বিজ্ঞাপন

তিউনিসিয়ায় ইসলামের আগমন যেভাবে

তিউনিসিয়ায় ইসলামের আগমন যেভাবে

সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বর্তমান তিউনিসিয়াসহ সমগ্র উত্তর আফ্রিকায় খ্রিস্টধর্ম এক বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওফাতের পর দামেস্কভিত্তিক উমাইয়া খিলাফতের অধীনে এক বিশাল ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ৬৭০ খ্রিষ্টাব্দে আরব মুসলিম সেনাপতি উকবা ইবনে নাফের নেতৃত্বে একটি বাহিনী তৎকালীন রোমান প্রদেশ আফ্রিকায় প্রবেশ করে, যা আরবিতে ইফ্রিকিয়া নামে পরিচিত ছিল।

দামেস্কের উমাইয়া রাজবংশের প্রতিনিধি হিসেবে উকবা ইবনে নাফে কায়রোয়ান শহরটি প্রতিষ্ঠা করেন, যার অর্থ দুর্গ। পরবর্তীকালে এই শহরটিই মুসলিম বাহিনীর বিজয়ের প্রধান ঘাঁটিতে পরিণত হয়। উপকূল এবং পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে কায়রোয়ানের এই ভৌগোলিক অবস্থান বেছে নেওয়ার পেছনে সেনাপতির একটি বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল। কার্থেজিয়ান ও রোমানদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত তিউনিসিয়ার দক্ষিণের স্বায়ত্তশাসিত বারবার উপজাতিদের অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতেই এই কৌশলগত অবস্থান বেছে নেওয়া হয়েছিল।

প্রথমে কুসাইলার নেতৃত্বে খ্রিষ্টান বারবার বাহিনী আরব মুসলিমদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। তবে শেষ পর্যন্ত বারবাররা পরাজিত হয় এবং কুসাইলাকে বন্দী করা হয়। এরপর খলিফা আবদুল মালিকের শাসনামলে উত্তর আফ্রিকায় ইসলামী বিজয় এক নতুন মাত্রা পায় এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চল কার্থেজ মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে আসে।

আরব মুসলিম বাহিনী বারবারদের এলাকায় একের পর এক বিজয় লাভ করলেও কিছু উপজাতি তখনও তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। এদের মধ্যে জারাওয়া উপজাতি অন্যতম, যাদের নেতৃত্বে ছিলেন দিহিয়া নামের এক নারী, যাকে আরবরা আল-কাহেনা বা ভবিষ্যৎদ্রষ্টা বলে ডাকত। এই বাহিনী কায়রোয়ানের মূল মুসলিম ঘাঁটিতে সরাসরি আঘাত না করলেও তিউনিসিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ক্রমাগত আক্রমণ চালিয়ে যেত। ৬৯৬ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান আলজেরিয়ার তেবেসায় তিনি আরবদের পরাজিত করেন। তবে শেষ পর্যন্ত আল-জেম নামক স্থানে তিনি নিহত হন। 

আঘলাবিদ রাজবংশের সূচনা

৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে দামেস্কে উমাইয়া খিলাফতের পতনের পর উত্তর আফ্রিকায় বারবারদের মধ্যে আবারও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। বাগদাদে আব্বাসীয় খিলাফত দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হলেও এই অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনা সহজ ছিল না। রাজধানী বাগদাদ থেকে দূরত্বের কারণে ইফ্রিকিয়ার স্থানীয় আরবরাও আব্বাসীয় খিলাফতের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ পছন্দ করছিলেন না। এই চরম অস্থিতিশীলতার মধ্যে ইব্রাহিম ইবনে আল-আঘলাব নামের এক প্রাদেশিক নেতা নিজের সামরিক বাহিনী নিয়ে ইফ্রিকিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনেন।

এই সফলতার স্বীকৃতিস্বরূপ বাগদাদের খলিফা তাকে আমির উপাধিতে ভূষিত করেন। এর ফলে ৮০০ থেকে ৯০৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ইফ্রিকিয়ায় আঘলাবিদ রাজবংশের শাসন বজায় থাকে। আঘলাবিদদের আমলে এই অঞ্চলের অর্থনীতির অভূতপূর্ব উন্নতি হয়। উন্নত পানি সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে শহরগুলোতে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি জলপাই ও অন্যান্য ফসলের ফলন বাড়ানো হয়। একই সাথে সাহারা মরুভূমি ও সুদানসহ মহাদেশের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের সাথে নতুন বাণিজ্য পথ তৈরি হয়। সমুদ্রপথে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ার সাথেও বাণিজ্যিক যোগাযোগ স্থাপিত হয়, যা দ্রুতই ব্যবসায়ীদের প্রধান গন্তব্যে পরিণত হয়েছিল।

