বিজ্ঞাপন

জেরুজালেম শহর মুসলিমদের কাছে যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ

জেরুজালেম শহর মুসলিমদের কাছে যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ

মুসলিমদের কাছে জেরুজালেম শুধু একটি শহর নয়, বরং তাদের ঈমান ও চেতনার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আরবিতে আল-কুদস বা আল-মাকদিস নামে পরিচিত এই প্রাচীন নগরী ইসলামের অসংখ্য ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় নিদর্শনে সমৃদ্ধ। জেরুজালেমের আধ্যাত্মিক প্রতীক, সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং সমসাময়িক গুরুত্বকে গভীরভাবে অনুধাবন করলেই বোঝা যায়, কেন আজও বিশ্ব মুসলিমের হৃদয়ে এই শহর এতটা মর্যাদার।

পবিত্র মিরাজের পুণ্যভূমি

ইসলামে জেরুজালেমের মর্যাদা সরাসরি জড়িয়ে আছে মহানবী হজরত মুহাম্মদ(সা.)-এর অলৌকিক নৈশ ভ্রমণ বা ইসরা এবং ঊর্ধ্বাকাশে গমনের ঘটনার সঙ্গে, যার বর্ণনা পবিত্র কোরআন ও হাদিসে স্পষ্টভাবে রয়েছে। এই বিশেষ রাতে মহানবী (সা.)-কে মক্কা থেকে অলৌকিক উপায়ে দূরবর্তী মসজিদুল আকসায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখান থেকেই তিনি সাত আসমান পাড়ি দিয়ে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছান, মহাবিশ্বের বিভিন্ন নিদর্শন প্রত্যক্ষ করেন এবং উম্মতের জন্য দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিধান নিয়ে ফিরে আসেন।

ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় বিবরণ অনুযায়ী, প্রাচীন প্রাচীরবেষ্টিত জেরুজালেমের ওল্ড সিটির হারাম আল-শরিফ এলাকাই হলো সেই দূরবর্তী মসজিদ, যেখানে বর্তমানে কুব্বাতুস সাখরা এবং মসজিদুল আকসা দাঁড়িয়ে আছে। 

এই পবিত্র সফরে মহানবী (সা.) সেখানে উপস্থিত পূর্ববর্তী সমস্ত নবী-রাসুলদের ইমামতি করে নামাজ আদায় করেন। মিরাজে যাওয়ার আগে সব নবীদের নিয়ে তার এই নামাজ পড়ার ঘটনা জেরুজালেমকে মুসলিমদের কাছে এক বরকতময় পুণ্যভূমি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। 

এর মাধ্যমে আদম থেকে শুরু করে মূসা ও ঈসা আলাইহিস সালামের মতো পূর্ববর্তী সকল নবী-রাসুলদের নবুয়তের ধারা ইসলামের শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে হস্তান্তরের প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ ঘটে, যা শহরটির ধর্মীয় মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

ইসলামী শাসনামলে সহনশীলতার অনন্য ইতিহাস

শুধু ধর্মীয় কারণ নয়, প্রায় এক সহস্রাব্দেরও বেশি সময় ধরে এই অঞ্চলে মুসলিমদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে জেরুজালেম এক সমৃদ্ধ ইতিহাস বহন করছে।

৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে মহানবী সা.-এর ইন্তেকালের পর, ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে এক শান্তিপূর্ণ চুক্তির মাধ্যমে বাইজেন্টাইনদের কাছ থেকে জেরুজালেম জয় করেন। বিজয়ী হয়েও তিনি কোনো প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি, বরং ধর্মীয় সহনশীলতার এক অনন্য নজির স্থাপন করেন। খ্রিষ্টান বাসিন্দাদের জানমাল ও ধর্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে ওমর জেরুজালেমকে একটি উন্মুক্ত ও বহুত্ববাদী নগরীতে পরিণত করেন, যা মুসলিম, খ্রিষ্টান ও ইহুদি—সব ধর্মের মানুষকে আকৃষ্ট করে।

পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে উমাইয়া, আব্বাসীয় ও ফাতিমিদের মতো মুসলিম রাজবংশগুলোর স্থিতিশীল শাসনে জেরুজালেম ধর্ম, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের এক সমৃদ্ধ কেন্দ্রে পরিণত হয়। 

