বিজ্ঞাপন

মুসলিমদের জীবনে হিজরি সন যে গুরুত্ব বহন করে

মুসলিমদের জীবনে হিজরি সন যে গুরুত্ব বহন করে

ইসলাম মূলত পারস্পরিক সামাজিক বন্ধনের ধর্ম। এই সামাজিক সম্পর্ক আমাদের জীবনের সবচেয়ে ব্যক্তিগত স্তরেও গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। যেমন ধরা যাক, একজন সচেতন ব্যক্তি হিসেবে আমরা একাকীও নামাজ আদায় করতে পারি। কিন্তু সেই নামাজই যখন জামাতে পড়া হয়, তখন তার সওয়াব ও মর্যাদা বহুগুণ বেড়ে যায়। একইভাবে, কাবা শরিফ তাওয়াফ করার সময় আমরা প্রত্যেকে ব্যক্তিগতভাবে মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি। কিন্তু লাখ লাখ হাজির সাথে একই সময়ে এই ইবাদত সম্পন্ন করার যে যৌথ অনুভূতি, তার সৌন্দর্য ও শক্তি অনন্য।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন

যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমেই যে মানবীয় সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটে, তার প্রমাণ শুধু ইবাদতের ক্ষেত্রগুলোতেই সীমাবদ্ধ নয়। হিজরি বর্ষপঞ্জি মুসলিম সমাজের ঐতিহাসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের এক যৌথ অভিজ্ঞতা। যে ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্য দিয়ে এই বর্ষপঞ্জির সূচনা হয়েছিল, তা একদল সাধারণ বিশ্বাসীকে বিশ্বমঞ্চে একটি প্রধান ধর্মের অনুসারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে, যার মূলনীতি রাজনীতি, সংস্কৃতি বা জাতিগত ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে। এই একটি ঘটনা মুসলিমদের সামাজিক পরিধিকে এক লহমায় বদলে দিয়েছিল।

যেকোনো জনগোষ্ঠীর সামাজিক পরিবেশ গড়ে ওঠে তাদের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া বা যোগাযোগের ওপর ভিত্তি করে। আর ইসলামি বর্ষপঞ্জির সুবাদে বিশ্বের সব প্রান্তের মুসলিমরা একই স্থানে উপস্থিত না থেকেও একই বিশ্বাস, মূল্যবোধ, জ্ঞান ও সময় ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ পান। এর মাধ্যমে আমরা বিশ্বজুড়ে একই সময়ে যৌথ ইবাদত ও উৎসবের আনন্দ উদযাপন করি।

যৌথ অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা

বর্তমান তরুণ প্রজন্মের কাছে হিজরি সন মেনে চলা অনেকটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের মতোই। কারণ ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, রমজান কিংবা আশুরার মতো যৌথ ইবাদতগুলো ইন্টারনেটের মতোই মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এর কার্যকারিতা ও স্থায়িত্ব আজ থেকে ১৪ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে অবিচল রয়েছে।

মুসলিম হিসেবে আমাদের বাস্তবতায় যখন এত বড় একটি বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিদ্যমান, তখন অভিভাবক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব হলো তরুণদের মধ্যে হিজরি সনের বোঝাপড়া ও গুরুত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। তরুণদের জন্য সমাজে নিজের একটি গ্রহণযোগ্য অবস্থান তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। তারা শুধু সবার সাথে মিশতে চায় না, বরং নিজেদের একটি সুস্থ আত্মপরিচয়ও খোঁজে। মুসলিম অভিভাবকদের প্রধান কাজ হলো তরুণদের জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যা তাদের মনের ভেতর আল্লাহভীতি জাগিয়ে তুলবে এবং মুসলিম হিসেবে তাদের আত্মপরিচয়কে আরও সুদৃঢ় করবে।

অনলাইন গেমের চেয়েও বড় বন্ধন

বর্তমান তরুণরা যে সামাজিক পরিবেশে বড় হয়, তা তাদের চিন্তাভাবনা এবং সমাজ সম্পর্কে ধারণাকে প্রভাবিত করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আজকের দিনের অনেক তরুণ ইন্টারনেটে যুক্ত হয়ে বিশ্বখ্যাত অনেক অনলাইন গেম খেলে থাকে। এসব গেমের মূল বিষয় হলো, পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ একই সময়ে বাস্তব সময়ে একে অপরের সাথে যুক্ত হচ্ছে। খেলোয়াড়রা ভিন্ন দেশ, ভিন্ন জাতি বা ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের হতে পারে, কিন্তু তারা সবাই একসাথে সময়টি উপভোগ করছে। এই যৌথ মিথস্ক্রিয়াই একটি গেমিং কমিউনিটি বা দল তৈরি করে।

