বিজ্ঞাপন

নবী আইয়ুবের স্মৃতি, ইমাম বুখারির মাজার

মুসলিমদের আকর্ষণের কেন্দ্রে উজবেকিস্তানের ১০ ঐতিহাসিক স্থাপনা

মুসলিমদের আকর্ষণের কেন্দ্রে উজবেকিস্তানের ১০ ঐতিহাসিক স্থাপনা

মুসলিম পর্যটকদের জন্য উজবেকিস্তান একটু বেশিই আকর্ষণীয়। বিখ্যাত হাদিস গ্রন্থ সহিহ বুখারির সংকলক ইমাম বুখারি এই মাটিতেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। নকশবন্দিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠাতা বাহাউদ্দিন নকশবন্দির কবর বুখারা শহরের উপকণ্ঠেই অবস্থিত। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আপন চাচাতো ভাই কুসাম ইবনে আব্বাস (রা.)-এর সমাধি রয়েছে সমরখন্দের বিখ্যাত শাহ-ই জিন্দা কবরস্থানে। 

বর্তমান উজবেকিস্তানের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষই মুসলিম। চমৎকার কারুকাজ করা মসজিদ, মাদ্রাসা, মিনার এবং মনীষীদের প্রাচীন সমাধি যেন দেশটিকে পুরো বিশ্বের কাছে আলাদাভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়।

ভ্রমণপিপাসু ও ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য উজবেকিস্তানের সেরা ১০টি মুসলিম দর্শনীয় স্থানের বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:

১. চশমা আইয়ুব, বুখারা

প্রচলিত আছে, হজরত আইয়ুব (আ.) এই স্থানে একটি অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়েছিলেন। তিনি মরুভূমির বালিতে তার লাঠি দিয়ে আঘাত করার পর সেখান থেকে মিষ্টি পানির ফোয়ারা বেরিয়ে আসে। চশমা আইয়ুবের এই প্রাকৃতিক পানির উৎসটি এখনো সচল রয়েছে। এই পানির বিশেষ নিরাময় ক্ষমতা রয়েছে বলে স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন। অনেকেই এখানে এসে দোয়া করেন। ত্রয়োদশ শতকে এই ঝরনার ওপর নির্মিত ভবনটিতে এখন পানি প্রকৌশলের একটি ছোট জাদুঘর করা হয়েছে।

২. জামে মসজিদ, খিভা

প্রাচীন দুর্গনগরী খিভার জামে মসজিদটি ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্যতম অংশ। এই মসজিদের ছাদ ২১৩টি এলম কাঠের তৈরি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যার প্রতিটি স্তম্ভের খোদাই করা নকশা সম্পূর্ণ আলাদা। এর মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো স্তম্ভটি দশম শতকের। ইচান কালা দুর্গের ভেতরে ইবাদতের জন্য এটি সবচেয়ে শান্ত ও মনোরম জায়গা। এর ছাদের দুটি খোলা অংশ দিয়ে সারাদিন প্রাকৃতিক আলো ভেতরে প্রবেশ করে।

৩. খাস্ত ইমাম মসজিদ, তাশখন্দ

১৯৬৬ সালের প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে উজবেকিস্তানের রাজধানী তাশখন্দের প্রায় সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায়। তবে খাস্ত ইমাম মসজিদটি অক্ষত ছিল। এই মসজিদের লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে ইসলামের তৃতীয় খলিফা হজরত উসমান (রা.)-এর ব্যবহার করা পবিত্র কোরআনের মূল কপি। কার্বন ডেটিং পরীক্ষার মাধ্যমে জানা গেছে, এটি সপ্তম শতকের সংকলন। ফলে একে পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন বা টিকে থাকা সবচেয়ে পুরোনো কোরআন শরিফ হিসেবে গণ্য করা হয়।

৪. ইমাম বুখারির মাজার, হারতাং

হাদিস শাস্ত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ বুখারী শরীফের লেখক ইমাম বুখারি (রহ.) উজবেকিস্তানের বুখারা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তবে তাকে সমাহিত করা হয় সমরখন্দ থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের হারতাং গ্রামে। বলা হয়, তিনি প্রায় ৬ লাখ হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন, যার মধ্য থেকে যাচাই-বাছাই করে ৭ হাজার ৪০০টি বিশুদ্ধ হাদিস নিয়ে সহিহ বুখারি সংকলন করেন। 


ইমাম বুখারির এই বিশাল মাজার কমপ্লেক্সটি উজবেকিস্তানের সবচেয়ে পবিত্র দর্শনীয়গুলোর একটি। স্থানীয় মুসলিমরা এই মাজার জিয়ারত করাকে ছোট ‘হজ বা ওমরাহ’র সমতুল্য মনে করেন।

