যাকাত সম্পর্কিত যে ১০ প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি

যাকাত ইসলামের ফরজ বিধান। সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা ঠিকমতো যাকাত আদায় করলে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আবার কেউ যাকাত আদায়ে গড়িমসি করলে বা ঠিকমতো যাকাত না দিলে তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তির কথা বলা হয়েছে।
যাকাত সম্পর্কে ১০টি প্রশ্নের উত্তর তুলে ধরা হলো এখানে—
১. যাকাত ফরজ হয় কখন?
যে মুসলমান ব্যক্তি বুদ্ধিসম্পন্ন (আকিল), প্রাপ্তবয়স্ক (বালেগ) এবং তার মালিকানায় সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্যের সমমূল্যের নগদ অর্থ কিংবা ব্যবসায়িক পণ্য বিদ্যমান থাকে অথবা উল্লিখিত চারটির যেকোনো দুই বা ততোধিক বস্তুর সমষ্টি সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্যের মূল্যের সমান হয় এবং সেই ব্যক্তির কোনো ঋণ নেই তাহলে ওই সম্পদের উপর পূর্ণ এক হিজরি বছর অতিবাহিত হলে তার ওপর যাকাত ফরজ হবে।
মোটকথা, যার কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদার অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ স্বর্ণালংকার, নগদ অর্থ বা ব্যবসায়িক পণ্য থাকে, তার ওপর যাকাত ফরজ।
২. শুধু স্বর্ণ অথবা শুধু রৌপ্য থাকলে যাকাত আদায় করবেন কীভাবে?
যদি কারো মালিকানায় শুধু স্বর্ণ আছে, নগদ অর্থ, রৌপ্য বা ব্যবসায়িক পণ্য কিছুই নেই, তবে যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ থাকা আবশ্যক।
কিন্তু যদি স্বর্ণের সাথে নিত্যপ্রয়োজনের অতিরিক্ত নগদ অর্থ, রৌপ্য বা ব্যবসায়িক পণ্যও থাকে, তাহলে শুধু সাড়ে সাত তোলা রুপার হিসাব প্রযোজ্য হবে না; বরং সবকিছুর সম্মিলিত মূল্য যদি সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্যের মূল্যে পৌঁছে যায়, তবে যাকাত আদায় করা আবশ্যক হবে। এক্ষেত্রে শর্ত হলো, এত পরিমাণ ঋণ থাকা যাবে না, যা বাদ দিলে নিসাব পূর্ণ থাকবে না।
আর যার কাছে শুধু রুপা আছে, তার ক্ষেত্রে রৌপ্যের নিসাব প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ সাড়ে বায়ান্ন তোলা বা তার বেশি রৌপ্য থাকলে এক বছর পূর্ণ হলে মোট রৌপ্যের ২.৫% যাকাত দিতে হবে। চাইলে রৌপ্যের পরিবর্তে তার সমমূল্যের অর্থও প্রদান করা বৈধ।
৩. শুধু নগদ টাকা আছে, স্বর্ণ নেই, তাহলে কি যাকাত দিতে হবে?
জি, হ্যাঁ। যদি কারো কাছে শুধু নগদ অর্থ (ক্যাশ বা ব্যাংক ব্যালেন্স) থাকে এবং তার পরিমাণ সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্যের বর্তমান মূল্যের সমান বা বেশি হয়, তাহলে যাকাত ফরজ হবে।
শর্ত হলো ওই অর্থের উপর এক হিজরি বছর অতিবাহিত হতে হবে, তা নিত্যপ্রয়োজনের অতিরিক্ত হতে হবে। যাকাতের হার : মোট অর্থের ২.৫% (অর্থাৎ চল্লিশ ভাগের এক ভাগ)।
নোট: স্বর্ণ না থাকলে যাকাতের নিসাব রৌপ্যের মূল্য অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
৪. সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ নেই, কিন্তু ৩ বা ৫ তোলা আছে, তাহলে কি যাকাত দিতে হবে?
যদি কারো মালিকানায় সাড়ে সাত তোলার কম স্বর্ণ থাকে এবং এর বাইরে রৌপ্য, নিত্যপ্রয়োজনের অতিরিক্ত নগদ অর্থ বা ব্যবসায়িক পণ্য কিছুই না থাকে, তাহলে তার ওপর যাকাত ওয়াজিব হবে না।
তবে যদি ৬ বা ৭ তোলা স্বর্ণের সাথে কিছু রৌপ্য, অতিরিক্ত নগদ অর্থ বা ব্যবসায়িক পণ্য থাকে এবং সবকিছুর সম্মিলিত মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্যের সমমূল্যে পৌঁছে যায়, তাহলে যাকাত ফরজ হবে।
৫. ব্যবহার্য স্বর্ণ ছাড়া অতিরিক্ত সম্পদ না থাকলে যাকাত দিতে হবে কি?
স্বর্ণ বা রৌপ্য, তা অলংকার, বিস্কুট, গিনি বা যেকোনো আকারে হোক, ব্যবহার্য হোক বা অব্যবহৃত, যদি নিসাব পরিমাণ বা তার বেশি হয়, তবে তার উপর যাকাত ফরজ।
শুধু স্বর্ণ থাকলে সাড়ে সাত তোলা, শুধু রৌপ্য থাকলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা, অথবা উভয়ের সমমূল্যের নগদ অর্থ বা ব্যবসায়িক পণ্য অথবা সম্মিলিত মূল্য যদি রৌপ্যের নিসাব পরিমাণে পৌঁছে যায়, তাহলে এক বছর পূর্ণ হলে ২.৫% যাকাত আদায় করতে হবে।
৬. যাকাতের হকদার কারা?
