মহানবীর (সা.) যুগে নেতা নির্বাচন করা হতো যে পদ্ধতিতে

বর্তমানে ভোট ব্যবস্থার মাধ্যমে নেতা বা দেশপ্রধান নির্বাচন করা হয়। এর মাধ্যমে একটি দলের প্রধানের মাধ্যমে দেশ পরিচালিত হয়। নবী যুগে নেতা নির্বাচনের পদ্ধতি বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থার মতো ছিল না। মহানবী (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। এই রাষ্ট্রের প্রধান ছিলেন তিনি নিজেই। তার ইন্তেকালের পর পর্যায়ক্রমে সাহাবিরা মদিনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
নবীজির জীবদ্দশায় সর্বসম্মতিক্রমে তাকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মেনে নেন সবাই। তার ইন্তেকালের পর তার দেখানো পথ অনুসরণ করে রাষ্ট্রপ্রধান বা নেতা নিয়োগ করা হতো। সেই যুগে নেতা নির্বাচন করা হতো মূলত কোরআন, হাদিসের নির্দেশ, নৈতিক যোগ্যতা, জনগণের আস্থা ও পরামর্শের ভিত্তিতে। তখনকার দিনে যোগ্য নেতা নির্বাচনের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরিবর্তে দায়িত্ব ও আমানতের বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া হতো।
মদিনায় রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের ভিত্তি
হিজরতের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু ধর্মীয় নেতা ছিলেন না, রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এ নেতৃত্ব গড়ে উঠেছিল তিনটি ভিত্তির ওপর—
- ওহি ও আল্লাহর নির্দেশ।
- জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আনুগত্য।
- ন্যায়বিচার ও আমানতদারিতা
মদিনার আনসার ও মুহাজিরদের বাইয়াতের মাধ্যমে রাসুল (সা.)-এর নেতৃত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।
বাইয়াত : নেতৃত্ব গ্রহণের সামাজিক স্বীকৃতি
নবী যুগে নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম ছিল বাইয়াত। আকাবার বাইয়াতে মদিনার মানুষ রাসুল (সা.)-কে নেতা হিসেবে গ্রহণ করেন। এটি কোনো জোরপূর্বক শপথ ছিল না, বরং বিশ্বাস, আস্থা ও দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে মদিনার মানুষেরা রাসুল (সা.)-কে তাদের নেতা হিসেবে মেনে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছিল।
যোগ্যতা ও চরিত্র ছিল মূল মানদণ্ড
নবী যুগে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বংশ, সম্পদ বা শক্তি মুখ্য ছিল না। বরং তাকওয়া ও আল্লাহভীতি, ন্যায়পরায়ণতা, আমানতদারি, দায়িত্ব পালনের সক্ষমতার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হতো।
এই কারণেই এক সময়ের দাস বিলাল (রা.) সম্মানিত দায়িত্ব পেয়েছিলেন, অল্প বয়সী উসামা ইবনে যায়েদ (রা.)-কেও সেনাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
পরামর্শভিত্তিক শাসনব্যবস্থা
রাসুল (সা.)-এর সময় মূলত কোরআন ও হাদিসের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালিত হতেন, তবুও তিনি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সাহাবাদের সঙ্গে শূরা বা পরামর্শ করতেন রাসুল (সা.)। বদর, উহুদ ও খন্দকের মতো ঘটনায় এর স্পষ্ট নজির আছে। এটি প্রমাণ করে যে নবী যুগের নেতৃত্ব ছিল অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিমূলক।
ক্ষমতার জন্য প্রতিযোগিতায় নিরুৎসাহ
নবী যুগে নেতৃত্ব চাওয়ার বিষয়টিতে নিরুৎসাহিত করা হতো। আবূ মূসা (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি ও তার গোত্রের দুই ব্যক্তি নবীজি (সা.)-এর কাছে আসেন। তাদের একজন বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে কোনো বিষয়ে আমীর নিযুক্ত করুন।’ অন্যজনও একই আবেদন করল। তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘যারা নেতৃত্ব চায় এবং এর প্রতি লালায়িত হয়, আমরা তাদেরকে এ পদে নিয়োগ করি না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭১৪৯)
এই হাদিসের মাধ্যমে রাসুল (সা.) মূলত নেতৃত্বকে ক্ষমতার লোভ থেকে মুক্ত রাখার শিক্ষা দিয়েছেন।
এনটি