স্পেনে পাহাড়চূড়ায় ১০০০ বছরের ইসলামী ঐতিহ্যের সাক্ষী যে মসজিদ

স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলের একটি পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে প্রায় এক হাজার বছরের পুরোনো আলমোনাস্তের লা রেয়াল মসজিদ। ইউরোপের সবচেয়ে প্রাচীন গ্রামীণ মসজিদগুলোর একটি হিসেবে মসজিদটি আজও আন্দালুসিয়ার ইসলামী ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ইতিহাসবিদদের মতে, নবম ও দশম শতকে আন্দালুসিয়ায় মুসলিম শাসনামলে এই মসজিদ নির্মিত হয়। ধারণা করা হয়, প্রভাবশালী আন্দালুসীয় শাসক আবদুর রহমান তৃতীয়ের আমলে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। বর্তমানে এটিকে স্পেনের একমাত্র গ্রামীণ মসজিদ হিসেবে ধরা হয়। এক হাজার বছর ধরে মূল নকশার অনেকটাই অক্ষুণ্ণ রেখে টিকে আছে মসজিদটি।

প্রায় চার শতক ধরে এই মসজিদ স্থানীয় মুসলিম সমাজের ইবাদতের কেন্দ্র ছিল। তবে ত্রয়োদশ শতকে খ্রিস্টান বাহিনী শহরটি দখল করলে মসজিদটিতে ক্ষতি সাধন করা হয় এবং পরে গির্জায় রূপান্তর করা হয়। তবুও ভবনটির ভেতরে এখনো ইসলামী স্থাপত্য ও ইতিহাসের বহু চিহ্ন স্পষ্টভাবে দেখা যায়। বর্তমানে এটি ওই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক নিদর্শন এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর অন্যতম।
হুয়েলভা প্রদেশের ছোট্ট শহর আলমোনাস্তের লা রেয়ালের ওপরের দিকে অবস্থিত এই মসজিদ থেকে চারপাশের বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক পার্কের মনোরম দৃশ্য দেখা যায়। প্রায় এক হাজার জনসংখ্যার এই শহরের ওপর পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদটি ইতিহাসবিদ ও আধুনিক মুসলিম দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
সহস্র বছরের পুরোনো শিলালিপি
৩৮ বছর আগে এই মসজিদেই কালিমা পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেন স্পেনের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রাফায়েল হার্নান্দেজ মানচা।
আনাদোলু এজেন্সিকে তিনি বলেন, এই স্থাপনাটির পরিবেশ একেবারেই ব্যতিক্রমী। এখানে এলেই মনে হয় যেন সময়ের ভেতর দিয়ে এক ধরনের ঐতিহাসিক যাত্রা করছি।
মসজিদের প্রবেশপথের কাছে একটি স্তম্ভে এখনো প্রায় এক হাজার বছরের পুরোনো একটি আরবি শিলালিপি দেখা যায়। সেখানে লেখা আছে, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’।
হার্নান্দেজ বলেন, শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও এই শিলালিপি পড়লে এখনো তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
তিনি আরও বলেন, আইবেরীয় উপদ্বীপে মুসলিম শাসনের অবসানের পর ক্যাথলিক রাজারা মসজিদটিকে গির্জায় রূপান্তর করেন। সে সময় স্থাপত্যের কিছু অংশ পরিবর্তন ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রোমান যুগের নির্মাণসামগ্রী, ভিসিগথিক উপকরণ এবং উমাইয়া আমলের ঘোড়ার খুর আকৃতির খিলান পরবর্তীতে সংস্কারের সময় কেটে পরিবর্তন করা হয়েছিল।
স্পেনে আরব সংস্কৃতির প্রভাব
হার্নান্দেজ বলেন, স্পেনের সংস্কৃতিতে এখনো আন্দালুসিয়ার প্রভাব দৃশ্যমান। তার ভাষায়, স্প্যানিশ অভিধানের প্রায় ১০ শতাংশ শব্দ আরবি উৎস থেকে এসেছে। স্পেনের অনেক স্থানের নামেও সেই প্রভাব রয়েছে। সেভিয়া, কর্দোভা, গ্রানাডা, তোলেদো কিংবা গুয়াদালকিবির নদীর নামেও আরবি ঐতিহ্যের ছাপ দেখা যায়।
এমনকি আধুনিক স্প্যানিশ অনেক পদবিতেও আরবি উৎস রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। উদাহরণ হিসেবে বিশ্বের এক নম্বর টেনিস খেলোয়াড় কার্লোস আলকারাজের পদবির কথাও বলেন তিনি। তার মতে, আলকারাজ শব্দটির উৎস একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ চেরি।
হার্নান্দেজ বলেন, সাধারণভাবে স্পেনের মানুষ ইসলামী যুগের ইতিহাসকে ইতিবাচকভাবেই দেখে এবং আরবি উৎসের নামগুলোও সাম্প্রতিক সময়ে আবার জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
শহরের সাংস্কৃতিক মিলনকেন্দ্র
আলমোনাস্তের লা রেয়াল শহরের বাসিন্দাদের কাছে এই মসজিদ শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ মিলনকেন্দ্র।
শহর পরিষদের পর্যটন ও সংস্কৃতি বিষয়ক সদস্য মারিয়া হোসে মার্তিন আনর্তে বলেন, এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। আমাদের বাড়ির মতোই গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, প্রতিবছর এক লাখের বেশি পর্যটক এই শতাব্দীপ্রাচীন মসজিদ দেখতে আসেন।
তিনি বলেন, এই স্থান সব সময় খোলা থাকে এবং কখনো ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি। এই অঞ্চলের মানুষের কাছে এটি একটি উত্তরাধিকার। এটি আমাদেরই সংরক্ষণ করতে হবে।
মুসলিমদের নামাজের সুযোগ
যদিও এখানে নিয়মিত কোনো ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা অনুষ্ঠিত হয় না, তবু মুসলিম দর্শনার্থীরা চাইলে এখানে নামাজ আদায় করতে পারেন।
আনর্তে বলেন, এখানে নিয়মিত কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের ইবাদত পালন করাহয় না। তবে কোনো মুসলিম যদি এসে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়তে চান, তাতে কোনো সমস্যা নেই।
গত ২৫ বছর ধরে প্রতি বছরের অক্টোবর মাসে শহরটিতে ইসলামী সংস্কৃতি সম্মেলনের আয়োজনও করা হয়। গ্রানাডা, সেভিয়া ও মাদ্রিদের মতো শহর থেকে গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা এসে সেখানে বক্তৃতা ও সেমিনারে অংশ নেন। পাশাপাশি সংগীত, খাবার এবং নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনও অনুষ্ঠিত হয়। উৎসবের সময় অনেক মুসলিম দর্শনার্থী এই মসজিদে একসঙ্গে নামাজ আদায় করেন।
মারিয়া হোসে মার্তিন আনর্তে বলেন, এই মসজিদ আমাদের সাংস্কৃতিক মিলনস্থল। তিনি আরও বলেন, নবম শতকের একটি স্থাপনা সংরক্ষণের গুরুত্ব আমরা ভালোভাবেই বুঝি।
এনটি