পিতা-মাতার জন্য আল্লাহর দেওয়া সব থেকে বড় নেয়ামত হলো সন্তান। সন্তানের থেকে বড় আর কোনো আনন্দ নেই মা-বাবার জীবনে। শৈশবে সন্তানরা মা-বাবার চোখের শীতলতা, বার্ধক্যে একনিষ্ঠ সঙ্গী এবং মৃত্যুর পর কবর জীবনে নেক আমল পাঠানোর একমাত্র মাধ্যম।
ইসলামে সন্তানের এই নেয়ামত উপভোগ করার পাশাপাশি তাদের প্রতি মা-বাবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা বলা হয়েছে। আজ যারা শিশু, আগামী দিনে তারাই সমাজ ও রাষ্ট্রের হাল ধরবে। তাই সন্তানের কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ পাওয়ার আগে, তাদের প্রাপ্য অধিকারগুলো বুঝিয়ে দেওয়া মা-বাবার প্রধান কর্তব্য।
সন্তানকে কোনো ধরনের জোরজবরদস্তি ছাড়া ইসলামের আলোয় বড় করে তোলা এবং আল্লাহর ইবাদত শেখানো মা-বাবার দায়িত্ব। পবিত্র কোরআনের সূরা আত-তাহরিমের ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।
আদর্শ মা নির্বাচন
ইসলাম প্রতিটি জীবনের অধিকার নিশ্চিত করেছে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে। একজন পুরুষের জন্য বিয়ের সময়ই এমন জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়া উচিত, যিনি একজন আদর্শ মা হওয়ার গুণাবলী ধারণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) কুরাইশ বংশের নারীদের প্রশংসা করে বলেছিলেন, তারা সন্তানদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল এবং স্বামীদের প্রতি যত্নবান হন।
গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মায়ের স্বাস্থ্যের দিকে বিশেষ নজর দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। রোজা রাখলে যদি মা বা সন্তানের কোনো ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তবে ইসলামে সেই মাকে রমজানের রোজা পরে কাজা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
ভালোবাসা ও স্নেহের অধিকার
জন্মের পর থেকেই শিশুর মৌলিক অধিকারগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়। এর মধ্যে রয়েছে পুষ্টিকর খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসাসেবা এবং আকিকা করা। পবিত্র কোরআনে মায়ের দুধ পানের সময়সীমা পূর্ণ দুই বছর নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সন্তানের মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাবার ওপর। এছাড়া সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তার একটি সুন্দর ও অর্থবহ নাম রাখার নির্দেশ দিয়েছেন বিশ্বনবী (সা.)।
রাসূলুল্লাহ (সা.) সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা ও স্নেহ প্রকাশের ব্যাপারে সবসময় তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, যে আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান দেখায় না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।
একবার এক ব্যক্তি মহানবী (সা.)-কে তার নাতিকে চুমু খেতে দেখে অবাক হয়ে বলেন, আমার দশটি সন্তান থাকা সত্ত্বেও আমি কখনো কাউকে চুমু খাইনি। জবাবে নবীজী (সা.) বলেন, যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না। আল্লাহর রাসূল (সা.) আরও বলেন, আল্লাহ যদি তোমার হৃদয় থেকে দয়া কেড়ে নেন, তবে আমার আর কী করার আছে।
মর্যাদাপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা
ইসলামী শরিয়ত প্রতিটি শিশুর একটি সুন্দর ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার নিশ্চিত করেছে। সন্তানের পেছনে খরচ করাকে অন্যতম সেরা দান হিসেবে উল্লেখ করেছেন মহানবী (সা.)। এমনকি বিবাহবিচ্ছেদের মতো অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতেও সন্তানের খাবার, পোশাক, শিক্ষা ও চিকিৎসার যাবতীয় খরচ বহন করা বাবার জন্য বাধ্যতামূলক। সামর্থ্য অনুযায়ী এই ব্যয়ভার বহন করার নির্দেশ দিয়ে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, বিত্তবান তার সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে এবং যার জীবনোপকরণ সীমিত, সে আল্লাহ যা দিয়েছেন তা থেকে ব্যয় করবে। এছাড়া জন্মের দিন থেকেই সন্তানকে উত্তরাধিকারের আইনি অধিকার দিয়েছে ইসলাম।
সন্তানদের মাঝে সমতা ও ন্যায়বিচার
ইসলামে সব সন্তানের প্রতি সমান আচরণ করার ওপর কঠোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। উপহার দেওয়া, অর্থ খরচ করা কিংবা স্নেহ-ভালোবাসা প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো এক সন্তানকে অন্য জনের ওপর প্রাধান্য দেওয়া যাবে না।
তৎকালীন গোত্রতান্ত্রিক ও বৈষম্যমূলক সমাজে ইসলাম যেভাবে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছিল, ঠিক একইভাবে পারিবারিক জীবনেও সন্তানদের মাঝে সমতা বজায় রাখার নির্দেশ দেয়। সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আমানত, আর এই আমানতের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই মা-বাবা ইহকাল ও পরকালে পুরস্কৃত হবেন।
এনটি
