গণভোটের গণরায়কে অস্বীকার করার মাধ্যমে বাংলাদেশের ৭০ ভাগ মানুষকে অপমান করেছেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আপনারা তাদের সঙ্গে দেওয়া কথার সঙ্গে গাদ্দারি করেছেন, প্রতারণা করেছেন। বিরোধী দল জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করবে না, ইনশাআল্লাহ। আমাদের বহু টোপ দেওয়া হয়েছে, লোক দেওয়া হয়েছে– এটা করব, ওটা করব। আমরা পরিষ্কার জানিয়ে দিচ্ছি, কোনো লোভের প্রতি আমরা চোখ খুলেও তাকাব না। জনগণের ৭০ ভাগ মানুষের দেওয়া রায় বাস্তবায়ন করতে হবে এবং আমরা তা আদায় করে ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ। এর আগে আমরা বিরতি দেব না, আমরা থামব না। এই লড়াই চলবে এবং বাংলাদেশ, ইনশাআল্লাহ, বদলাবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বদলানোর জন্য আপনারা কি তৈরি আছেন? তাহলে প্রস্তুত থাকুন। বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক, ইনশাআল্লাহ, আসবে। তবে এর সঙ্গে ঈদের কোনো সম্পর্ক নেই। জনগণের যখন প্রয়োজন হবে, তখনই ডাক আসবে, ইনশাআল্লাহ। আমরা কনফিডেন্ট, আমরা আস্থাশীল– এই লড়াইয়ে জনগণ বিজয়ী হবে। ফ্যাসিবাদ হেরে যাবে, অপরাধীরা হেরে যাবে, চাঁদাবাজরা হেরে যাবে, দুর্নীতিবাজরা হেরে যাবে, লুটেরা-লুটপাটকারীরা হেরে যাবে। যারা আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করে, তারা হেরে যাবে।

শফিকুর রহমান বলেন, আমি শুধু জানতে চাই- আপনারা ১৫ বছরের হত্যাকাণ্ডের বিচার চান? ১৫ বছর যত হত্যাকাণ্ড, যত গুম হয়েছে, সবগুলোর বিচার চান? আপনারা ’২৪-এর আন্দোলনের বীর শহীদদের হত্যার বিচার চান? যারা তাদের গুলি করে পঙ্গু করে দিয়েছে, সেই খুনিদের বিচার চান? বিডিআরের পিলখানায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে যারা হত্যা করেছে, সেই খুনিদের বিচার চান? যারা আয়নাঘর তৈরি করেছিল, তাদের বিচার চান? জল্লাদদের বিচার চান?।আমরা কথা দিচ্ছি, সেই বিচার আমরা আদায় করে ছাড়ব। আর এই সরকার যদি এই বিচার না করে, তাহলে জনগণের সরকার কায়েমের মাধ্যমে সেই বিচার আমরা তুলে আনব, ইনশাআল্লাহ।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী ড. কর্নেল অলি আহমদ। এসময় উপস্থিত ছিলেন– বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, এনসিপির মূখ্য সংগঠক সারজিস আলম, জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল, ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ কে এম হামিদুর রহমান আজাদ।

আরও উপস্থিত ছিলেন– এনসিপি মুখ্য সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালাল উদ্দীন আহমদ, এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইজহার, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান, লেবার পার্টির মুখপাত্র মাওলানা নাজমুল ইসলাম তালুকদার, গুমের শিকার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসিনুর রহমান বীরপ্রতীক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মুহাম্মদ ফয়সাল এবং এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া।
উল্লেখ্য, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নসহ ছয় দফা দাবি আদায়ে ১১ দলীয় জোটের ঢাকা-চট্টগ্রাম লং মার্চের শেষ কর্মসূচি হিসেবে চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে এ সমাবেশ চলে।
জোটের পক্ষ থেকে ঘোষিত ছয় দফা দাবির মধ্যে আছে– অবিলম্বে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও অপরাধ দমন, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।
এমআর/বিআরইউ