উমাইয়া শাসনামলে নির্মিত সোনালী গম্বুজের কুব্বাতুস সাখরা স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে আজও জেরুজালেমে ইসলামের স্থায়ী ছোঁয়া বহন করছে। খলিফা ওমরের দেখানো পথ ধরে পরবর্তী মুসলিম শাসকরাও আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির যে পরিবেশ বজায় রেখেছিলেন, তা তৎকালীন ইউরোপের যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে উন্নত ও নজিরবিহীন ছিল।

এমনকি ক্রুসেডের সময় যখন সাময়িকভাবে মুসলিমরা এর নিয়ন্ত্রণ হারায়, তখনও এর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গুরুত্বের কারণে তারা শহরটি পুনরুদ্ধারে জানপ্রাণ দিয়ে লড়াই করেন। অবশেষে ১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবি জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করেন। খলিফা ওমরের ঐতিহ্য বজায় রেখে তিনিও বিজয়ী হয়ে খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের ওপর কোনো নির্যাতন করেননি, বরং ক্রুসেডের কারণে শহর ছেড়ে চলে যাওয়া ইহুদিদের আবারও জেরুজালেমে ফিরে এসে বসবাসের আমন্ত্রণ জানান।

সুলতান সালাহউদ্দিন খ্রিষ্টান ধর্মযাজকদের সঙ্গে চুক্তি করে তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেন। ক্রুসেডারদের হাতে মুসলিম ও ইহুদিদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিপরীতে সুলতান সালাহউদ্দিনের এই উদারতা ইসলামী শাসনের মানবিক দিকটি ফুটিয়ে তোলে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত বিভিন্ন তুর্কি, আরব ও অটোমান মুসলিম শাসনামলে জেরুজালেম আঞ্চলিক শাসনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বহাল ছিল এবং এর ধর্মীয় স্থাপনাগুলো শত শত বছর ধরে মুসলিম তীর্থযাত্রীদের আকর্ষণ করে এসেছে।

অধিকার হরণ ও বর্তমান সংকট

গত প্রায় ১৪০০ বছর ধরে জেরুজালেম মুসলিমদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আবেগের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে টিকে আছে। মক্কা ও মদিনার পর এটিই মুসলিমদের কাছে সবচেয়ে পবিত্র স্থান। ওল্ড সিটির মসজিদ, স্থাপত্য ও সংস্কৃতি আজও এর ইসলামি ঐতিহ্যের সাক্ষ্য দেয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের অধীনে পবিত্র মসজিদুল আকসা এবং সামগ্রিক জেরুজালেমে অ-ইহুদিদের ধর্মীয় অধিকার খর্ব করার এক চরম অসহিষ্ণু চিত্র ফুটে উঠেছে, যা মুসলিমদের গভীরভাবে ব্যথিত করছে।

ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের এই অন্যায় আগ্রাসনের কারণে কেবল মুসলিমরাই নয়, ফিলিস্তিনি খ্রিষ্টানরাও জেরুজালেমে তাদের পবিত্র চার্চ অব দ্য হোলি সেপালকারে স্বাধীনভাবে উপাসনা করার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অতীতের মুসলিম শাসনামলে যেখানে সব ধর্মের মানুষের জন্য এই পবিত্র স্থানগুলো উন্মুক্ত ছিল, বর্তমান ইসরায়েলি শাসনে সেখানে কড়া নিষেধাজ্ঞা আর ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর আঘাত প্রতিনিয়ত দৃশ্যমান হচ্ছে।

আধুনিক আকাঙ্ক্ষা ও মুক্তির প্রতীক

বর্তমান যুগে ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলের অবৈধ দখলদারিত্বের কারণে জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে মুসলিমদের সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগ্রাম আরও তীব্র হয়েছে। জেরুজালেম এখন ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং বিশ্ব মুসলিমের সংহতির প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বহু মুসলিম আজ জেরুজালেমকে আবারও সেই গৌরবময় অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন, যেখানে মুসলিম, খ্রিষ্টান ও ইহুদিরা একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করতে পারত।

ইসলামের ইতিহাসের সঙ্গে জেরুজালেমের সংযোগ অত্যন্ত গভীর। এটি ছিল মুসলিমদের প্রথম কেবলা, যেদিকে মুখ করে প্রাথমিক যুগে নামাজ আদায় করা হতো। ইব্রাহিম, ইয়াকুব, ইউসুফ, দাউদ, সুলায়মান এবং ঈসা আলাইহিস সালামের মতো পবিত্র কোরআনে বর্ণিত নবীগণের স্মৃতিবিজড়িত এই ভূখণ্ড মুসলিমদের হৃদয়ে এক বিশেষ আবেগের জন্ম দেয়।

এনটি