ইসলামে হালাল উপার্জন ও শ্রমের মর্যাদা

জীবন ধারণের জন্য জীবিকা অপরিহার্য। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। ইসলাম মানুষকে কর্মমুখী ও স্বাবলম্বী হওয়ার প্রেরণা দেয়। অলসতা ও ভিক্ষাবৃত্তিকে ঘৃণার চোখে দেখা হয়েছ ইসলামে। নিজের হাতে উপার্জনকে নবীদের সুন্নত ও মহান ইবাদত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
ইসলামে হালাল উপার্জন ও শ্রমকে যেভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে—
ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত
হালাল উপার্জন ইবাদত কবুলের অন্যতম প্রধান শর্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে লোক সকল! আল্লাহ তায়ালা পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করেন না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০১৫)।
হারাম উপার্জনে গঠিত শরীর জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং হারামের সংমিশ্রণ থাকলে কোনো দোয়া বা ইবাদত কবুল হয় না। তাই একজন মুমিনের প্রথম দায়িত্ব উপার্জনের উৎসটি বৈধ কি না তা নিশ্চিত করা।
শ্রমের মর্যাদা ও নবীদের আদর্শ
পৃথিবীতে যত নবী ও রাসুল এসেছেন সবাই নিজ হাতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। আমাদের প্রিয় নবী (সা.) মক্কায় ছাগল চড়িয়েছেন এবং পরবর্তী জীবনে ব্যবসা পরিচালনা করেছেন।
হজরত দাউদ (আ.) নিজ হাতে বর্ম তৈরি করে তা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিজ হাতের উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কেউ কখনো খায়নি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২০৭২)
শ্রমিকের অধিকার রক্ষা
ইসলাম শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি পরিশোধ করার নির্দেশ দিয়েছে। মালিক ও শ্রমিকের সম্পর্ক হবে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তারা তোমাদের ভাই, আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীনস্থ করেছেন। সুতরাং কারো ভাই তার অধীনে থাকলে সে যা খায় তাকে যেন তা-ই খাওয়ায় এবং সে যা পরে তাকে যেন তা-ই পরায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩০)
আত্মনির্ভরশীলতা বনাম ভিক্ষাবৃত্তি
ইসলাম সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অন্যের কাছে হাত পাতাকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ তার রশি নিয়ে পাহাড়ে যাক এবং কাঠের বোঝা পিঠে করে নিয়ে এসে তা বিক্রয় করুক, আর আল্লাহ এর দ্বারা তার সম্মান রক্ষা করুন— এটি মানুষের কাছে হাত পাতার চেয়ে অনেক উত্তম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৪৭১)
ইসলামী খিলাফতের সোনালী যুগে কোনো কাজকেই ছোট করে দেখা হতো না। খলিফা আবু বকর (রা.) খলিফা হওয়ার পরও কিছুকাল পর্যন্ত কাপড়ের ব্যবসা চালিয়ে গিয়েছিলেন।
খলিফা ওমর (রা.) যখন রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন, তখনও তিনি শ্রমের গুরুত্ব দিতেন। তিনি বলতেন, ‘তোমরা জীবিকার সন্ধান ছেড়ে দিয়ে বসে থেকো না এবং বলো না যে, হে আল্লাহ! আমাকে রিজিক দিন। কারণ তোমরা জানো আকাশ থেকে সোনা-রুপা বর্ষিত হয় না।’ (কানযুল উম্মাল: ৯৮৫৭)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) একজন বড় আলেম হওয়া সত্ত্বেও কাপড়ের ব্যবসা করতেন। তার সততা ও ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা আজও ব্যবসায়ীদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ।
পরিশেষে বলা যায়, একটি আদর্শ সমাজ গঠনে হালাল উপার্জন ও শ্রমের কোনো বিকল্প নেই। আমরা যদি ইসলামের এই শিক্ষা ধারণ করি, তবে সমাজে ঘুষ, দুর্নীতি ও শোষণ বন্ধ হবে এবং একটি বরকতময় অর্থনীতি গড়ে উঠবে ইনশাআল্লাহ।
লেখক : মুহাদ্দিস ও ইসলাম বিষয়ক গবেষক