৫. ইসমাইল সামানির মাজার, বুখারা

৮৯২ থেকে ৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত সামানিদ মাজারটিকে ইসলামের ইতিহাসের প্রথম দৃশ্যমান মাজার বা সমাধিস্তম্ভ বলা চলে। কারণ এর আগে রক্ষণশীল সুন্নি রীতিতে কবরের ওপর কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা নিষিদ্ধ ছিল। এই চতুষ্কোণ কাঠামোর নকশাটি মক্কার পবিত্র কাবার আদলে তৈরি বলে ধারণা করা হয়, যদিও এতে প্রাচীন জরথুষ্ট্রীয় সংস্কৃতির কিছু প্রতীকও রয়েছে। এই ভবনের নকশা থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মাজার নির্মাণ করা হয়েছিল।

৬. নকশবন্দি মাজার কমপ্লেক্স, বুখারা

সুফিবাদের অন্যতম বৃহত্তম তরিকা নকশবন্দিয়া ধারার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বাহাউদ্দিন নকশবন্দ বুখারি। তার সমাধিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই কমপ্লেক্সটি মূলত ষোড়শ শতকের স্থাপত্য। মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসলিমরা এখানে মানত করতে এবং ধর্মীয় শিক্ষা নিতে আসেন। তবে যেকোনো ধর্মের পর্যটকদের জন্যই এর দুয়ার উন্মুক্ত। 

উজবেকিস্তানের যে কয়েকটি স্থানে নারীদের মাথা ঢেকে প্রবেশ করতে হয়, এটি তার অন্যতম।

৭. নূর চশমা, নুরাতা

গ্রিক বীর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের তৈরি একটি প্রাচীন দুর্গের ঠিক নিচেই এই নূর চশমা বা পবিত্র ঝরনাটি অবস্থিত। ঝরনার পানিতে অসংখ্য মাছ ভেসে বেড়ায় এবং এই পানি একটি গোসলখানায় গিয়ে পড়ে। রোগমুক্তির আশায় অনেকেই এখানে গোসল ও মানত করতে আসেন। নবদম্পতিরা তাদের দাম্পত্য জীবনে বরকত লাভের জন্য এবং বিয়ের ছবি তুলতে এখানে নিয়মিত ভিড় করেন।

৮. তিল্লা কোরি মসজিদ, সমরখন্দ

সারা দেশজুড়ে চমৎকার সব মসজিদের ভিড়ে তিল্লা কোরি মসজিদকে আলাদা করতেই হয়। এর ভেতরের দেয়াল ও ছাদ যেভাবে সোনার পাত দিয়ে জাঁকজমকপূর্ণভাবে সাজানো হয়েছে, তা এক কথায় অতুলনীয়। সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নির্মিত তিল্লা কোরি মাদ্রাসা প্রাঙ্গণেই এই মসজিদটির অবস্থান। এটি উজবেকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র রেজিস্তানের উত্তর দিকে অবস্থিত।

৯. কুসাম ইবনে আব্বাস (রা.) সমাধি, সমরখন্দ

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, তার চাচাতো ভাই কুসাম ইবনে আব্বাস (রা.)-এর চেহারা অবিকল তার মতোই ছিল। মধ্য এশিয়ায় ইসলাম প্রচারের প্রধান কৃতিত্ব দেওয়া হয় তাকেই। তৈমুরিদ রাজপরিবারের সমাধি ক্ষেত্র শাহ-ই জিন্দার কেন্দ্রবিন্দুতে তাকে সমাহিত করা হয়। স্থানীয় একটি লোককথা অনুযায়ী, কুসাম ইবনে আব্বাসের শিরশ্ছেদ করার পর তিনি মারা যাননি, বরং নিজের কাটা মাথা নিয়ে জান্নাতে চলে যান। শাহ-ই জিন্দা শব্দের অর্থ জীবিত রাজা, যা মূলত এই গল্প থেকেই এসেছে।

১০. হজরত দানিয়েল (আ.)-এর সমাধি, সমরখন্দ

উজবেকিস্তানের মুসলিমরা বিশ্বাস করেন, আল্লাহর অন্যতম নবী হজরত দানিয়েল (আ.)-কে সমরখন্দে সমাহিত করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে তিনি দানিয়ার নামে পরিচিত। 

মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদি—তিন ধর্মের মানুষই এই স্থানে এসে শ্রদ্ধা জানান। হজরত দানিয়েল (আ.)-এর ১৮ মিটার দীর্ঘ কফিনটি পবিত্র কোরআনের আয়াত খচিত মখমলের কাপড় দিয়ে ঢাকা থাকে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, প্রতি বছর তার পবিত্র শরীর অলৌকিকভাবে সামান্য করে বৃদ্ধি পায়, আর সে কারণেই এই কফিনটি এত দীর্ঘ করা হয়েছে।

সূত্র : মিডিয়াম ডট কম

এনটি

বিজ্ঞাপন