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এলেও আঘলাবিদদের শাসন আরব কিংবা বারবার, কোনো পক্ষের কাছেই খুব একটা জনপ্রিয় ছিল না। দূরবর্তী বাগদাদ থেকে নিয়ন্ত্রিত এই শাসনের বৈধতা নিয়ে জনগণের মনে প্রশ্ন ছিল। পাশাপাশি তৎকালীন শাসকদের অনৈসলামিক জীবনধারা এবং ইসলাম গ্রহণকারী নতুন বারবার মুসলিমদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। এই আচরণ তিউনিসিয়ার প্রধান মালেকি মাজহাবের আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল।

রুস্তমিদ রাজ্য ও খাওয়ারিজম আন্দোলন

ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.)-এর বিরুদ্ধে খাওয়ারিজম বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে এই মতবাদের উৎপত্তি। খাওয়ারিজম শব্দের অর্থ যারা বের হয়ে গেছে। তাদের কঠোর এবং সাম্যবাদী বিশ্বাস অনেক বারবারকে আকৃষ্ট করেছিল। উত্তর আফ্রিকায় নব্য মুসলিম বারবারদের ওপর বিশেষ কর আরোপসহ বিভিন্ন বৈষম্যের প্রতিবাদে তারা শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। দশকের পর দশক ধরে চলা এই সশস্ত্র সংঘর্ষের পর ৭৭২ খ্রিষ্টাব্দে বারবার খাওয়ারিজমরা পরাজিত হয়।

তবে পরাজিত হলেও এই মতবাদের অনুসারীরা অঞ্চল ছেড়ে যায়নি। তারা ৭৭৬ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান আলজেরিয়ার ওয়ার্সেনিস পর্বতের দক্ষিণ ঢালে তাহের্ত শহরকে রাজধানী করে একটি নতুন প্রশাসন গড়ে তোলে। পার্সিয়ান বংশোদ্ভূত ইমাম আবদুর রহমান ইবনে রুস্তমের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত এই অঞ্চলটি রুস্তমিদ রাজ্য নামে পরিচিতি পায়, যা ৯০৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এটি ছিল সম্পূর্ণ ধর্মীয় নেতাদের দ্বারা পরিচালিত একটি থিওক্রেসি বা ধর্মীয় রাষ্ট্র।

ইফ্রিকিয়ার আঘলাবিদরা এই প্রতিবেশী রুস্তমিদ রাজ্যকে পরাজিত করতে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত সাহারা অঞ্চলে তাদের কর্তৃত্ব স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়। রাজধানী তাহের্ত মূলত সাহারা অঞ্চলের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিপুল সমৃদ্ধি অর্জন করেছিল। 

ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের পণ্যের বিনিময়ে এখান থেকে সোনা, হাতির দাঁত ও দাস ব্যবসা পরিচালিত হতো। এই রাজ্যে মুসলিম বিশ্বের পাশাপাশি খ্রিষ্টানদেরও স্বাগত জানানো হতো। তবে ৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে ফাতিমিদদের আক্রমণে রুস্তমিদ রাজ্য এবং আঘলাবিদ প্রদেশ দুটোরই পতন ঘটে। বর্তমানেও পূর্ব আলজেরিয়া, পশ্চিম লিবিয়া এবং তিউনিসিয়ার জারবা দ্বীপে কিছু খাওয়ারিজম অনুসারী দেখতে পাওয়া যায়।

ফাতিমিদ বংশের উত্থান ও মিশর অভিমুখে যাত্রা

ইয়েমেনের আবু মুহাম্মদ উবায়দুল্লাহ আল-মাহদি এবং সিরিয়ার উবায়দুল্লাহর হাত ধরে বর্তমান পূর্ব আলজেরিয়ার কুতামা বারবারদের সমর্থনে মাগরেব অঞ্চলে ফাতিমিদ বংশের উত্থান ঘটে। শিয়া মতবাদের এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা উবায়দুল্লাহ আল-মাহদি নিজেকে মহানবী (সা.)-এর কন্যা হজরত ফাতিমা (রা.)-এর বংশধর দাবি করায় এই আন্দোলনের নাম হয় ফাতিমিদ। কুতামা বারবাররা বাগদাদের আব্বাসীয় খিলাফতকে প্রত্যাখ্যান করে এই নতুন শক্তির সাথে হাত মেলায়।

