দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম, ব্যাপক সাংগঠনিক তৎপরতা ও ক্ষমতার পালাবদলের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি এখন এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। জনসমর্থন ধরে রাখার পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনায় নিজেদের যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিচয় দেওয়াই দলটির জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী পদে থাকার রাজনৈতিক হিসাব আর সরকার পরিচালনার বাস্তবতার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ রয়েছে। বিরোধী দলে থাকতে সরকারের নানা সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা যতটা সহজ, ক্ষমতায় গিয়ে প্রতিটি কাজের একক দায় নেওয়া ততটাই কঠিন। ফলে বিএনপিকে এখন শুধু চটকদার রাজনৈতিক বক্তব্যের ওপর ভরসা না করে বাস্তব ও দৃশ্যমান পারফরম্যান্সের মাধ্যমেই জনগণের আস্থা ধরে রাখতে হবে।
আরও পড়ুন
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস, তৃণমূলকে সুসংগঠিত করা এবং সর্বস্তরে কঠোর শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা ও প্রশাসনিক দক্ষতা প্রমাণের মতো বিষয়গুলো দলের জনপ্রিয়তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
দীর্ঘ আন্দোলন শেষে ক্ষমতায় আসা বিএনপির জন্য জনসমর্থন ধরে রাখা ও দৃশ্যমান উন্নয়ন নিশ্চিত করাই এখন প্রধান পরীক্ষা। নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থানের পাশাপাশি তৃণমূলের বিশৃঙ্খলা, চাঁদাবাজি ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল রোধ করা দলটির বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব কাজের মাধ্যমে জনগণের আস্থা ধরে রাখতেই কঠোর নজরদারি ও প্রশাসনিক দক্ষতা প্রমাণের তাগিদ বিশ্লেষকদের
দলের একাধিক সিনিয়র ও দায়িত্বশীল নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন, দলীয় পদে ভারসাম্য রক্ষা ও বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে ভেতরে-বাইরে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বিশেষ করে ঢাকা মহানগরসহ গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ইউনিটগুলোর পুনর্গঠন মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, সেদিকে কড়া নজর রাখছেন হাইকমান্ড।

অন্যদিকে, দলের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নিজেদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা। অনেক ক্ষেত্রে তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রত্যাশার সঙ্গে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের সমন্বয় না থাকায় জনপ্রিয়তা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসন ও মধ্যবর্তী সময়ের বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারকে মূল দায়িত্ব মনে করছে দলটি। বেকারত্ব দূরীকরণ ও বহুল আলোচিত ৩১ দফা বাস্তবায়নে বিএনপি কাজ শুরু করলেও বেশকিছু প্রতিশ্রুতি এখনও দৃশ্যমান নয়। বিশ্লেষকদের মতে, সরকার পরিচালনায় সংবিধান, আইন ও নিজস্ব ইশতেহারের পূর্ণ প্রতিফলন ঘটিয়ে দেশকে সঠিক ধারায় পরিচালনাই বিএনপির আসল পরীক্ষা
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বিএনপির এক সিনিয়র নেতা জানান, ক্ষমতায় আসার পর তৃণমূল ও অঙ্গসংগঠনের একশ্রেণির নেতাকর্মীর অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা হাইকমান্ডের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে, মানুষ যাতে কোনোভাবেই ক্ষুব্ধ না হয় এবং দলের ভাবমূর্তি যেন অক্ষুণ্ন থাকে, সেজন্য বর্তমানে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা হয়েছে।

এছাড়া, বিএনপির ঘোষিত বহুল আলোচিত ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারের বেশকিছু প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন শুরু হলেও এখনো বড় একটি অংশ দৃশ্যমান করা সম্ভব হয়নি। একদিকে রাষ্ট্র চালানো, অন্যদিকে দলকে নিজস্ব আদর্শ ও সক্রিয় রাজনৈতিক ধারায় বজায় রাখা— দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।

সার্বিক বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক-এর (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাদের নিজেদের নেতাকর্মীরাই। তৃণমূলের একশ্রেণির কর্মী এখনও বিশৃঙ্খলা, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত। এছাড়া, জাতীয় সংসদেও তারা চ্যালেঞ্জের মুখে। অনেক সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে দলের ভেতর থেকেই গুরুতর অভিযোগ উঠছে। এমনকি সংসদে যেসব আইন ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তার অনেকগুলো গণভোটের রায়, সংবিধান কিংবা আদালতের নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’
তিনি আরও যোগ করেন, “উদাহরণস্বরূপ, র্যাবের কেবল নাম পরিবর্তন করা ‘নতুন বোতলে পুরানো পানীয়’ ভরে সরবরাহের সামিল। সরকার এখনও অনেক জায়গায় কাঙ্ক্ষিত সঠিক ভূমিকা পালন করতে পারছে না। তাদের গৃহীত বেশকিছু পদক্ষেপ সংবিধান, বিদ্যমান আইন এবং তাদের নিজস্ব ৩১ দফার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সবমিলিয়ে বিএনপির সামনে বহুবিধ চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান।”
তবে, চ্যালেঞ্জের ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘সুদীর্ঘ ১৮ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর দেশকে পুনরায় গণতন্ত্রের ধারায় ফিরিয়ে আনাই বর্তমান সরকারের প্রধান কাজ। দীর্ঘদিন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুপস্থিত থাকায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়াটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার ও সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা। মধ্যবর্তী সরকারের সময়ে যেসব বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল, সেখান থেকে দেশকে বের করে আনা জরুরি। এছাড়া, আমাদের বার্ষিক এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান ও বেকারত্ব দূরীকরণের যে অঙ্গীকার, তাও দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।’
সার্বিক বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘জনগণের ভোটে একটি নির্বাচিত সরকার যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়, তখন সামনে নানা ধরনের বহুমুখী চ্যালেঞ্জ আসাটাই স্বাভাবিক। তবে, সরকারের মূল কাজই হলো সব বাঁধা-প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে দেশের সার্বভৌমত্ব ও উন্নয়ন সুসংহত করা। বিএনপি সরকার সেই লক্ষ্যেই দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।’
এএএম/এমএআর/
