ফিলিপাইনের রৌদ্রোজ্জ্বল মিন্দানাও অঞ্চলের মাগুইন্দানাও দেল সুর প্রদেশের এক শান্ত গ্রামীণ জনপদে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক অনন্য স্থাপত্য দিমাহুকুম মসজিদ। তবে বিশ্বজুড়ে এর পরিচিতি অন্য নামে, সবাই একে চেনেন গোলাপি মসজিদ হিসেবে।
মসজিদটির চোখধাঁধানো গোলাপি রঙের দেয়াল ও গম্বুজ শুধু নান্দনিকতার পরিচয় দেয় না, বরং এই রঙ বহন করছে শান্তি, ভালোবাসা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির এক গভীর বার্তা। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতায় জর্জরিত একটি অঞ্চলে এই মসজিদ এখন সহাবস্থান ও আশার আলো দেখাচ্ছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও নির্মাণশৈলী
২০১৪ সালে তৎকালীন মেয়র সামসুদ্দীন দিমাহুকুমের একক উদ্যোগে এই মসজিদটি নির্মিত হয়। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, চতুর্দশ শতাব্দীতে আরব ও গুজরাটি বণিকদের হাত ধরে ফিলিপাইনে ইসলামের আগমন ঘটেছিল। সেই সুদীর্ঘ মুসলিম ঐতিহ্যের পথ ধরেই এই আধুনিক স্থাপত্যের জন্ম।

মেয়রের পারিবারিক জমিতে তার নিজস্ব অর্থায়নেই গড়ে ওঠে প্রায় ২০০ মুসল্লির ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই মসজিদ। এই মসজিদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এর নির্মাণকাজে মুসলিম ও খ্রিস্টান উভয় সম্প্রদায়ের শ্রমিকেরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছিলেন। দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস মুছে মিন্দানাওয়ের বুকে এক নতুন ভ্রাতৃত্বের বীজ বপন করতে এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
মসজিদটির স্থাপত্যশৈলীতে রয়েছে আধুনিক ও ধ্রুপদী ইসলামী ধারার এক অপূর্ব মিশ্রণ। দুই তলাবিশিষ্ট এই ভবনের নিচ তলায় রয়েছে মূল নামাজ ঘর এবং ওপরে রয়েছে সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের জায়গা। ঐতিহ্যবাহী মিনার এবং গম্বুজের পাশাপাশি এর দরজা ও জানালায় সোনালী রঙের কারুকাজ করা হয়েছে, যা গোলাপি রঙের পটভূমিতে এক রাজকীয় আবহ তৈরি করেছে।

পর্যটন ও সংস্কৃতির নতুন দিগন্ত
২০১৪ সালের ২৮ জুন পবিত্র রমজান মাসের প্রথম দিনে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয় এই মসজিদ। এরপর থেকে মসজিদটি শুধু মুসলিমদের ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং দ্রুতই পরিণত হয়েছে ফিলিপাইনের অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ট্রাভেল ব্লগগুলোর কল্যাণে বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের কাছে মসজিদটি এখন দর্শনীয় স্থান।
সবুজ ধানক্ষেতের মাঝে মাথা তুলে থাকা উজ্জ্বল গোলাপি রঙের এই মসজিদ দেখতে প্রতিদিন দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য পর্যটক আসেন। এখানে প্রবেশের জন্য কোনো ফি দিতে হয় না। অমুসলিম দর্শনার্থীদের জন্যও রয়েছে উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার। তবে ধর্মীয় রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শালীন পোশাক পরিধান করতে হয়, এজন্য নামমাত্র অনুদানের বিনিময়ে প্রবেশমুখেই ঐতিহ্যবাহী পোশাক ধার নেওয়ার চমৎকার ব্যবস্থা রয়েছে।
স্মৃতির আলোয় সম্প্রীতির বার্তা
গোলাপি রঙের প্রতি গভীর অনুরাগের কারণে স্থানীয়দের কাছে মেয়র সামসুদিন দিমাহুকুম পরিচিত ছিলেন গোলাপি মেয়র হিসেবে। তিনি তার কার্যালয় এবং নিজের বাড়িও রাঙিয়েছিলেন এই রঙে। ২০১৬ সালের ২৮ অক্টোবর পুলিশের সাথে এক বন্দুকযুদ্ধে মেয়রের আকস্মিক মৃত্যু হয়। তার এই প্রস্থান মিন্দানাওয়ের শান্তি প্রক্রিয়ায় একটি বড় ধাক্কা দিলেও তার রেখে যাওয়া এই মসজিদটি আজও সম্প্রীতির আলো ছড়াচ্ছে।
বর্তমানে মুসলিম মিন্দানাওয়ের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের অধীনে এই মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় ইবাদতখানা নয়, বরং এটি ফিলিপাইনের বুকে বহু সংস্কৃতির সহাবস্থান ও শান্তি প্রতিষ্ঠার এক জীবন্ত ইশতেহার হিসেবে টিকে আছে।
এনটি