সাম্রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে ফাতিমিদরা আঘলাবিদদের ওপর বারবার আক্রমণ চালাতে থাকে। অবশেষে ৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে তারা কায়রোয়ান শহর দখল করে এবং একই সাথে রুস্তমিদ রাজ্যেরও পতন ঘটায়। ইফ্রিকিয়ার পূর্ব উপকূলে তারা মাহদিয়া নামে নতুন রাজধানী গড়ে তোলে।

তবে তিউনিসিয়ার সুন্নি মুসলমানরা ফাতিমিদদের এই আগমনকে সহজে মেনে নেয়নি। কারণ ফাতিমিদের শিয়া ঐতিহ্য তৎকালীন মালেকি মাজহাবের বিশ্বাসের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক ছিল। তার ওপর তাদের চাপিয়ে দেওয়া কঠোর কর ব্যবস্থা সুন্নি জনগণের অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে দেয়। উবায়দুল্লাহ আল-মাহদির মৃত্যুর পর তার পুত্রের শাসনামলে ফাতিমিদরা খাওয়ারিজমদের এক বিশাল আক্রমণের মুখে পড়ে। দশম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মাহদিয়ায় ফাতিমিদরা পরাজিত হলেও পরে তারা আবারও ঘুরে দাঁড়ায় এবং বিদ্রোহীদের দমন করে।

চতুর্থ ফাতিমিদ খলিফা আল-মুইজের কার্যকর কূটনীতি ও সফল যুদ্ধনীতির কারণে উত্তর আফ্রিকায় ফাতিমিদ শাসন শক্ত ভিত্তি পায়। তবে ৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে মিশর বিজয়ের পর ফাতিমিদ সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু পূর্ব দিকে স্থানান্তরিত হয়। মিশরে তারা নতুন রাজধানী কায়রো এবং বিশ্ববিখ্যাত আল-আজহার মসজিদ প্রতিষ্ঠা করে, যা পরবর্তীতে সুন্নি ইসলামের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। ৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে খলিফা আল-মুইজ স্থায়ীভাবে মিশরে চলে যান এবং এরপর ফাতিমিদরা আর কখনো ইফ্রিকিয়ায় ফিরে আসেনি। দীর্ঘদিনের যুদ্ধে ক্লান্ত কুতামা বারবারদের নিজস্ব অস্তিত্বও একসময় বিলীন হয়ে যায় এবং ইফ্রিকিয়ার শাসনভার স্থানীয় বারবার রাজবংশের হাতে চলে যায়, যার প্রথম শাসক ছিলেন জিরিড রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বুলুগগিন ইবনে জিরি।

আলমোহাদ সাম্রাজ্য ও উত্তর আফ্রিকার ঐক্য

জিরিড রাজবংশ শুরুতে ফাতিমিদ খিলাফতের অধীনে শাসন করলেও ১০৪৮ খ্রিষ্টাব্দে তারা পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণা করে। তবে একাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে বানু হিলাল উপজাতির আক্রমণ জিরিড বংশকে দুর্বল করে দেয়। এই অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে ১১৪৮ খ্রিষ্টাব্দে সিসিলির নরম্যানরা মাহদিয়া শহর দখল করে নেয়।

এমন এক পরিস্থিতিতে ১১৩০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে উত্তর আফ্রিকায় আলমোহাদ রাজবংশের শাসন শুরু হয়। মরক্কোর মাসমুদা বারবার উপজাতির ইবনে তুমার্তের মাধ্যমে এই আন্দোলনের সূচনা। তারা আল্লাহর একত্ববাদের ওপর জোর দিয়ে এক কঠোর ইসলামী আইন প্রচার করত, যা মালেকি মাজহাবসহ অন্য সব ধারাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। ইবনে তুমার্তের মৃত্যুর পর প্রথম আলমোহাদ খলিফা হিসেবে দায়িত্ব নেন আবদ আল-মুমিন। উত্তর আফ্রিকায় একটি ঐক্যবদ্ধ ইসলামী সমাজ গঠনের লক্ষ্যে তিনি মাগরেবের পূর্ব দিকে অভিযান শুরু করেন। দ্বাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তিনি ইফ্রিকিয়ায় পৌঁছে নরম্যানদের পরাজিত করে তিউনিস দখল করেন। এর ফলে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ উত্তর আফ্রিকা বা মাগরেব অঞ্চল স্থানীয় একটি শক্তির অধীনে ঐক্যবদ্ধ হয়।

আলমোহাদদের এই বিপুল শক্তি, সম্পদ এবং সেনাবাহিনীর সুনামের কারণে দূরবর্তী ইংল্যান্ডের রাজা জনও চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন যে এই আফ্রিকান শক্তি তাদের ইউরোপীয় অঞ্চলে কোনো আক্রমণ চালাবে কি না। তবে বিশাল এই সাম্রাজ্য ধরে রাখার মতো পর্যাপ্ত জনবল ও সম্পদ আলমোহাদদের ছিল না। মাত্র দুই দশক পর আলমোরাভিদদের উত্তরসূরি দাবিদার বানু গানিয়া বালিয়ারিক দ্বীপে এক বিশাল বিদ্রোহ শুরু করে, যা পরবর্তী পাঁচ দশক ধরে এই অঞ্চলকে সম্পূর্ণ অস্থিতিশীল করে রাখে।

হাফসিদ রাজবংশ ও তিউনিসিয়ার স্বর্ণযুগ

১২৩০ খ্রিষ্টাব্দে আলমোহাদ সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ থেকে হাফসিদ রাজবংশের জন্ম হয়, যা ১৫৭৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত টিকে ছিল। হাফসিদ খলিফা আবু জাকারিয়া আলমোহাদদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং আমির উপাধি নেন। পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি ইফ্রিকিয়ার প্রধান শহরগুলোসহ পশ্চিমে আলজিয়ার্স এবং পূর্বে ট্রিপলিতানিয়া নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন।

১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দে বাগদাদের পতনের পর আবু জাকারিয়ার পুত্র আল-মুস্তানসির নিজেকে মুসলিম বিশ্বের খলিফা হিসেবে ঘোষণা করেন। যদিও তিন বছর পর এই উপাধি অন্য এক প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে চলে যায়, তবুও হাফসিদ রাজবংশ এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান পরাশক্তি হিসেবে টিকে ছিল। এই হাফসিদ আমলেই মালেকি মাজহাব পুনরায় এই অঞ্চলের প্রধান আইনি কাঠামো হিসেবে ফিরে আসে, তবে এবার তা যুগের প্রয়োজনে অনেকটাই উদার ও আধুনিক রূপ লাভ করে।

এই নতুন আইনি ব্যবস্থায় স্থানীয় রীতিনীতিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ইসলামের জনস্বার্থ বা মাসলাহা ধারণার ওপর ভিত্তি করে আইনের এমন কিছু ব্যাখ্যা তৈরি করা হয় যা তিউনিসিয়ার সমাজকে আজও প্রভাবিত করে আসছে।

হাফসিদ আমলে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে। বিশেষ করে সাহারা ও সুদানের পাশাপাশি ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথেও তাদের চমৎকার কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। সমুদ্র বাণিজ্য সহজ করতে তিউনিস, মাহদিয়া, গাবেস এবং জারবা বন্দরগুলোকে আধুনিকায়ন করা হয়। ব্যবসা-বাণিজ্যে সততা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইসলামী আইনকে আরও সমৃদ্ধ করা হয়।

তবে চতুর্দশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সাহারা অঞ্চলের বাণিজ্যে ধস নামায় এই সাম্রাজ্য অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। ১২৭০ খ্রিষ্টাব্দে অষ্টম ক্রুসেডের সময় ফ্রান্সের রাজা লুই (নবম) তিউনিস দখলের চেষ্টা করলে ইউরোপের সাথে হাফসিদদের সম্পর্ক খারাপ হয়। এর পাশাপাশি মরক্কোর মারিনিদ রাজবংশ দুবার তিউনিস দখল করে হাফসিদদের অস্তিত্ব কাঁপিয়ে দেয়।

সর্বশেষ নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং স্প্যানিশ ও তুর্কিদের মধ্যকার যুদ্ধে হাফসিদ রাজবংশ সম্পূর্ণ দুর্বল হয়ে পড়ে। শেষ দিকে বিদেশি শক্তির আগ্রাসনের সামনে হাফসিদ শাসকরা স্রেফ নীরব দর্শক হয়ে ছিলেন। অবশেষে ১৫৭৪ খ্রিষ্টাব্দে তুর্কি উসমানীয় বাহিনী তিউনিস জয় করলে অবসান ঘটে দীর্ঘ ঐতিহ্যের হাফসিদ রাজবংশের।

এনটি

বিজ্ঞাপন