আমেরিকায় মসজিদ ঘিরে বাড়ছে সামাজিক সম্প্রীতি

যুক্তরাষ্ট্রে সংখ্যালঘু হিসেবে বসবাসরত মুসলিমদের কাছে রমজান মানেই এক অনন্য মিলনমেলা। কেবল ইবাদত নয়, বরং অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সামাজিক সংহতির এক শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে আমেরিকার মসজিদগুলো। বিশেষ করে খাদ্য সহায়তা ও আর্থিক অনুদান বিতরণে মসজিদভিত্তিক সেবামূলক কার্যক্রম এখন দেশটির অনেক অসহায় পরিবারের প্রধান অবলম্বন।
বিজ্ঞাপন
মেরিল্যান্ডের সিলভার স্প্রিংয়ে সূর্য ডোবার সাথে সাথেই ইমাম সেন্টারের পার্কিং লটে ভিড় বাড়তে থাকে। কেউ হাতে করে খাবারের ট্রে নিয়ে আসছেন, আবার কেউ ব্যস্ত রান্নাঘরে স্বেচ্ছাসেবীদের সাহায্য করতে। লিম্বু আর ডালের সুবাসে ম ম করছে চারপাশ। ইফতারের ঠিক আগমুহূর্তে খোরমা আর পানির গ্লাস সাজিয়ে অপেক্ষার সেই নীরবতা যেন এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করে।
আমেরিকার শত শত মসজিদে প্রতি সন্ধ্যায় এখন এমনই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। তবে এই রমজান শুধু খাওয়া-দাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন দেশটিতে মুসলিমদের দান-সদকা ও পরোপকারের সবচেয়ে বড় মৌসুমে পরিণত হয়েছে।
দানের পরিসংখ্যান
বিজ্ঞাপন
ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির ‘লিলি ফ্যামিলি স্কুল অফ ফিলানথ্রপি’-র গবেষণা অনুযায়ী, আমেরিকার মুসলিমরা প্রতি বছর প্রায় ১৮০ কোটি ডলার যাকাত প্রদান করেন, যার ৭০ শতাংশই দেওয়া হয় রমজান মাসে। সব মিলিয়ে মার্কিন মুসলিমদের বার্ষিক দান প্রায় ৪৩০ কোটি ডলার। অবাক করার মতো তথ্য হলো, এই সাহায্যের ৮৫ শতাংশই ব্যয় করা হয় আমেরিকার অভ্যন্তরে থাকা দুস্থ মানুষের কল্যাণে।
ইমাম সেন্টারের অপারেশন ম্যানেজার হাদি জানান, রমজানে তাদের ব্যস্ততা বহুগুণ বেড়ে যায়। এখানে প্রতিদিন কয়েকশ মানুষের জন্য বিনামূল্যে ইফতারের আয়োজন করা হয়। হাদি বলেন, আমেরিকায় আমরা সংখ্যালঘু হওয়ায় আমাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও পারিবারিক বন্ধন অনেক বেশি দৃঢ়। মানুষ মসজিদে আসে, একসাথে খায়—এটিই বছরের সেরা সময়।
বিজ্ঞাপন
উদ্বাস্তু ও স্বল্প আয়ের মানুষের ভরসা
ওয়াশিংটন মেট্রোপলিটন এলাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী হওয়ায় অনেক শরণার্থী ও স্বল্প আয়ের পরিবার সংকটে পড়েছে। হাদি বলেন, অনেকেই আমার অফিসে এসে যাকাত বা আর্থিক সাহায্য চান। বিশেষ করে সরকারি সাহায্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অনেক শরণার্থী পরিবার ঘরভাড়া দিতে হিমশিম খায়।
এই সংকট মোকাবিলায় ইমাম সেন্টার ‘ইসলামিক রিলিফ ইউএসএ’-র সাথে মিলে ১৬০টিরও বেশি খাদ্য প্যাকেট বিতরণ করেছে। এছাড়া এখানে বিনামূল্যে হেলথ ক্লিনিকও চালানো হয়, যেখানে রক্তচাপ পরীক্ষা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া হয়। সারা দেশে ‘আইসিএনএ রিলিফ ইউএসএ’-র মতো সংস্থাগুলোও খাদ্য ব্যাংক ও মেডিকেল ক্লিনিক পরিচালনা করছে।
নওমুসলিমদের চোখে ইসলাম
পাঁচ বছর আগে ইসলাম গ্রহণ করা সালমান জানান, মুসলিমদের অমায়িক ব্যবহার ও আতিথেয়তা তাকে এই ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করেছে। তিনি বলেন, তারা কাউকে দূরে ঠেলে দেয় না। দিনের বেলা সেলস অ্যাসোসিয়েট হিসেবে দীর্ঘ সময় কাজ করেও রোজা রাখা তার কাছে কষ্টের মনে হয় না। সালমানের মতে, নিয়ত শুদ্ধ থাকলে আল্লাহ সবকিছু সহজ করে দেন।
সম্প্রীতির নতুন বার্তা
ইন্দোনেশিয়ায় বেড়ে ওঠা হাদির কাছে আমেরিকার এই ভ্রাতৃত্ববোধ একদম নতুন। তিনি জানান, রাস্তার ওপারের গির্জা থেকেও তারা সহযোগিতার প্রস্তাব পেয়েছেন। হাদি বলেন, নিজের দেশে থাকলে এই বিষয়গুলোকে আমরা হয়তো খুব একটা গুরুত্ব দিতাম না। কিন্তু এখানে টিকে থাকতে হলে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতেই হবে।
এনটি