পরিবারে বাবার মর্যাদা ও অবস্থান সবকিছুর ঊর্ধ্বে। সন্তানের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে বাবার অবদান রয়েছে। বাবা শুধু বৈষয়িক দায়িত্ব পালন করেন না, বরং সন্তানের জান্নাতে যাওয়ার মাধ্যম। ইসলামে বাবার অধিকার, দায়িত্ব ও মর্যাদা নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ১৫টি দিক তুলে ধরা হলো এখানে:
১. বংশপরিচয় নির্ধারিত হয় বাবার নামে
ইসলামে সন্তানের বংশপরিচয় বাবার সূত্রে নির্ধারণ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনের সূরা আহজাবের ৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তোমরা সন্তানদের তাদের বাবার নামে ডাকো, আল্লাহর কাছে এটাই সবচেয়ে ন্যায়সঙ্গত। এ বিষয়ে সতর্ক করে মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি নিজ পিতা ছাড়া অন্যকে পিতা বলে দাবী করে, অথচ সে জানে যে, সে তার পিতা নয়, তার জন্য জান্নাত হারাম। (বুখারী, হাদিস : ৬৭৬৬, মুসলিম, হাদিস : ২২৮)
২. বাবাই জান্নাতের শ্রেষ্ঠ দরজা
সন্তানের পরকালীন মুক্তির ক্ষেত্রে বাবার ভূমিকা অপরিসীম। রাসুল (সা.) বলেছেন, পিতা হলেন জান্নাতের দরজাসমূহের মধ্যবর্তী দরজা। যদি তুমি ভালো মনে করো, তবে এ দরজাকে রক্ষণাবেক্ষণ করো; আর যদি ইচ্ছে করো, তবে বিনষ্ট করো। (তিরমিজি, হাদিস : ১৯০০, ইবনু মাজাহ, হাদিস : ৩৬৬৩)
অর্থাৎ, বাবার সেবা ও তাকে সম্মান করার মাধ্যমেই জান্নাতের পথ সুগম হয়।
৩. শ্রদ্ধা ও বিনম্র আচরণ পাওয়ার অধিকারী
পবিত্র কোরআনে মা-বাবার সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। সূরা বনি ইসরাইলের ২৩ ও ২৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া তোমরা অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং মা-বাবার সঙ্গে সৎ ব্যবহার করবে। তাদের একজন বা উভয়ই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাদের উফ শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিও না, বরং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।
একইভাবে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় কাজগুলোর তালিকা করতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) যথাসময়ে নামাজ আদায় করার পরই মা-বাবার প্রতি সদয় আচরণ করার কথা বলেছেন। ইসলামে বাবাকে অপমান করাকে অন্যতম কবিরা গুনাহ বা মহাপাপ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
৪. বাবার সন্তুষ্টিতেই আল্লাহর সন্তুষ্টি
সন্তান যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই বাবার মন জয় করতে হবে। হাদিসে এসেছে, বাবার সন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহর সন্তুষ্টি নিহিত, আর বাবার অসন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহর অসন্তুষ্টি জড়িয়ে আছে। (তিরমিজি)
৫. বাবাকে সম্মানের সঙ্গে সম্বোধন করা
বাবাকে ডাকার সময় সবসময় সম্মানসূচক ও মধুর শব্দ ব্যবহার করা উচিত। পবিত্র কোরআনে দেখা যায়, হজরত ইব্রাহিম (আ.) তার অমুসলিম বাবাকে সম্বোধন করার সময়ও অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিয়ে হে আমার প্রিয় বাবা বলে ডাকতেন।
৬. সন্তানের জন্য বাবার দোয়া সরাসরি কবুল হয়
বাবার মুখের দোয়া সন্তানের জন্য এক বিশাল নিয়ামত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তিনটি দোয়া কবুল হওয়ার বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই; মজলুমের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া এবং সন্তানের জন্য বাবার দোয়া। (তিরমিজি, হাদিস : ১৯০৫)
৭. বাবাকে সময় দেওয়া ও তার সান্নিধ্যে থাকা
ইসলামে বাবার সেবা করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়টিকে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যে, জিহাদের ময়দানে যাওয়ার চেয়েও একে অনেক সময় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
সন্তানের পরকালীন মুক্তির ক্ষেত্রে বাবার ভূমিকা অপরিসীম। রাসুল (সা.) বলেছেন, পিতা হলেন জান্নাতের দরজাসমূহের মধ্যবর্তী দরজা। যদি তুমি ভালো মনে করো, তবে এ দরজাকে রক্ষণাবেক্ষণ করো; আর যদি ইচ্ছে করো, তবে বিনষ্ট করো। (তিরমিজি, হাদিস : ১৯০০)
এক ব্যক্তি মহানবীর কাছে এসে ইসলাম রক্ষা বা হিজরতের উদ্দেশ্যে সশরীরে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে আল্লাহর রাসূল তাকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার মা-বাবার কেউ কি বেঁচে আছেন? লোকটি হ্যাঁ বললে নবীজি তাকে নির্দেশ দেন, তোমার মা-বাবার কাছে ফিরে যাও এবং ভালো ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের সান্নিধ্যে সময় কাটাও। (সহীহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৪৯)
৮. প্রয়োজনে বাবার জন্য অর্থ ব্যয় করা
সন্তানের উপার্জনে বাবার অধিকার রয়েছে। এক ব্যক্তি নবীজির কাছে এসে নিজের সম্পদ ও সন্তানের বিপরীতে বাবার প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করলে আল্লাহর রাসূল বলেন, তুমি এবং তোমার সম্পদ মূলত তোমার বাবারই। তোমার সন্তানরা তোমার শ্রেষ্ঠ সম্পদ, তাই অবলীলায় সন্তানের উপার্জন থেকে তোমরা উপকৃত হতে পারো। (ইবনু মাজাহ)
৯. বাবার মৃত্যুর পরও তার বন্ধুদের সম্মান করা
বাবার মৃত্যুর পরও তার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের সুন্দর এক মাধ্যম হলো তার বন্ধুদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। হাদিসে এটিকে অন্যতম সেরা পুণ্যময় কাজ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) মক্কার পথে এক বেদুইনকে নিজের চড়ার গাধা এবং মাথার পাগড়ি উপহার দিয়েছিলেন, কারণ ওই বেদুইনের বাবার সঙ্গে তার বাবা হজরত ওমর ফারুক (রা.)-এর গভীর বন্ধুত্ব ছিল।
১০. মহান আল্লাহ ও রাসুলের পরেই মা-বাবার স্থান
কোরআনের একাধিক আয়াতে আল্লাহর ইবাদত করার ঠিক পর পরই মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে সৃষ্টির মাঝে মা-বাবার স্থান সবার ওপরে।
১১. বাবার জন্য সবসময় দোয়া করা
সন্তানের উচিত জীবিত বা মৃত সবসময় বাবার জন্য আল্লাহর কাছে দয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করা। কোরআনে বর্ণিত এই দোয়াটিও করা যেতে পারে— হে আমার প্রতিপালক, তাদের উভয়ের প্রতি দয়া করো, যেভাবে তারা শৈশবে আমাকে পরম স্নেহে লালন-পালন করেছিলেন।
১২. বাবার নামে কসম বা শপথ না করা
কাউকে কোনো বিষয়ে নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্য আল্লাহর নাম ছাড়া অন্য কারও নামে কসম কাটা ইসলামে নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট করে বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে তোমাদের বাপ-দাদার নামে শপথ করতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং যে শপথ করতে চায়, সে যেন আল্লাহর নামে শপথ করে; নচেৎ চুপ থাকে। (বুখারী, হাদিস : ৬১০৮,৬৬৪৬)
১৩. পরিবারের দেখভালের মূল দায়িত্ব বাবার
একটি পরিবার পরিচালনার মূল দায়িত্ব ও আর্থিক ভরণপোষণের ভার ইসলামের দৃষ্টিতে পুরুষের তথা বাবার ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। সূরা নিসার ৩৪ নম্বর আয়াতে পুরুষদের নারীদের তথা পরিবারের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
১৪. সব সন্তানের প্রতি সমান আচরণ করা
বাবা তার সব সন্তানের প্রতি ভালোবাসায় ও সম্পদ বন্টনে সমান আচরণ করবেন, এটাই ইসলামের নির্দেশ। নবীজি বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে সমতা বজায় রাখো।
১৫. সন্তানের জন্য দোয়া করা
একজন আদর্শ বাবা সবসময় তার অনাগত বা বর্তমান সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য আল্লাহর দরবারে হাত তোলেন। যেমনটি করেছিলেন হজরত জাকারিয়া (আ.)। তিনি দোয়া করেছিলেন, হে আমার প্রতিপালক, আপনার পক্ষ থেকে আমাকে এক পবিত্র সন্তান দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী।
এনটি
