বিজ্ঞাপন

লন্ডন থেকে শতবর্ষী প্যারিস গ্র্যান্ড মসজিদে একদিন

লন্ডন থেকে শতবর্ষী প্যারিস গ্র্যান্ড মসজিদে একদিন

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের বুকে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষী প্যারিস গ্র্যান্ড মসজিদ। মুসলিমদের আত্মত্যাগের স্মৃতি, ইসলামের ইতিহাস, স্থাপত্যশৈলী ও আন্তধর্মীয় সহাবস্থানের এক অনন্য প্রতীক এই মসজিদ। ১৯২৬ সালে উদ্বোধনের পর ২০২৬ সালে শতবর্ষ পূর্ণ করেছে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি।

গত ৭ আগস্ট লন্ডন থেকে কয়েকজনের সঙ্গে প্যারিস গ্র্যান্ড মসজিদ দেখতে যান এই প্রতিবেদক। প্যারিস বাংলা প্রেসক্লাবের হাফিজুর রহমান ও প্যারিসের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মর্তুজা কামাল এ সফরে সহযোগিতা করেন। শুক্রবার হওয়ায় মসজিদে একসঙ্গে জুমার নামাজও আদায় করা হয়।

প্যারিসের ৫ম অ্যারোন্দিসমঁ এলাকায় অবস্থিত মসজিদটি ‘গ্রঁত মস্কে দ্য পারি’ নামেও পরিচিত। মসজিদের সংরক্ষিত তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সের পক্ষে লড়াই করা মুসলিম সেনাদের আত্মত্যাগের স্মরণে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্রান্সের উপনিবেশ আলজেরিয়া, মরক্কো, তিউনিসিয়াসহ উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মুসলিম সৈন্য ফরাসি বাহিনীতে যোগ দেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের অনেকেই প্রাণ উৎসর্গ করেন। তাঁদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাতে ফরাসি সরকার একটি বৃহৎ মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়।

১৯২০ সালে ফরাসি পার্লামেন্ট প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়। এরপর ১৯২২ সালে শুরু হয় নির্মাণকাজ। চার বছর পর ১৯২৬ সালের ১৫ জুলাই তৎকালীন ফরাসি প্রেসিডেন্ট গাস্তোঁ দুমের্গ ও মরক্কোর সুলতান ইউসুফ ইবনে হাসান মসজিদটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

শতবর্ষ পেরিয়ে আজও মসজিদটি প্যারিসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম স্থাপনা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এর স্থাপত্যে স্প্যানিশ-মোরিশ (Hispano-Moorish) রীতির ছাপ স্পষ্ট। প্রায় ৩৩ মিটার উঁচু মিনারটি দূর থেকেই চোখে পড়ে। মিনারের নকশায় স্পেনের বিখ্যাত গ্রানাডার আলহামব্রার স্থাপত্যের প্রভাব রয়েছে।

মসজিদের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে সবুজ টাইলস, জটিল জ্যামিতিক অলংকরণ, খোদাইকৃত দেয়াল, মোজাইক শিল্প ও ঘোড়ার খুরাকৃতির খিলান। মূল উপাসনালয়ের পাশাপাশি ভেতরে রয়েছে সুসজ্জিত বাগান, ছায়াঘেরা প্রাঙ্গণ ও ফোয়ারা। এসব আয়োজন ইবাদতকারীদের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের জন্যও তৈরি করেছে প্রশান্ত পরিবেশ।

শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় হিসেবেই নয়, প্যারিস গ্র্যান্ড মসজিদে রয়েছে লাইব্রেরি, উপহারের দোকান, ঐতিহ্যবাহী চা-খানা ও রেস্তোরাঁ। ফলে প্যারিসে আসা পর্যটকদের কাছেও এটি একটি আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান।

মসজিদটি ঘুরে দেখার সময় এর স্থাপত্য ও পরিবেশের পাশাপাশি বারবার মনে পড়ে এর নির্মাণের ইতিহাস। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কঠিন সময়ে ফ্রান্সের পক্ষে লড়াই করা মুসলিম সেনাদের আত্মত্যাগের স্মৃতিই যেন শতবর্ষ পরও এই স্থাপনার দেয়ালে দেয়ালে ধরে রাখা হয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থাপত্য দেখতে আসা পর্যটকদের জন্য প্যারিস গ্র্যান্ড মসজিদ তাই শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এটি মুসলিম ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও সংস্কৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। মসজিদ পরিদর্শনে পরিমিত পোশাক পরা এবং ধর্মীয় স্থাপনার প্রতি যথাযথ সম্মান দেখানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

লন্ডন থেকে প্যারিসের এই একদিনের সফরে শতবর্ষী মসজিদটির স্থাপত্য যেমন মুগ্ধ করেছে, তেমনি এর পেছনের ইতিহাসও নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মুসলিমদের আত্মত্যাগের কথা। ১৯২৬ থেকে ২০২৬—এক শতাব্দী পেরিয়েও সেই ইতিহাস ও স্মৃতি ধরে রেখেছে প্যারিস গ্র্যান্ড মসজিদ।

মুহাম্মদ শাহেদ রাহমান/এসএইচএ

 

ঢাকা পোস্ট প্রবাস বিভাগে লিখুন আপনিও। প্রবাসে বাংলাদেশি কমিউনিটির নানা আয়োজন, ঘটনা-দুর্ঘটনা, প্রবাসীদের সুযোগ-সুবিধা, সমস্যা-সম্ভাবনা, সাফল্য, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের খবর, ছবি ও ভিডিও আমাদের পাঠাতে পারেন [email protected] মেইলে।