বিজ্ঞাপন

হাইতিতে লুকিয়ে আছে ইসলামের যে অজানা ইতিহাস

হাইতিতে লুকিয়ে আছে ইসলামের যে অজানা ইতিহাস

২০২৪ সালে ঐতিহাসিক হাইতিয়ান বিপ্লবের ২২০ বছর পূর্তি হয়েছে। ইতিহাসের পাতায় গৌরবোজ্জ্বল এই বিপ্লবে মুসলিমদের অংশগ্রহণ কেমন ছিল এবং ইসলাম কীভাবে হাইতির সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করেছিল—তা নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দ্য নিউ আরব।

১৫২২ সালের ২৫ ডিসেম্বর। হিস্পানিওলা দ্বীপে (বর্তমানে যা হাইতি ও ডমিনিকান রিপাবলিক নামে পরিচিত) একদল আফ্রিকান দাস তাদের বন্দিকারীদের ওপর আচমকা আক্রমণ চালিয়ে বসে। ইতিহাসে এটিই ছিল নতুন বিশ্বে বা আমেরিকায় দাসদের প্রথম রেকর্ডকৃত বিদ্রোহ। এই ঘটনার পর স্পেনের রাজা পঞ্চম চার্লস আমেরিকার দাস খামারগুলোতে ইসলামি ভাবধারার সাথে যুক্ত আফ্রিকানদের নিয়ে আসার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।

ইতিহাসবিদদের মতে, ১৬ থেকে ১৯ শতাব্দী পর্যন্ত চলা আটলান্টিক দাস বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ আফ্রিকানকে আমেরিকায় পাচার করা হয়েছিল। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই ছিলেন মুসলিম। এই মুসলিমরা আমেরিকার বিভিন্ন দেশে দাস বিদ্রোহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। যেমন—১৮৩৫ সালে ব্রাজিলের বাহিয়া অঞ্চলে পবিত্র রমজান মাসের এক রবিবারে মুসলিম দাসদের নেতৃত্বে বিখ্যাত মালে বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল। ওই বিদ্রোহে অংশ নেওয়া দাসরা মাথায় টুপি ও গায়ে সাদা লম্বা আলখাল্লা পরেছিলেন এবং তাদের সাথে তসবিহ ও সুরক্ষার জন্য কোরআনের আয়াত লেখা তাবিজ ছিল।

১৭৯১ থেকে ১৮০৪ সাল পর্যন্ত চলা হাইতিয়ান বিপ্লবকে ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দাস বিদ্রোহ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে আমেরিকার অন্য অঞ্চলের দাসদেরও স্বাধীনতার আলো দেখিয়েছিল। হাইতিয়ান বিপ্লবের প্রধান নায়ক তুসো লউভারতু, জঁ-জ্যাক দেসালিন, ফ্রাঁসোয়া মাকান্দাল, দুতি বুকম্যান এবং সেসিল ফাতিমারা ফরাসি উপনিবেশবাদীদের তাড়াতে গেরিলা যুদ্ধকৌশল ব্যবহার করেছিলেন। তবে এই বিপ্লবে মুসলিমদের উপস্থিতি এবং বর্তমান হাইতিয়ান সংস্কৃতিতে ইসলামের প্রভাব কতটা গভীর, তা নিয়ে এখন নতুন করে গবেষণা হচ্ছে।

আরবি ভাষার সূত্র ও বুকম্যানের আসল পরিচয়

ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং আমেরিকায় মধ্যযুগে মুসলিমদের উপস্থিতির অন্যতম বড় প্রমাণ মেলে আরবি ভাষার সূত্র ধরে। যেমন ওমর ইবনে সাঈদ নামে এক ফুলাানি পণ্ডিতকে দাস হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যিনি আরবি ভাষায় নিজের আত্মজীবনী লিখে গেছেন।

হাইতির ক্ষেত্রেও এমন প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৮ শতকের চিকিৎসক ও ইতিহাসবিদ মিশেল এতিয়েন দেসকরতিলজ হাইতির এক মধ্যবয়সী আফ্রিকান শিক্ষকের কথা উল্লেখ করেছিলেন, যিনি তাকে আরবি হরফে ২০ লাইনের একটি দোয়া লিখে দিয়েছিলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর হাইতিয়ান ইতিহাসবিদ থমাস মাদিও লিখেছেন, বিপ্লবী নেতা মাকান্দাল অত্যন্ত ক্যারিশম্যাটিক ও শিক্ষিত ছিলেন এবং তিনি আরবি ভাষায় বেশ দক্ষ ছিলেন।

একইভাবে হাইতির বিপ্লবের অন্যতম প্রধান রূপকার দুতি বুকম্যানের নাম নিয়েও রয়েছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। জ্যামাইকা থেকে হাইতিতে আসা এই নেতার ইংরেজি নাম ছিল বুকম্যান, যা ফরাসিরা বুকম্যান বা বুকমান উচ্চারণ করত। আফ্রিকায় শিক্ষিত মুসলিমদের বুকম্যান বা বইয়ের মানুষ বলে ডাকা হতো। ইতিহাসবিদদের ধারণা, তিনি মূলত কোরআনের অনুসারী বা মুসলিম ছিলেন বলেই তাকে বুকম্যান বলা হতো। ফরাসিরা তার পড়া বইটিকে উল্টো বই বলত, কারণ আরবি বা কোরআন ডান থেকে বামে পড়তে হয়, যা ফরাসিদের কাছে উল্টো মনে হয়েছিল।

এমনকি হাইতির স্বাধীনতাকামী পলাতক দাসদের (যাদের মেরুন বলা হতো) নামের মধ্যেও মুসলিম সংস্কৃতির স্পষ্ট ছাপ ছিল। যেমন সুরিনামের দুই মেরুন নেতার নাম ছিল জমজম ও আরাবি।

ধর্মীয় ও ভোদো  সংস্কৃতির মিশ্রণ

ক্যারিবীয় অঞ্চলে দাস হিসেবে আসার পর আফ্রিকানরা নিজেদের ধর্মবিশ্বাস টিকিয়ে রাখতে এক অনন্য কৌশল বেছে নিয়েছিলেন। তারা স্থানীয় ও ঔপনিবেশিক ক্যাথলিক ধর্মের বাহ্যিক রূপের আড়ালে নিজেদের ভেতরের আফ্রিকান সংস্কৃতি ও ইসলামী বিশ্বাসকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। একেই বলা হয় ধর্মীয় সমন্বয়বাদ বা সিনক্রেইটিজম।

হাইতির বিখ্যাত ভোদো বা ভুডু ধর্মের মধ্যেও ইসলামের এই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের সন্ধান পান গবেষকরা। হাফিংটন পোস্টে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, বছরের পর বছর ধরে নিজেদের ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে না পারায় আফ্রিকানদের ইসলামী বিশ্বাসের যে অবশিষ্টাংশ রয়ে গিয়েছিল, তারই সাথে আদিবাসী সংস্কৃতি ও ক্যাথলিক ধর্মের মিশ্রণে আজকের হাইতিয়ান ভোদো ধর্মের উৎপত্তি।

এমনকি হাইতির ভোদো সংগীতের মধ্যেও ইসলামী শব্দ ও সুরের প্রভাব রয়েছে। গবেষক লেগ্রেইস বেনসন জানান, হাইতির ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় গানের মধ্যে আসসালামু আলাইকুম বা আ সালাম আলাই-এর মতো ইসলামী অভিবাদনের ব্যবহার দেখা যায়। তবে দাসপ্রথার অমানবিক নির্যাতন এবং পরবর্তী সময়ে স্থানীয় সমাজে মিশে যাওয়ার কারণে হাইতিতে একক বা সংগঠিত কোনো মুসলিম সমাজ টিকে থাকতে পারেনি।

গ্রিয়ো: খাবারের টেবিলে পশ্চিম আফ্রিকা

হাইতির সংস্কৃতি ও খাবারের সাথে পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোর এক ঐতিহাসিক সংযোগ রয়েছে। হাইতির জাতীয় খাবার এবং জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুড হলো গ্রিয়ো, যা মূলত শুকরের মাংস, লেবু, লাল শিম, ভাত ও ভাজা কলার সংমিশ্রণে তৈরি। মনে করা হয়, এই খাবারের নামটি এসেছে পশ্চিম আফ্রিকার গ্রিয়টদের থেকে। পশ্চিম আফ্রিকায় গ্রিয়ট বলা হতো ঐতিহ্যবাহী গল্পকার, চারণকবি ও সংগীতশিল্পীদের, যারা মালি বা মৌরিতানিয়ার মুসলিম সমাজের ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধরে রাখতেন। প্রাক-বিপ্লব হাইতিতে এই খাবারটি কেবল ধনী ও অভিজাতদের জন্য সংরক্ষিত ছিল, যা আফ্রিকার গ্রিয়টদের উচ্চ সামাজিক মর্যাদার কথাই মনে করিয়ে দেয়।

এ ছাড়া হাইতির আরেকটি ঐতিহ্যবাহী খাবার হলো জুমু স্যুপ, যা মাংস, সবজি ও মিষ্টি কুমড়া দিয়ে তৈরি করা হয়। দাসদের জন্য এই খাবার নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু ১৮০৪ সালের ১ জানুয়ারি হাইতির স্বাধীনতার দিন বিপ্লবী নেতা জঁ-জ্যাক দেসালিনের স্ত্রী সব কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে এই স্যুপ খাওয়ার আহ্বান জানান। সিয়েরা লিওনের মতো মুসলিম প্রধান দেশে রমজান মাসে খাওয়া ইবে নামক স্যুপের সাথে এই জুমু স্যুপের দারুণ মিল রয়েছে।

হাইতিতে ইসলামের পুনর্জাগরণ ও বেলাল হাবাশির গল্প

হাইতিতে সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের কিছু আরব বংশোদ্ভূত মুসলিম থাকলেও বর্তমানে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত কৃষ্ণাঙ্গ হাইতিয়ানদের মধ্যে ইসলাম গ্রহণের প্রবণতা দারুণভাবে বাড়ছে। গত দুই দশকে শুধু রাজধানী পোর্ট অব প্রিন্সেই প্রায় ৫ হাজার মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন।

তাদেরই একজন ৩৩ বছর বয়সী ইমাম ও দায়ি বেলাল হাবাশি। ২০০৬ সালে ইসলাম গ্রহণ করা বেলাল বলেন, আমি হাইতির একটি গ্রামে খ্রিষ্টান পরিবারে বড় হয়েছি। পরে রাজধানীতে এসে এক মিশরীয় শান্তিরক্ষী সেনার মাধ্যমে ইসলামের সন্ধান পাই। ইসলাম গ্রহণের পর আমি দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করি এবং ২০২১ সালে আমাদের এলাকায় মসজিদ উশ শাহীদ প্রতিষ্ঠা করি। এ ছাড়া আমি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য মদিনা অরফানেজ অ্যান্ড একাডেমি গড়ে তুলেছি, যেখানে শিশুদের আরবি ও কোরআন শিক্ষা দেওয়া হয়।

২০১৬ সালে হাইতির ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এক পরিসংখ্যানে দেশটিতে ৩৬টি মসজিদ এবং ৫০টি মাদ্রাসার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। গায়ানা বা জ্যামাইকার মতো ক্যারিবীয় দেশগুলোতে ভারতীয় বা এশীয় অভিবাসীদের মাধ্যমে ইসলামের প্রচার হলেও হাইতির বিশেষত্ব হলো, এখানকার সব মসজিদ ও ইসলামী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিমরা।

ইমাম বেলাল হাবাশি আরও জানান, হাইতিয়ান ক্রেওল ভাষায় (যা ফরাসিদের বিরুদ্ধে যোগাযোগের জন্য দাসরা তৈরি করেছিল) এখনো অনেক আরবি শব্দের ব্যবহার রয়েছে। যেমন হাইতির স্থানীয় বস্তি এলাকার তরুণেরা আজও একে অপরকে ভাই বোঝাতে আরবি শব্দ আখি বলে ডাকে। তাই হাইতিয়ানরা যখন ইসলাম গ্রহণ করেন, তখন তারা বলেন যে তারা আসলে নিজেদের শিকড়ে ফিরে যাচ্ছেন।

এমনকি হাইতির মুসলিমরা এখন ইতিহাসকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে দেখছেন। তারা মনে করেন, হাইতিয়ান বিপ্লবের সুতিকাগার হিসেবে পরিচিত বোইস কেইম্যান ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানটি আসলে ছিল বোয়া কেই ইমাম বা ইমামের বাড়ির জঙ্গল। তাদের দাবি, সেটি কোনো তান্ত্রিক অনুষ্ঠান ছিল না, বরং সেটি ছিল ঈদুল আজহার দিনে ইমামের দেওয়া একটি খুতবা। সেখানে কোনো শুকর বলি দেওয়া হয়নি, বরং গোপনে একটি ভেড়া জবাই করা হয়েছিল। এমনকি ভুডু শব্দটি এসেছে ইসলামের নামাজের আগের পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম ওজু থেকে।

হাইতির মুসলিমদের এই জাতীয়তাবাদী ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি এটিই প্রমাণ করে যে, ইসলাম হাইতির সংস্কৃতির জন্য কোনো বিদেশি ধর্ম নয়, বরং এটি তাদের ইতিহাসেরই এক অবিচ্ছেদ্য এবং হারিয়ে যাওয়া অংশ।

এনটি

বিজ্ঞাপন