বিজ্ঞাপন

‘আল্লাহর তরবারি’ উপাধি পেয়েছিলেন যে সাহাবি

‘আল্লাহর তরবারি’ উপাধি পেয়েছিলেন যে সাহাবি

শত যুদ্ধ। শূন্য পরাজয়! ইতিহাসের পাতায় তিনি এমন এক অপরাজেয় সেনাপতি, যার তলোয়ারের গতি,  নিখুঁত যুদ্ধকৌশলের সামনে উড়ে গিয়েছিল তৎকালীন পৃথিবীর দুই পরাশক্তি রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্য। তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিধর দুই পরাশক্তিকে পরাজিত করার সৌভাগ্য হয়েছিল তার। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে ডেকেছিলেন 'সাইফুল্লাহ' বা 'আল্লাহর তলোয়ার' নামে। তিনি ইসলামের ইতিহাসের অপরাজেয় মহাবীর হজরত খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)। আধুনিক যুগেও তার রণকৌশল বিশ্বসেরা সামরিক একাডেমিগুলোতে পাঠ্য।

জন্ম ও বেড়ে ওঠা

খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) নবুয়তের ৩০ বছর আগে মক্কার কুরাইশ বংশের বনু মাখজুম শাখায় জন্মগ্রহণ করেন। এই শাখাটি আরবে যুদ্ধবিদ্যা এবং সামরিক নেতৃত্বের জন্য বিখ্যাত ছিল। তার পিতা ওয়ালিদ বিন মুগিরা ছিলেন মক্কার অত্যন্ত ধনী এবং প্রভাবশালী নেতা। ছোটবেলা থেকেই খালিদ ঘোড়সওয়ারি, তলোয়ার চালানো এবং কুস্তিতে অনন্য পারদর্শিতা অর্জন করেন।

উহুদ থেকে মদীনা: সত্যের আলোয় ফেরা

খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) ৫৯২ খ্রিষ্টাব্দে মক্কার বিখ্যাত কুরাইশ বংশের বনু মাখজুম গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তীর চালনা, তলোয়ার যুদ্ধ, ঘোড়সওয়ারিতে ছিলেন অনন্য। ইসলাম গ্রহণের আগে তার সামরিক বুদ্ধিমত্তার কারণেই উহুদ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী বেশ বিপর্যস্ত হয়েছিল। কিন্তু হুদাইবিয়ার সন্ধির পর ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সত্যের সন্ধান পান। কারো দাওয়াত ছাড়াই নিজের চিন্তা ভাবনাতেই মদীনায় গিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা.) হাতে হাত রেখে ইসলাম গ্রহণ করেন এই বীর। তিনি যেমন বীর ছিলেন তেমনি দারুণ ভাবুকও ছিলেন।

মুতার যুদ্ধ ও ‘সাইফুল্লাহ’ উপাধি

মুসলিম হিসেবে খালিদ (রা.)-এর অংশ নেওয়া প্রথম বড় যুদ্ধ ছিল ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দের মুতার যুদ্ধ। রোমানদের বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে একে একে তিনজন মুসলিম সেনাপতি শহীদ হন। মুসলিম বাহিনী যখন নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে। তখন যুদ্ধের হাল ধরেন খালিদ। তার চতুর যুদ্ধকৌশলে রোমানরা বিভ্রান্ত হয়ে পালিয়ে যায় এবং মুসলিম বাহিনী এক অলৌকিক জয় নিয়ে মদীনায় ফেরে। 

মুতার যুদ্ধে প্রায় দুই লাখ রোমান সৈন্যের বিরুদ্ধে মাত্র তিন হাজার সৈন্য নিয়ে তিনি এই বিজয় অর্জন করেন।  এই বীরত্ব দেখে মহানবী (সা.) তাকে ‘সাইফুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর তলোয়ার’ উপাধিতে ভূষিত করেন। নবীজির জীবদ্দশায় মক্কা বিজয়সহ আরও বেশ কয়েকটি যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর ১৪টি যুদ্ধ অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছিল তার।

খেলাফতে রাশেদার যুগে দ্রুত সম্প্রসারণমান ইসলামী সাম্রাজ্যের বিস্তৃতিতে হজরত খালেদ বিন ওয়ালিদর(রা:)-এর অসামান্য ভূমিকা ছিল। হজরত ওমর ফারুক (রা.)-এর শাসনামলে মুসলমান ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের মধ্যে বিখ্যাত যে ইয়ারমুকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়, সেই যুদ্ধের নেতৃত্বে ছিলেন হজরত খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)। তার অসীম সাহসিকতায় মুসলমানরা বিজয় লাভ করে। 
এই যুদ্ধে মুসলিমদের বিজয়ের ফলে সিরিয়ায় বাইজেন্টাইন শাসনের অবসান ঘটে। সামরিক ইতিহাসে এই যুদ্ধ অন্যতম ফলাফল নির্ধারণকারী যুদ্ধ হিসেবে গণ্য হয়।

পদের মোহহীন এক বিনয়ী সৈনিক

বীরত্বের পাশাপাশি খালিদ (রা.)-এর জীবন আমাদের বিনয় ও আনুগত্যের এক অনন্য শিক্ষা দেয়। দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর শাসনকালে তাকে প্রধান সেনাপতির পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। খলিফা চেয়েছিলেন মানুষ যেন মনে না করে যে শুধু খালিদের কারণেই সব যুদ্ধে জয় আসে, বরং জয় আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে। এই আদেশে বিন্দুমাত্র ক্ষোভ প্রকাশ না করে খালিদ (রা.) একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ওমরের জন্য যুদ্ধ করি না, আমি ওমরের রবের জন্য যুদ্ধ করি।’

মৃত্যু

যিনি সারা জীবন যুদ্ধের ময়দানে শাহাদাতের স্বপ্ন দেখেছেন, তার বিদায় ছিল কিছুটা ভিন্ন রকম। ৬৪২ খ্রিষ্টাব্দে (২১ হিজরী) সিরিয়ার হোমসে নিজের বিছানায় অসুস্থ অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন এই মহাবীর। মৃত্যুর আগে তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন—

‘আমি শাহাদাতের ইচ্ছা নিয়ে এত বেশি যুদ্ধে লড়াই করেছি যে আমার শরীরে এমন কোনো ক্ষতচিহ্ন নেই যা বর্শা বা তলোয়ারের আঘাতের কারণে হয়নি। এর পরেও আমি এখানে বিছানায় পড়ে একটি বৃদ্ধ উটের মতো মারা যাচ্ছি।’

আমাদের জন্য শিক্ষা

খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) শুধু একজন সেনাপতিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন অদম্য সাহস ও কৌশলের এক জীবন্ত উপাখ্যান। তার জীবনের প্রতিটি যুদ্ধ আমাদের শেখায় কীভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতিকে জয় করতে হয়। তার জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো আমাদের শেখায় পদের চেয়ে দায়িত্ব এবং ঐক্য ও আনুগত্য কতটা বড় হতে পারে। 

তলোয়ারের ধার দিয়ে যিনি ইতিহাস গড়েছিলেন, শত শত বছর পরও তিনি পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে বীরত্বের সেরা প্রতীক হয়ে বেঁচে আছেন। ইতিহাসের পাতায় তার নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে—তিনি সাইফুল্লাহ, আল্লাহর এক অপরাজেয় তলোয়ার। ইতিহাসের এই ধ্রুবতারা ২১ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন।