বিজ্ঞাপন

হাইতিতে যেভাবে জায়গা করে নিচ্ছে ইসলাম

হাইতিতে যেভাবে জায়গা করে নিচ্ছে ইসলাম

হাইতির রাজধানী পোর্ট অব প্রিন্সের ধুলোবালি আর যানজটে ঠাসা ডেলমাস রোডের এক কোণে অবস্থিত একটি সাধারণ সাদা রঙের ভবন। ভবনের গায়ে সবুজ রঙে ইংরেজি ও আরবি হরফে বেশ যত্ন নিয়ে লেখা একটি সাইনবোর্ড সহজেই পথচারীদের নজর কাড়ে। সেখানে লেখা রয়েছে, মসজিদ আল-ফাতিহা, কমিউনিটি মুসলিম ডি হাইতি।

গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকার সময় এক কর্মী মেঝেতে পানি ছিটিয়ে দিতে দিতে হাসিমুখে দর্শনার্থীকে স্বাগত জানিয়ে বললেন, আসসালামু আলাইকুম, মসজিদে আপনাকে স্বাগতম।

আফ্রিকান সংস্কৃতি থেকে আসা ভোদো বা জাদুটোনার প্রতি বিশ্বাসের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ক্যারিবিয়ান দ্বীপদেশ হাইতি। তবে এই দেশটিতে এখন ছোট কিন্তু ক্রমবর্ধমান এক মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস গড়ে উঠছে। দেশটির রাজধানী পোর্ট অব প্রিন্সে দুটি প্রধান ইসলামী কেন্দ্র রয়েছে। এ ছাড়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারীদের হাত ধরে পুরো দেশজুড়ে বর্তমানে প্রায় ডজনখানেক মসজিদ ও ইসলামী কেন্দ্র গড়ে উঠেছে।

প্রধান ইসলামী সংগঠনগুলোর কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৮০ লাখ মানুষের এই দেশটিতে বর্তমানে মুসলমানের সংখ্যা ৪ থেকে ৫ হাজারের মতো।

পোর্ট অব প্রিন্সকে ঘিরে থাকা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে ঐতিহাসিক কারফুর-ফেইলস এলাকা। এখানকার সরু গলিগুলোতে এখন এক চিরন্তন ও সুমধুর সুর প্রতিধ্বনিত হতে শোনা যায়।

চারপাশে যখন বাজার করতে আসা নারীরা কেনাকাটা নিয়ে দরদাম করছেন আর পোর্টেবল রেডিওতে তারস্বরে বাজছে হাইতির জনপ্রিয় কম্পাস সংগীত, ঠিক তখনই নতুন এক মসজিদ থেকে ভেসে আসে মুয়াজ্জিনের আজানের ধ্বনি, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।

হাইতিতে ক্যাথলিক খ্রিস্টধর্ম ও ভোদো বিশ্বাসের এক ধরনের মিশ্রণ থাকায় দেশটির কত শতাংশ মানুষ ভোদো চর্চা করেন, তার সঠিক হিসাব পাওয়া বেশ কঠিন। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর বর্তমান তথ্যমতে, হাইতির প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ ভোদো চর্চা করেন। তবে এই ভোদো বিশ্বাসীদের প্রায় সবাই আবার খ্রিস্টধর্মের কোনো না কোনো সম্প্রদায়ের সাথে যুক্ত।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মুসলিমরা বেশ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছেন। টুপি এবং সুবিন্যস্ত দাড়িওয়ালা মুসলিম পুরুষ এবং হিজাব পরা নারীদের এখন হাইতির বেশ কয়েকটি শহরের রাস্তায় নিয়মিত চলাচল করতে দেখা যায়।

দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় শহর সান রাফায়েল থেকে আসা নাওন মার্সেলুস নামের এক ব্যক্তি সম্প্রতি হাইতির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ চেম্বার অব ডেপুটিজের প্রথম মুসলিম সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।

ডেলমাস রোডের আল-ফাতিহা মসজিদের সাদা দাড়িওয়ালা প্রভাবশালী ইমাম আব্দুল আলী বলেন, আমি ১৯৮৫ সালে হাইতিতে এসেছিলাম শুধু ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার জন্য। কানাডায় থাকার সময় আমি ইসলাম গ্রহণ করি এবং পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে আমরা মসজিদের জন্য এই জায়গাটি কিনি।

তিনি আরও বলেন, হাইতির মানুষ সত্যের সন্ধান চায় এবং ইসলাম তাদের সেই সত্যের পথ দেখাবে। আমরা যদি মহান আল্লাহর দেখানো পথে চলি, তবে এখানকার পরিস্থিতি বদলে যাবে বলে আমার বিশ্বাস।

অর্থনৈতিক মন্দা, অপুষ্টি, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং রাজনৈতিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক সাহায্য তহবিলের ৫০ কোটি ডলার আটকে থাকায় হাইতির সাধারণ মানুষ চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছে। এই চরম দারিদ্র্যপীড়িত দেশে ইসলামের দানশীলতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের নীতি অনেক নতুন ধর্মান্তরকারীকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করছে।

কারফুর ফেইলস সেন্টারের ইমাম রাসিন গঙ্গা নিউইয়র্কে কলেজে পড়ার সময় ইসলামের সংস্পর্শে আসেন। তিনি বলেন, হাইতির মানুষ হিসেবে আমরা স্বভাবগতভাবেই একে অপরকে সাহায্য করতে পছন্দ করি। শিক্ষা, অর্থ কিংবা যেকোনো প্রয়োজনে অন্যকে সাহায্য করার এক সহজাত প্রবৃত্তি আমাদের মাঝে রয়েছে। একজন হাইতিয়ান এবং একজন মুসলিম হিসেবে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই দায়িত্ববোধের নীতি আমাদের মানুষের হৃদয়ে খুব দ্রুত জায়গা করে নিয়েছে।

হাইতিতে ইসলামের বিস্তার নিয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক জরিপ চালিয়েছেন আলজেরীয় অর্থনীতিবিদ ইয়াসিন খোল্লাদি। তিনি জানান, তাত্ত্বিক দিক থেকে ইসলামের সামাজিক ন্যায়বিচার, শিক্ষার প্রসার এবং সাম্যতাবোধ হাইতির অনেক সংকট সমাধানের পথ দেখাতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ইসলামে ব্যবসা-বাণিজ্য, ভূমির বিরোধ মীমাংসা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার মতো বিষয়গুলোর সুন্দর সমাধান রয়েছে। ফলে হাইতির মানুষ একে একটি কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে দেখছে।

হাইতিতে ইসলামের এই চর্চা দেশটির ইতিহাস নিয়ে কিছু নতুন এবং চমকপ্রদ তত্ত্বের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে দাসদের বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেওয়া বিপ্লবী বুকম্যানকে নিয়ে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে।

ডেলমাস মসজিদের মুসল্লি সামাকি ফুসাইনি বলেন, প্রচলিত ইতিহাসের মতো বুকম্যান কোনো  ভোদো পুরোহিত ছিলেন না, তিনি আসলে একজন মুসলিম ছিলেন। জ্যামাইকা থেকে আসায় ইংরেজিতে তার নাম দেওয়া হয়েছিল বুকম্যান বা বইয়ের মানুষ। কারণ তিনি সবসময় একটি বই পড়তেন, যাকে ফরাসি শাসকরা উল্টো বই বলতেন। তারা উল্টো বই বলতেন কারণ সেটি ছিল পবিত্র কোরআন, যা ডান থেকে বামে পড়তে হয়। ইতিহাসবিদরা যেটিকে বোইস কেইম্যান বা ভোদো উৎসবের জঙ্গল বলেন, সেটি মূলত ছিল বোয়া কে ইমাম বা ইমামের বাড়ির জঙ্গল।

হাইতির এই মসজিদগুলো সম্পূর্ণ স্থানীয় অর্থায়নে চলে, বিদেশ থেকে কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা পায় না। তবে ১৯৯৪ সালে হাইতির ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট জঁ-বারত্রঁ আরিস্তিদকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে যে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনী দেশটিতে প্রবেশ করেছিল, তাদের মাধ্যমে এই নতুন ধর্মাবলম্বীরা কিছুটা অনুপ্রেরণা পায়।

ইমাম আলী জানান, ওই সময় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে আসা পাকিস্তানি ও বাংলাদেশি মুসলিম সৈন্যরা আমাদের মসজিদে নামাজ পড়তে আসতেন। তারা আমাদের সাথে দ্বীনি আলোচনা করতেন এবং আমাদের বিশ্বাসকে আরও সুদৃঢ় করতে উৎসাহিত করতেন।

ভোদো ও ক্যাথলিক প্রধান এই দেশটিতে মুসলমানরা সংখ্যালঘু হওয়ায় তারা সবসময় ইসলামের শান্তিপূর্ণ রূপটি তুলে ধরার চেষ্টা করেন। কয়েক দশকের একনায়কতন্ত্র ও সামরিক নিপীড়ন সহ্য করা হাইতির এই মুসলিমরা আমেরিকার ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার মতো সহিংসতা থেকে নিজেদের স্পষ্ট দূরত্ব বজায় রাখেন।

ইমাম রাসিন গঙ্গা বলেন, মহান আল্লাহ বলেছেন, যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে, তবে সে যেন পুরো মানবজাতিকেই হত্যা করল। নিউইয়র্কে যারা ওই হামলা চালিয়েছিল, তারা আসলে মানুষের কাতারেই পড়ে না। মুসলিমদের উচিত তাদের ভালোবাসার শক্তি দিয়ে মানুষের মন জয় করা। কারণ হাইতির ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে যে, সহিংসতা কখনো কোনো সমাধান এনে দিতে পারে না।

সূত্র : আরব নিউজ

এনটি