বিজ্ঞাপন

চেক প্রজাতন্ত্রের মুসলিমরা কেমন আছেন?

চেক প্রজাতন্ত্রের মুসলিমরা কেমন আছেন?

চেক প্রজাতন্ত্রে মোট জনসংখ্যার মাত্র শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশেরও কম মানুষ মুসলিম। অথচ এই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকেই এখন নিজেদের দেশে সতীর্থ নাগরিকদের তীব্র ও অসম বিদ্বেষের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। দেশটিতে ক্রমাগত বাড়তে থাকা চরম ঘৃণামূলক অপরাধের শিকার হতে হচ্ছে মুসলিমদের। 

চেক প্রজাতন্ত্রে মুসলিমদের সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে ধারণা করা হয়, এই সংখ্যা ৫ হাজার থেকে ২০ হাজারের মধ্যে। এদের একটি বড় অংশই বাস করেন রাজধানী প্রাগে।

রাজনীতিতে  ইসলাম বিদ্বেষ

সংখ্যায় এত কম হওয়া সত্ত্বেও চেক রাজনীতিতে এখন প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসলাম। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ২০১৭ সালে দেশটির ঝুলন্ত পার্লামেন্টের অচলাবস্থা নিরসনের চাবিকাঠি ছিল এমন এক রাজনীতিবিদের হাতে, যার একমাত্র রাজনৈতিক নীতিই হলো—ইসলাম ও সন্ত্রাসবাদকে না বলা।

বর্তমানে চেক প্রজাতন্ত্রে ইসলামকে একটি ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও অন্যান্য ধর্মের মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকে মুসলিমদের বঞ্চিত রাখা হয়েছে। তারা নিজস্ব ধর্মীয় স্কুল প্রতিষ্ঠা, আইনগতভাবে স্বীকৃত বিয়ে বা জনসমক্ষে কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান করার অধিকার পান না।

মসজিদের দেয়ালে ইসলাম বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ

২০২০ সালের ৪ জানুয়ারি ব্রনোর একটি মসজিদের দেয়ালে লিখে দেওয়া হয়—চেক প্রজাতন্ত্রে ইসলাম প্রচার করবেন না! অন্যথায় আপনাদের মেরে ফেলা হবে। ১৯৯৮ সালে নির্মিত এই মসজিদ দেশটির প্রথম মসজিদ। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এটি কট্টর ডানপন্থী এবং উগ্র বামপন্থী দলগুলোর একের পর এক হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে আসছে।

এর আগে ২০১৩ সালে মসজিদটির সদর দরজায় শুকরের মাংস ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং প্রবেশদ্বারের চারপাশে শুকরের হাড় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হয়েছিল। এর ঠিক দুই বছর পর, ২০১৫ সালে মসজিদের জানালাগুলো ভেঙে ফেলা হয় এবং প্রবেশদ্বারের দেয়ালে ইঞ্জিনের পোড়া তেল স্প্রে করে নষ্ট করা হয়।

হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় চেক নাগরিকদের মধ্যে বর্ণবাদী মনোভাব, বিশেষ করে মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ সবচেয়ে বেশি।

দেশ ছাড়ছেন অনেক মুসলিম

প্রাগের মুসলিম কমিউনিটি অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ৫৮ বছর বয়সী চেক মুসলিম ভ্লাদিমির সানকা বলেন, এখানকার বেশিরভাগ মুসলিমই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা আইটি বিশেষজ্ঞ। অথচ কিছু রাজনৈতিক দল আমাদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়ে ইসলামকে এ দেশ থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করছে।

ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত রায়েদ শেখ জানান, প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে তাদের অনেক বন্ধুবান্ধব ইতিমধ্যে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। আর যারা যাওয়ার কথা ভাবছেন, তাদের ক্ষেত্রেও এই বর্ণবাদ ও ইসলামভীতিই প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে।

প্রাগে তিন বছর পড়াশোনা করা ৩৬ বছর বয়সী পাকিস্তানি নাগরিক মনজুর হুসাইন শাহি নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ব্রনোর মানুষ খুবই বর্ণবাদী। সেখানে প্রায়শই মসজিদ বা মুসলিমদের লক্ষ্য করে কোনো না কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। তারা মুসলিমদের মনে-প্রাণে ঘৃণা করে। বলা যায়, পুরো পূর্ব ইউরোপই চরম বর্ণবাদী এবং মুসলিম বিরোধী। চেক প্রজাতন্ত্রে ক্রমাগত বাড়তে থাকা ঘৃণামূলক অপরাধের কারণে মনজুর দেশটি ছেড়ে সম্প্রতি আয়ারল্যান্ডে পাড়ি জমিয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় বা একাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোনো ইসলামভীতি নেই উল্লেখ করে মনজুর বলেন, পড়াশোনার জায়গায় আমি বা আমার মুসলিম সহকর্মীরা কখনো কোনো বিদ্বেষের শিকার হইনি। যা ঘটে তা মূলত রাস্তাঘাটে বা গণপরিসরে। একজন মুসলিমকে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে স্থানীয়রা রীতিমতো ভয় পায়। বিশেষ করে হিজাব বা নিকাব পরা নারীদের দেখলে তারা নিজেদের অনিরাপদ মনে করে। তবে সাধারণ মানুষ যে সবাই এমন, তা নয়। প্রাগে থাকার সময় বাসে একবার এক ব্যক্তি আমার দিকে তেড়ে এসে চিৎকার করছিল, তখন বাসের অন্য যাত্রীরাই তাকে বাস থেকে নেমে যেতে বাধ্য করে।

উগ্র জাতীয়তাবাদ ও ইসলামভীতি

বর্তমান চেক প্রজাতন্ত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে সুরক্ষামূলক উগ্র জাতীয়তাবাদ। মধ্য ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো এখানেও কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিবিদরা সাধারণ মানুষের মনে অভিবাসীদের প্রতি এক ধরনের অস্তিত্বের সংকট ও ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছেন। এই দেশে জাতীয়তার প্রধান মাপকাঠি হলো ভাষা। ফলে কেউ যদি চেক ভাষায় কথা বলতে না পারে, তবে তাকে সন্দেহভাজন এবং চরমপন্থী হিসেবে গণ্য করা হয়।

বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ নাস্তিক প্রধান দেশ চেক প্রজাতন্ত্র। চীন ও জাপানের পরেই সবচেয়ে বেশি ঘোষিত নাস্তিক মানুষের বসবাস এখানে। কমিউনিস্ট আমল এবং দীর্ঘদিনের ধর্মনিরপেক্ষকরণের ফলে দেশটির মাত্র ২০ শতাংশ মানুষ আনুষ্ঠানিক কোনো ধর্মের সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে ১০ দশমিক ৩ শতাংশ ক্যাথলিক খ্রিস্টান, শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ প্রোটেস্ট্যান্ট এবং বাকি ৯ শতাংশ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী।

ধর্মীয় স্বাধীনতা খর্ব করার চেষ্টা

দেশটিতে মূলত আরব, ককেশাস ও বলকান অঞ্চল থেকে পড়াশোনা ও কাজের সূত্রে আসা মানুষরাই মুসলিম কমিউনিটি গড়ে তুলেছেন। এরা সাধারণত নিজেদের আড়ালে রাখতেই পছন্দ করেন। তবুও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হিজাব পরা কিংবা হালাল উপায়ে পশু জবাইয়ের মতো সাধারণ বিষয়গুলো নিয়েও মাঝেমধ্যেই বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়।

২০১৫ সালে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলো থেকে শরণার্থীরা ইউরোপের দিকে আসতে শুরু করলে চেক প্রজাতন্ত্রে মুসলিমদের প্রতি এই বিদ্বেষ আরও প্রকাশ্য রূপ নেয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের শরণার্থী কোটা পদ্ধতি অনুযায়ী চেক প্রজাতন্ত্রের অন্তত ৪ হাজার ৩০০ জন শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দেশটির সরকার ইইউর এই নির্দেশ মানতে সাফ অস্বীকৃতি জানায় এবং মাত্র ১২ জন শরণার্থীকে গ্রহণ করে।

দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মিলোস জেমান এই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন, ফ্রান্স বা জার্মানির মতো আমাদের দেশেও সন্ত্রাসী হামলার ঝুঁকি তৈরি হোক, তা আমরা কোনোভাবেই হতে দিতে পারি না। অভিবাসীদের আশ্রয় দিলে তা বর্বর হামলার উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করবে। কোটা পূরণ না করে উল্টো শরণার্থীদের আটকে রাখার জন্য দুটি বিশাল ডিটেনশন সেন্টার তৈরি করে চেক সরকার। ফলে হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড ও স্লোভাকিয়ার পাশাপাশি চেক প্রজাতন্ত্রও ইইউর শরণার্থী কোটার তীব্র বিরোধিতাকারী দেশ হিসেবে পরিচিতি পায়।

রাজনৈতিক উস্কানি ও সামাজিক প্রভাব

সরকারি এই পদ্ধতিগত বিদ্বেষের স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায় দেশটির রাজনীতিতে। কট্টর ডানপন্থী দলগুলো এখন প্রকাশ্যে ইসলামকে নিয়ে উপহাস ও আক্রমণ করছে। ২০১৬ সালে ব্লক এগেইনস্ট ইসলাম নামের একটি উগ্রপন্থী দল প্রাগের সৌদি দূতাবাসের সামনে মুসলিমদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে হাজির হয়। সেখানে তারা হজের পবিত্র আনুষ্ঠানিকতাকে ব্যঙ্গ করতে একটি ভ্রাম্যমাণ টয়লেটকে পবিত্র কাবার প্রতিকৃতি বানিয়ে তার চারপাশে চক্কর দেয়।

ব্রনোর মসজিদের মুসল্লিরা প্রায়ই কট্টর ডানপন্থী দল ওয়ার্কার্স পার্টি অব সোশ্যাল জাস্টিসের (ডিএসএসএস) কর্মীদের দ্বারা হেনস্থার শিকার হন। মসজিদ প্রাঙ্গণ ভাঙচুর ও মুসল্লিদের গালিগালাজ করা এখন নিত্যদিনের ঘটনা। এমনকি মুসলিমদের পশ্চিমা মূল্যবোধ শেখানোর নামে একবার মসজিদের সামনেই অন্তর্বাস ফ্যাশন শোর আয়োজন করেছিল দলটির কর্মীরা।

মার্টিন কনভিকা নামের এক কট্টর ইসলামভীতি ছড়ানো ব্যক্তি প্রাগে আইএসের ভুয়া আগ্রাসনের নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন। সেখানে কৃত্রিম শিরশ্ছেদের দৃশ্যও দেখানো হয়। ২০১৬ সালে এই কনভিকাই ব্রনোর সেই ক্ষতিগ্রস্ত মসজিদের সামনে পবিত্র কোরআন শরীফে আগুন ধরিয়ে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিলেন।

মুসলিমদের প্রতি এমন প্রকাশ্য অবমাননা সামাজিক জীবনেও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। মুসলিমদের লক্ষ্য করে থুতু দেওয়া বা উত্যক্ত করার ঘটনা অহরহ ঘটছে। হিজাব পরার কারণে একবার এক তরুণীকে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অনেক মুসলিম পর্যটক অভিযোগ করেছেন, রাস্তাঘাটে তাদের দিকে ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকানো হয় এবং মৌখিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। বিশেষ করে হিজাবধারী নারীরাই এই আক্রোশের মূল শিকার।

এই ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতার কারণে প্রাগে দীর্ঘ ১০ বছর বসবাসের পর ৪৫ বছর বয়সী আলজেরীয় মুসলিম করিম ফ্রান্স চলে গেছেন। তিনি বলেন, মুসলিমদের প্রতি স্থানীয়দের দৃষ্টিভঙ্গির এই নেতিবাচক পরিবর্তন দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তারা ইসলাম সম্পর্কে কিছুই বোঝে না। এই মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে আমি দেশ ছাড়তে বাধ্য হই। এখন প্রাগের শিশুদের পার্ক থেকে শুরু করে রাস্তাঘাটের সব দেয়ালেই শুধু ইসলাম বিরোধী নোংরা গ্রাফিতি আর ঘৃণামূলক বার্তা চোখে পড়ে।

সূত্র : টিআরটি ওয়ার্ল্ড, আল জাজিরা

এনটি