ঠিক একইভাবে, ইসলামি বর্ষপঞ্জি আমাদের বৈশ্বিক স্তরে একে অপরের সাথে যুক্ত করে এবং পুরো উম্মাহকে এক সুতোয় বাঁধে। তাই হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা এবং এর চর্চা করা অভিভাবক ও শিক্ষক—উভয়ের জন্যই একটি নৈতিক দায়িত্ব। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মত হিসেবে আমাদের অস্তিত্বের সূচনা এবং ভবিষ্যৎ পথচলার প্রতিটি ধাপ এই হিজরি সনের ইতিহাসের সাথেই জড়িয়ে আছে।

অভিভাবক ও শিক্ষকদের ভূমিকা

সময় যেহেতু একমুখী, তাই একে একটি দড়ির সাথে তুলনা করা যেতে পারে। দড়ির সুতোগুলো যেভাবে একসাথে পাকিয়ে শক্ত করা হয়, তা যেমন যেকোনো কিছুকে টেনে ধরে বা বেঁধে রাখতে পারে, হিজরি বর্ষপঞ্জিও মুসলিমদের জন্য ঠিক তেমন কাজ করে। একটি দড়িকে যেমন বহু কাজে লাগানো যায়, ঠিক তেমনি অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদেরও ইসলামি বর্ষপঞ্জি ব্যবহারে সৃজনশীল হতে হবে।

আজকের দিনে কোনো মুসলিম ঘর বা বিদ্যালয় হিজরি ক্যালেন্ডার ছাড়া থাকা উচিত নয়। হিজরি সনের গুরুত্বপূর্ণ তারিখগুলো শুধু ক্যালেন্ডারে দেখে রাখার জন্য নয়, বরং এগুলোকে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। শিক্ষকরা প্রতিদিন সকালে শ্রেণীকক্ষের বোর্ডে খ্রিষ্টাব্দ বা ইংরেজি তারিখের পাশাপাশি হিজরি তারিখও লিখতে পারেন এবং শিক্ষার্থীদের তা ডায়েরিতে নোট করার অভ্যাস করাতে পারেন। স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ঘোষণায় ইংরেজি তারিখের পাশাপাশি হিজরি তারিখও উল্লেখ করা যেতে পারে।

পারিবারিক জীবনেও এর চর্চা বাড়ানো সম্ভব। বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র, স্নাতক সমাবর্তন কিংবা যেকোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানের কার্ডে হিজরি সন ব্যবহার করা যেতে পারে, যাতে আমাদের সন্তানরা খুব স্বাভাবিকভাবেই এই হিসাবের সাথে পরিচিত হতে পারে।

এ ছাড়া, অভিভাবক ও শিক্ষকরা তরুণদের মনে করিয়ে দিতে পারেন যে, ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রতিটি বিশেষ দিন আসলে একটি বৈশ্বিক আয়োজন। এটি আমাদের তরুণদের মনে এই অনুভূতি জাগিয়ে তুলবে যে, তারা পুরো মুসলিম বিশ্বের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এই যৌথ অভিজ্ঞতা তাদের মানসিক ও সামাজিকভাবে আরও শক্তিশালী করে তুলবে।

পবিত্র কোরআনের সূরা আল-ইমরানের ১০৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো, যখন তোমরা একে অপরের শত্রু ছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের অন্তরে প্রীতি স্থাপন করলেন, ফলে তোমরা তার অনুগ্রহে ভাই ভাই হয়ে গেলে। তোমরা তো অগ্নিকুণ্ডের প্রান্তে ছিলে, আল্লাহ তা থেকে তোমাদের রক্ষা করেছেন। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য তার নির্দেশনাবলী স্পষ্ট করেন, যাতে তোমরা হেদায়েত প্রাপ্ত হও।

সূত্র : অ্যাবাউট ইসলাম

এনটি

বিজ্ঞাপন