যে ব্যক্তি দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত এবং যার কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদার অতিরিক্ত সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্যের সমমূল্যের সম্পদ নেই এবং সে সাইয়্যিদ বা হাশেমি বংশভুক্ত নয় তাহলে এমন ব্যক্তি যাকাত গ্রহণ করতে পারে।
যাকাত প্রদানকারীর প্রবল ধারণা থাকতে হবে যে যাকে যাকাত দিচ্ছে সে প্রকৃতপক্ষে হকদার। এই ধারণা বাহ্যিক অবস্থা দেখে বা তার বক্তব্যে নিশ্চিত হলেই যথেষ্ট; অতিরিক্ত তদন্ত আবশ্যক নয়।
৭. যাকাতের অর্থ সামাজিক সেবামূলক কাজে ব্যয় করা যাবে কি?
যে কল্যাণমূলক কাজে সরাসরি কোনো হকদার ব্যক্তিকে মালিক বানানো হয় না, যেমন মসজিদ, মাদরাসা, হাসপাতাল, স্কুল, রাস্তা নির্মাণ, মৃত ব্যক্তির কাফন-দাফনের ব্যয়, কূপ খনন ইত্যাদি, এসব খাতে যাকাতের অর্থ ব্যয় করলে যাকাত আদায় হবে না।
তবে এমন কল্যাণমূলক কাজে, যেখানে যাকাতগ্রহীতা ব্যক্তিকে মালিক বানিয়ে অর্থ বা দ্রব্য প্রদান করা হয়, যেমন দরিদ্র শিক্ষার্থীর শিক্ষা ব্যয়, অসহায় রোগীর চিকিৎসা ব্যয়, রেশন প্রদান, এসব ক্ষেত্রে যাকাত আদায় হবে।
৮. একসঙ্গে না দিয়ে ধীরে ধীরে যাকাত আদায় করা যাবে?
যাকাতের সম্পূর্ণ অর্থ এককালীন না দিয়ে বছরের মধ্যে কিস্তিতে বা ধাপে ধাপে আদায় করা বৈধ, শর্ত হলো, বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই সম্পূর্ণ যাকাত আদায় করতে হবে।
মূল লক্ষ্য হলো যাকাতের হকদারদের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া; প্রয়োজন অনুযায়ী বণ্টন করায় কোনো শরয়ী অসুবিধা নেই।
৯. একজনকেই সব যাকাত দেওয়া যাবে কি?
যাকাতদাতা চাইলে একজন হকদারকেই পুরো যাকাত দিতে পারেন, আবার একাধিক ব্যক্তির মাঝেও বণ্টন করতে পারেন উভয় পদ্ধতিই বৈধ।
তবে অকারণে একজনকে এত পরিমাণ দেওয়া যাতে সে নিজেই নিসাবধারী হয়ে যায়, এমন করা মাকরূহ। তবুও এতে যাকাত আদায় হয়ে যাবে।
যদি কোনো একজনের প্রয়োজন বেশি হয়, পরিবার বড়, ঋণগ্রস্ত বা আর্থিক সংকট তীব্র, তবে তাকে সম্পূর্ণ অর্থ দেওয়া উত্তম। আর যদি এক ব্যক্তির প্রয়োজনের অতিরিক্ত হয়ে যায়, তবে একাধিক ব্যক্তির মাঝে বণ্টন করা উত্তম।
১০. শুধু স্বর্ণ আছে কিন্তু নগদ অর্থ নেই, যাকাত আদায় করবেন কীভাবে?
যদি কারো কাছে শুধু স্বর্ণ থাকে এবং তা সাড়ে সাত তোলা বা তার বেশি হয় তবে তার উপর যাকাত ফরজ। নগদ অর্থ থাকা আবশ্যক নয়।
যদি নগদ অর্থ না থাকে তবে ওই স্বর্ণের ২.৫% (চল্লিশ ভাগের এক ভাগ) স্বর্ণই যাকাত হিসেবে দিতে পারেন অথবা কারো কাছ থেকে ঋণ নিয়ে নগদ যাকাত আদায় করতে পারেন অথবা বছর শেষে হিসাব করে ধীরে ধীরে পরিশোধ করতে পারেন কিংবা একসাথে পরিশোধের সময় বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী হিসাব করে আদায় করতে পারেন।
মোটকথা, স্বর্ণের নিসাব পূর্ণ হলে যাকাত আদায় করা অপরিহার্য; উপরোক্ত যেকোনো পদ্ধতি গ্রহণ করা বৈধ।
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে যাকাতের বিধান সঠিকভাবে বুঝে তা যথাযথভাবে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
তথ্যসূত্র : ১. বাদায়েউস সানায়ে, যাকাত অধ্যায়: ২/১৮-১৯, ২. ফাতাওয়ে হিন্দিয়া, যাকাত অধ্যায়: ১/১৯১, ৩. দুররুল মুখতার+ রদ্দুল মুহতার: ২/২৯, ৪.ফাতাওয়ে শামি: ২/২৯৯, ৫. ফাতাওয়ে আলমগিরি,(যাকাতের হকদার অধ্যায়): ১/১৮৯, ৬. ফাতাওয়ে হিন্দিয়া ( যাকাত অধ্যায়): ১/১৮৮
লেখক : শিক্ষক,মারকাযুস সুন্নাহ মাদরাসা মাতুয়াইল, ডেমরা, ঢাকা