বিজ্ঞাপন

হিজরি নববর্ষ

ইসলামের যে ইতিহাসের সূচনা খলিফা ওমরের (রা.) হাত ধরে

ইসলামের যে ইতিহাসের সূচনা খলিফা ওমরের (রা.) হাত ধরে

হিজরি ও খ্রিস্টাব্দ—এই দুই ক্যালেন্ডার বা বর্ষপঞ্জির মাস গণনার পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। খ্রিস্টাব্দ বা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর আবর্তনকে ভিত্তি করে হিসাব করা হয়। বিপরীতে হিজরি সাল গণনা করা হয় পৃথিবীর চারদিকে চাঁদের ঘূর্ণন চক্রের ওপর ভিত্তি করে। আর এই কারণেই হিজরি ক্যালেন্ডারে প্রতিটি মাস ২৯ অথবা ৩০ দিনের হয়ে থাকে, যা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের মতো নির্দিষ্ট নয়।

এই পার্থক্যের ফলে হিজরি বর্ষ প্রতি বছর সৌর বছর বা খ্রিস্টাব্দের চেয়ে ১১ দিন কম হয়। আর এ কারণেই মুসলমানদের প্রধান প্রধান ধর্মীয় উৎসব ও ইবাদত যেমন রমজান, ঈদ বা হজ প্রতি বছর ভিন্ন ভিন্ন ঋতু ও সময়ে ঘুরে ঘুরে আসে।

যেভাবে শুরু হলো হিজরি সাল

ইসলামের প্রথম যুগে বর্তমান সময়ের মতো হিজরি সালের প্রচলন ছিল না। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ফারুক (রা.)-এর শাসনামলে একটি বিশেষ ঘটনার পর এই সাল গণনার সূচনা হয়। তিনিই প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে হিজরি সাল ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন।

ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, হিজরি ১৭ সনে হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) একটি চিঠি পান, যেখানে শুধু শাবান মাসের কথা উল্লেখ ছিল, কিন্তু কোনো বছরের নাম ছিল না। বছর উল্লেখ না থাকায় কোন বছরের শাবান মাস তা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এরপরই তিনি খলিফা ওমর (রা.)-এর কাছে চিঠি লিখে জানান যে, বছর ছাড়া শুধু মাসের নাম থাকায় দাপ্তরিক চিঠিপত্র আদান-প্রদানে জটিলতা দেখা দিচ্ছে।

এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য খলিফা ওমর (রা.) সাহাবিদের নিয়ে একটি জরুরি বৈঠক ডাকেন। বৈঠকে নতুন একটি বর্ষপঞ্জি চালুর বিষয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব আসে। কেউ কেউ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মবর্ষ থেকে সাল গণনার প্রস্তাব করেন, আবার কেউ কেউ তার ওফাত বা মৃত্যুর বছরকে বেছে নেওয়ার পক্ষে মত দেন। এমনকি পারস্য বা রোমানদের ক্যালেন্ডার অনুসরণেরও প্রস্তাব আসে।

দীর্ঘ আলোচনার পর সাহাবিরা মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঐতিহাসিক ‘হিজরত’ বা মক্কা থেকে মদিনায় গমনের ঘটনাকে বেছে নেওয়ার ব্যাপারে একমত হন। কারণ এটি ছিল ইসলামি রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন ও ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়। খলিফা ওমর (রা.) তখন বলেছিলেন, হিজরতের মাধ্যমেই সত্য ও মিথ্যার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি হয়েছিল, তাই একেই ভিত্তি করে সাল গণনা করা হোক।

সাহাবিদের সর্বসম্মতিক্রমে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মদিনায় হিজরতের বছরটিকে (যা ছিল খ্রিস্টীয় ৬২২ সাল) ইসলামি ক্যালেন্ডারের প্রথম বছর হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। তবে হিজরতের আসল মাস ১২ রবিউল আউয়াল হলেও বছরের প্রথম মাস হিসেবে বেছে নেওয়া হয় পবিত্র মুহাররমকে। কারণ মুহাররম মাসটি আসে হজের মৌসুম শেষ হওয়ার ঠিক পরপরই, যা আরবদের জন্য নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করার একটি স্বাভাবিক সময় ছিল।

ইসলামপূর্ব যুগে আরবি মাসের নাম যেমন ছিল

প্রাচীনকালে আরবরা কোনো নির্দিষ্ট সাল বা তারিখ ধরে হিসাব করত না। তারা কোনো বড় বা ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে বছরের নামকরণ করত। যেমন—আবরাহার হাতি বাহিনীর আক্রমণের বছরকে বলা হতো আমুল ফিল বা হস্তীবর্ষ, কিংবা ফুজ্জারের যুদ্ধের বছর ইত্যাদি।

তবে চাঁদের মাসগুলোর নাম তারা নিজেদের জীবনযাত্রা বা প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে মিলিয়ে রাখত। পরবর্তীতে আরবরা যখন চান্দ্র মাসগুলোর নাম সুনির্দিষ্ট করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন এর আগের নামগুলো বদলে যায়।

যেমন, পবিত্র রমজান মাসের প্রাচীন নাম ছিল নাতিক। তীব্র গরমের কারণে কিংবা যুদ্ধের পর এই মাসে প্রচুর ধনসম্পদ আসত বলে একে নাতিক বা গর্ভবতী উটের সঙ্গে তুলনা করা হতো।জিলহজ মাসের নাম ছিল মাইমুন বা বুরাক, যার অর্থ বরকতময়। এছাড়া জমাদিউল আউয়াল মাসের নাম ছিল হানিন, কারণ বসন্তকাল শেষ হওয়ার পর এই মাসে আরবের মুসাফিররা নিজ দেশের জন্য ব্যাকুল বা স্মৃতিকাতর হয়ে উঠতেন।

পরবর্তীতে মহানবী (সা.)-এর পঞ্চম ঊর্ধ্বতন পুরুষ কিলাব বিন মুররার সময়ে আরবের গোত্রপ্রধানেরা একত্র হয়ে হিজরি মাসের বর্তমান নামগুলো চূড়ান্ত করেন। এর মধ্যে জিলকদ, জিলহজ, মুহাররম ও রজব—এই চার মাসকে হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের আমল থেকেই পবিত্র ও যুদ্ধনিষিদ্ধ মাস হিসেবে গণ্য করা হতো, যা ইসলাম আসার পরও অপরিবর্তিত।

এনটি