তারাবিতে মুখর হয়ে উঠে ১২০ বছরের বাবা জি মসজিদ

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের লোয়ার দির জেলার তিমারগারায় অবস্থিত ১২০ বছরের পুরোনো বাবা জি মসজিদে রমজান এলেই জমে ওঠে আধ্যাত্মিক আবহ। সূর্যাস্তের পরপরই শত শত মুসল্লি ভিড় করেন তারাবির নামাজে অংশ নিতে। হাতে খোদাই করা কাঠের কারুকাজে সজ্জিত ছাদের নিচে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ইবাদতের এ ধারা আজও অব্যাহত।
সন্ধ্যা নামতেই তিমারগারার পথে পথে দেখা যায় মানুষের স্রোত, গন্তব্য শতবর্ষী বাবা জি মসজিদ। রমজানে সারা দিন রোজা রাখার পর মুসলমানরা যখন ইশা ও তারাবির দীর্ঘ জামাতে অংশ নেন, তখন এই ঐতিহাসিক মসজিদটি হয়ে ওঠে পুরো অঞ্চলের অন্যতম আধ্যাত্মিক কেন্দ্র।
১৮৯০-এর দশকে প্রভাবশালী পশতুন ইউসুফজাই গোত্রের ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব মিয়ান গুল মুহিউদ্দিন এই মসজিদ নির্মাণ করেন। তিনি স্থানীয়ভাবে বাবা জি নামে পরিচিত। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই লোয়ার দির ও আশপাশের জেলার মানুষের প্রধান উপাসনালয় হিসেবে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
রমজানে মসজিদটির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। এখানে তারাবির নামাজে পুরো কোরআন তেলাওয়াতের দুই দফা খতম আয়োজনের ঐতিহ্য রয়েছে। মসজিদের খাদেম ৬২ বছর বয়সী নাকিব উল আবরার জানান, প্রতিদিন দুইজন হাফেজ মিলিয়ে দশ পারা করে তেলাওয়াত করা হতো। তিন দিন করে মোট ছয় দিনে দুই খতম সম্পন্ন হতো, আর পুরো মসজিদ ভরে যেত মুসল্লিতে।
এক সময় পুরো অঞ্চলে জুমা ও ঈদের জামাতের প্রধান কেন্দ্র ছিল এই মসজিদ। আবরার বলেন, আগে এত বেশি মসজিদ ছিল না। মেদান, রাবাত, তালাশ, বাজাউরের আরাং কিংবা আপার দির থেকেও মানুষ জুমা ও ঈদের নামাজ পড়তে আসতেন এখানে।

অনেকের কাছেই রমজানে বাবা জি মসজিদে আসা পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ। ৫৯ বছর বয়সী বুরহান উদ্দিন জানান, তিনি গত ৩৫-৪০ বছর ধরে নিয়মিত এখানে নামাজ পড়ছেন। তার দাদা-পরদাদারাও এই মসজিদে আসতেন। প্রায় ১১৫-১২০ বছরের ধারাবাহিকতায় তাদের পরিবার এই মসজিদের সঙ্গে যুক্ত।
মসজিদটির স্থাপত্যই এর বিশেষ আকর্ষণ। কাদা-প্লাস্টার করা সাদা দেয়াল, বিশাল কাঠের বিম এবং খোদাই করা অলংকৃত কাঠের স্তম্ভ, সব মিলিয়ে এক অনন্য নকশা। ভারী কাঠের দরজা ভেতরের দিকে খোলার সময় যে শব্দ হয়, তাতেই বোঝা যায় এর বয়স।
আবরার বলেন, উনিশ শতকের শেষ দিকে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এ মসজিদ নির্মাণ ছিল কঠিন কাজ। তখন কোনো আধুনিক যানবাহন ছিল না। বড় বড় গাছ কেটে পানজকোড়া নদীতে ভাসিয়ে আপার দির থেকে তিমারগারায় আনা হতো কাঠ। কাঠের সূক্ষ্ম কারুকাজের জন্য পেশোয়ারের তেহকাল ও মারদানের লোন্দখওয়ার এলাকা থেকে দক্ষ কারিগর আনা হয়েছিল।
মসজিদের উচ্চতা প্রায় ১৭ ফুট এবং পাথরের দেয়ালের প্রস্থ সাড়ে তিন ফুট। মূল হলঘরে প্রায় ৫০০ মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন, আর প্রাঙ্গণে জায়গা হয় আরও প্রায় ৮০০ জনের। আধুনিক সময়ের চাহিদা মেটাতে সিমেন্ট, টাইলস ও মার্বেল দিয়ে সম্প্রসারণ করা হলেও, পুরোনো কাঠের হলঘরটিই এখনো মসজিদের স্থাপত্য ও আধ্যাত্মিকতার প্রাণকেন্দ্র।
বুরহান উদ্দিন বলেন, পুরো কাঠের কাজ হাতে ফাইল, ছেনি ও স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে করা হয়েছে। এখনকার মতো যন্ত্রের ব্যবহার ছিল না। কত সময় লেগেছিল, তা আল্লাহই জানেন। এই প্রাচীন শিল্পকর্ম দেখতে অনেক দর্শনার্থীও আসেন।
৭৫ বছর বয়সী সাঈদ উর রহমান বলেন, চারপাশে আধুনিক উন্নয়ন হলেও মসজিদের ভেতরের আবহ বদলায়নি। তিমারগারা ও আশপাশের মানুষ এখনো এখানে নিয়মিত নামাজ পড়তে আসেন।
শৈশবের স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, আগে যেমন দারসে কোরআনের আয়োজন হতো, এখনো তা হয়। রমজানে তারাবিতে খতমুল কোরআন সম্পন্ন হয়, মাদরাসার শিক্ষার্থীরাও অংশ নেয়। অনেক বছর ধরে তিনি এখানে নামাজ আদায় করছেন।
তার ভাষায়, মার্বেলের জাঁকজমক আর কাঠের সৌন্দর্যের তুলনা হয় না। কাঠের এই নির্মাণে নামাজ পড়লে মনে এক ধরনের প্রশান্তি আসে। এর অলংকরণ যেন ভেতরকে ছুঁয়ে যায়।
সূত্র : আরব নিউজ
এনটি