বিজ্ঞাপন

ইসলামী আন্দোলন

হেবা আইনের সংশোধন শরিয়াহবিরোধী, অবিলম্বে বাতিল করতে হবে

হেবা আইনের সংশোধন শরিয়াহবিরোধী, অবিলম্বে বাতিল করতে হবে

সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে হেবা সংক্রান্ত সংশোধনকে শরিয়াহবিরোধী দাবি করে তা অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। 

দলটির নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম বলেছেন, শরিয়াহ নির্দেশিত উত্তরাধিকার আইনকে পাশ কাটিয়ে নতুন কোনো পদ্ধতি যুক্ত করার সুযোগ নেই। সমস্যা সমাধানের নামে শরিয়াহর বিধানে পরিবর্তন আনা গ্রহণযোগ্য নয়।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘হেবা আইনে বিতর্কিত সংশোধন; শরীয়াহ প্রশ্ন ও আমাদের অবস্থান’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি একথা বলেন।

সংবাদ সম্মেলন থেকে তিনি হেবা আইন সংশোধন বাতিলের দাবিতে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) দেশের সব বিভাগীয় শহরে প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল করার ঘোষণা করেন।

ফয়জুল করীম বলেন, গত ৬ সেপ্টেম্বর সংসদে ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনী আনা হয়। ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন-২০২৬’ নামে আইনটি কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে। তার দাবি, এ আইনের মাধ্যমে কোরআনে বর্ণিত ইসলামের একটি অকাট্য বিধানে পরিবর্তন আনা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘দেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান, তাদের ধর্মীয় বিধান পালনে সহায়তা করতে রাষ্ট্র বাধ্য। সংবিধানের ৪১ ধারায় প্রত্যেক নাগরিককে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বলা আছে। ফলে সরকার কখনোই এমন কোনো আইন করতে পারে না, যা নাগরিকের ধর্ম পালনে বাধা সৃষ্টি করে।’

ইসলামী আন্দোলনের এই নেতা বলেন, সম্পত্তি হস্তান্তর ও উত্তরাধিকার বণ্টনের বিষয়ে ইসলামী শরিয়াহতে বিস্তারিত বিধান রয়েছে। কোরআনে উত্তরাধিকার আইনকে বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে সন্তান, বাবা-মা, ভাই-বোন, দাদা, চাচাসহ সংশ্লিষ্ট উত্তরাধিকারীদের অধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে।

তার ভাষ্য, ‘উত্তরাধিকার বণ্টনের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বন্ধন ও দায়িত্ববোধ বিবেচনা করা হয়েছে। ফলে এখানে নতুন করে কোনো পদ্ধতি সংযোজন করার দরকার নেই, সুযোগও নেই।’

হেবা ব্যবস্থার অপব্যবহারের কারণে বাবা-মা সম্পদ থেকে বঞ্চিত হওয়ার যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, সেটি সমাধানের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেন ফয়জুল করীম। তবে তার দাবি, এ সমস্যা সমাধানের জন্য আবার শরিয়াহর বিধান পরিবর্তন করা যাবে না।

তিনি বলেন, ইসলামের উত্তরাধিকার আইনে কোনো কোনো পরিস্থিতিতে সন্তানদের বাইরেও ভাই, চাচা, দাদা ও অন্য উত্তরাধিকারীদের সম্পত্তিতে অধিকার তৈরি হয়। এসব উত্তরাধিকারীকে বঞ্চিত করতে সন্তানদের নামে সম্পত্তি হেবা করার প্রবণতা সমাজে রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ফয়জুল করীম বলেন, ‘শরিয়াহর উত্তরাধিকার আইনকে বাইপাস করার এই প্রবণতার একটি গ্রাহ্য নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হলো, যেই সন্তানের জন্য শরিয়াহকে বাইপাস করা হচ্ছে, সেই সন্তানই হেবা সূত্রে সম্পদের মালিক হয়ে বাবা-মাকে সম্পদের ভোগ থেকে উচ্ছেদ করছে।’

বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মায়ের গৃহহীন ও মানবেতর জীবনযাপনের বিষয়টি মানবিক সমস্যা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর সমাধান জরুরি। তবে সমস্যাটির সৃষ্টি যেহেতু শরিয়াহ এড়িয়ে যাওয়ার কারণে, তাই সমাধানের নামে হেবা বিধানেও শরিয়াহবিরোধী পরিবর্তন আনা যাবে না।

সরকার হেবা সংক্রান্ত আইন বহাল রাখার কথা বললেও সংশোধনীর মাধ্যমে দান বা উপহারের আরেকটি পদ্ধতি তৈরি করা হয়েছে বলে দাবি করেন ফয়জুল করীম। তিনি বলেন, জীবনসত্ত্ব রেখে যে হেবা করার সুযোগ রাখা হচ্ছে, তা আদতে হেবা নয়, বরং অসিয়ত। আর ওয়ারিশদের জন্য অসিয়তের সুযোগ নেই বলেও ইসলামী শরিয়াহর ব্যাখ্যা তুলে ধরেন তিনি।

এ বিষয়ে হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক হকদারকে তার প্রাপ্য অধিকার দিয়ে দিয়েছেন, সুতরাং কোনো ওয়ারিশের জন্য অসিয়ত নেই।’

ফয়জুল করীমের দাবি, সংশোধিত আইনের মাধ্যমে এমন একটি সুযোগ তৈরি হচ্ছে, যার অপব্যবহার মানুষের জন্য ধর্মীয়ভাবে ক্ষতির কারণ হতে পারে।

হেবা আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে দেশের উলামাদের মতামত গুরুত্ব না দেওয়ারও অভিযোগ করেন ইসলামী আন্দোলনের নায়েবে আমির। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং যুগশ্রেষ্ঠ উলামায়ে কেরাম রয়েছেন। এই আইন নিয়ে উলামায়ে কেরাম আগেই ভিন্নমত পোষণ করেছেন।

‘শরিয়াহ সংক্রান্ত একটি বিষয়ে খ্রিষ্টান পণ্ডিতদের রেফারেন্স ব্যবহার করে শরিয়াহবিরুদ্ধ আইন প্রণয়ন দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জ্ঞানীয় সম্পদের প্রতি স্পষ্ট উপেক্ষা’- বলেন তিনি।

আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে ফয়জুল করীম বলেন, শরিয়াহ আইন ও এর তৎপরতা সম্পর্কে উলামায়ে কেরামের প্রাজ্ঞতা বেশি। ফলে শরিয়াহ সংক্রান্ত বিষয়ে তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

হেবার পর বাবা-মাকে সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা বন্ধে সামাজিক ও আইনি উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান ফয়জুল করীম। বাবা-মায়ের প্রতি সম্মানের ধারণা পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে বাবা-মায়ের প্রতি কর্তব্যে অবহেলাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে আইন প্রয়োগের কথাও বলেন।

বাবা-মা অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের বিরুদ্ধে মামলা করতে চান না উল্লেখ করে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন ইসলামী আন্দোলনের এই নেতা। তবে তিনি বলেন, ‘সমস্যা সমাধানের অনেক উপায় আছে। কিন্তু এই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে শরিয়াহকে আরেকবার অমান্য করা যায় না।’

দেশের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরে সরকারের সমালোচনাও করেন ফয়জুল করীম। তিনি বলেন, দেশে বেকারত্ব বাড়ছে, দ্রব্যমূল্য লাগাম হারিয়েছে, সন্ত্রাসে মানুষ তটস্থ এবং বিদ্যুতের সংকটে জনজীবন নাজেহাল। এসব বাস্তব সমস্যার সমাধান না করে সরকার শরিয়াহবিরোধী আইন প্রণয়নে নেমে পড়ায় হতাশা তৈরি হয়েছে।

তবে সরকারের সদিচ্ছার প্রতি আস্থা রেখে আইনটি নিয়ে অধিকতর পর্যালোচনার আহ্বান জানান তিনি। উলামায়ে কেরাম ও আইনবিদদের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার আহ্বান জানিয়ে ফয়জুল করীম বলেন, ‘সমস্যা সমাধানের নামে কোনো অবস্থাতেই শরিয়াহ অমান্য করা যাবে না।’

জেইউ/বিআরইউ