প্রযুক্তির এই তীব্র গতিময় জীবনে আমরা কি কখনো থমকে দাঁড়িয়ে নিজেকে একটি জরুরি প্রশ্ন করেছি— পবিত্র কোরআনের সাথে আমাদের সম্পর্কটা আসলে কেমন? ফেসবুক, ইউটিউব বা এক্সের (সাবেক টুইটার) মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা প্রতিদিন যে পরিমাণ সময় ও শ্রম ব্যয় করি, তার কতটুকু আল্লাহর দেওয়া জীবনবিধান পড়া, বোঝা কিংবা চর্চায় ব্যয় করছি? হিসাব মেলাতে গেলে আমাদের অনেককেই হয়তো লজ্জায় পড়তে হবে।
পবিত্র কোরআন এমন এক অমূল্য রত্নভাণ্ডার, যা আমরা অবহেলা আর উদাসীনতায় অবলীলায় হারিয়ে ফেলছি। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ১০টি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস আমাদের সেই ভুলের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই বাণীগুলো মনোযোগ দিয়ে অনুধাবন করলে কোরআনের সাথে আমাদের হারিয়ে যাওয়া আত্মিক সম্পর্ক আবারও প্রাণ ফিরে পাবে।
মর্যাদার অনন্য শিখর
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বেশ কিছু হাদিসে কোরআন পাঠ ও চর্চাকারীদের বিশেষ মর্যাদার কথা বলা হয়েছে।
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যিনি দক্ষতার সাথে কোরআন তেলাওয়াত করেন, তিনি সম্মানিত ও পুণ্যবান ফেরেশতাদের সঙ্গী হবেন। আর যিনি কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও তোতলামি করে বা আটকে আটকে কোরআন পড়েন, তিনি দ্বিগুণ সওয়াব পাবেন। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) বর্ণনা করেন, কিয়ামতের দিন কোরআন ধারণকারীকে বলা হবে, কোরআন পাঠ করতে করতে উপরে আরোহণ করতে থাকো। দুনিয়াতে তুমি যেভাবে ধীরস্থিরভাবে তারতীলসহ পড়তে, সেভাবে পড়ো। কারণ তোমার চূড়ান্ত অবস্থান হবে তোমার পঠিত শেষ আয়াতের জায়গায়। (সুনানে আবু দাউদ ও তিরমিজি)
হজরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যিনি নিজে কোরআন শেখেন এবং অন্যকে তা শেখান। (সহীহ বুখারী)
সওয়াব লাভের অফুরন্ত ভাণ্ডার
কোরআন শুধু পড়ার বিষয় নয়, এর প্রতিটি অক্ষরে লুকিয়ে আছে বিপুল সওয়াব ও প্রতিদান।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষর যে ব্যক্তি পাঠ করবে, তার জন্য একটি পুণ্য বা নেকি রয়েছে। আর প্রতিটি নেকি দশ গুণ বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়। আমি বলছি না যে, ‘আলিফ-লাম-মীম’ মিলে একটি অক্ষর। বরং আলিফ একটি অক্ষর, লাম একটি অক্ষর এবং মীম আরেকটি অক্ষর। (সুনানে তিরমিজি)
কিয়ামতের কঠিন দিনে সুপারিশকারী
মহাবিপদের দিনে যখন মানুষের কোনো আশ্রয় থাকবে না, তখন কোরআন তার পাঠকের পাশে এসে দাঁড়াবে।
হজরত আবু উমামা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা কোরআন তেলাওয়াত করো। কারণ কিয়ামতের দিন এই কোরআন তার পাঠকের জন্য সুপারিশকারী হিসেবে উপস্থিত হবে। (সহীহ মুসলিম)
হজরত আন-নওয়াস ইবনে সামআন (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কেয়ামতের দিন কোরআন এবং দুনিয়াতে যারা এর ওপর আমল করত, তাদের হাজির করা হবে। তখন সূরা বাকারা এবং সূরা আল-ইমরান তাদের পাঠকদের পক্ষে জোরালো সুপারিশ করার জন্য সবার সামনে এগিয়ে আসবে। (সহীহ মুসলিম)
কোরআন শিক্ষার মজলিসে অফুরন্ত রহমত
দলবদ্ধভাবে আল্লাহর ঘরে বসে কোরআন চর্চা করার আলাদা এক আধ্যাত্মিক সুফল রয়েছে।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখনই কোনো দল আল্লাহর কোনো ঘরে (মসজিদে) সমবেত হয়ে আল্লাহর কিতাব তেলাওয়াত করে এবং নিজেদের মধ্যে তা নিয়ে পড়ালেখা বা আলোচনা করে, তখন তাদের ওপর বিশেষ প্রশান্তি নাজিল হয়, আল্লাহর রহমত তাদের ঢেকে নেয়, ফেরেশতারা তাদের ঘিরে রাখে এবং আল্লাহ স্বয়ং তার নিকটবর্তী ফেরেশতাদের দরবারে তাদের কথা আলোচনা করেন। (সহীহ মুসলিম)
অন্তরে কোরআন ধারণের গুরুত্ব
কোরআনকে বুকে ধারণ করা এবং তা ভুলে না যাওয়ার জন্য নিয়মিত অনুশীলনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে হাদিসে।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যার অন্তরে কোরআনের কোনো অংশ নেই, সে যেন একটি পরিত্যক্ত বা উজার বাড়ি। (সুনানে তিরমিজি)
হজরত আবু মুসা আশআরী (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা নিয়মিত কোরআনের চর্চা বা পুনরাবৃত্তি করো। সেই সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মদের জীবন, এটি রশি থেকে উটের পালিয়ে যাওয়ার চেয়েও দ্রুত মানুষের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, শুধু দুই ধরনের ব্যক্তির ক্ষেত্রে ঈর্ষা বা তাদের মতো হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করা বৈধ। প্রথমত, যাকে আল্লাহ কোরআনের জ্ঞান দান করেছেন এবং সে দিন-রাত তা তেলাওয়াত ও চর্চা করে। দ্বিতীয়ত, যাকে আল্লাহ ধন-সম্পদ দিয়েছেন এবং সে দিন-রাত তা আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে খরচ করে। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
এনটি
