বিজ্ঞাপন

পর্তুগালের ভাষা, সংস্কৃতিতে যেভাবে আজও টিকে আছে মুসলিম শাসনের চিহ্ন

পর্তুগালের ভাষা, সংস্কৃতিতে যেভাবে আজও টিকে আছে মুসলিম শাসনের চিহ্ন

পর্তুগালের আধুনিক সমাজ ও সংস্কৃতির গভীরে মিশে আছে এক প্রাচীন ইসলামী ঐতিহ্য। দেশটির প্রায় ৫০০ বছরেরও বেশি সময় মুসলিম শাসকদের অধীনে ছিল। যদিও সেই সোনালী যুগের খুব বেশি দৃশ্যমান স্থাপত্য বা স্মৃতিস্তম্ভ এখন আর টিকে নেই, তবুও পর্তুগালের ভাষা, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনযাত্রায় এখনও স্পষ্ট হয়ে আছে ইসলামী ইতিহাসের গভীর ছাপ।

২০১৯ সালে লিসবনের সেন্ট্রাল মসজিদে মুসলিম কমিউনিটির বিশেষ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে পর্তুগিজ প্রেসিডেন্ট মার্সেলো রেবেলো ডি সুজা বলেন, ইসলাম পর্তুগালের আত্মার অংশ। পর্তুগালের সমাজ ও সংস্কৃতিতে আরবরা যে গভীর ঐতিহ্য রেখে গেছে, সে সম্পর্কে হয়তো আমরা সবসময় পুরোপুরি সচেতন নই। তবে এই প্রভাব অতীতেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং এখনও এর তাৎপর্য অনস্বীকার্য।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ৭১১ খ্রিস্টাব্দে উত্তর আফ্রিকা থেকে মুসলিম বাহিনী সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বর্তমান পর্তুগাল ও স্পেনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেয়, যা ইতিহাসে আন্দালুস নামে পরিচিত। স্পেনের কর্ডোবার গ্র্যান্ড মস্ক কিংবা গ্রানাডার আলহামব্রা প্রাসাদের মতো রাজকীয় স্থাপত্যের উদাহরণ পর্তুগালে তেমন একটা টিকে নেই। তবে পাঁচ শতকের মুসলিম শাসন পর্তুগিজ ভাষা ও সংস্কৃতিতে এমন কিছু উপাদান রেখে গেছে, যা মুছে ফেলা অসম্ভব।

বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক আদলবার্তো আলভেসের মতে, আন্দালুস ছিল মানবসভ্যতার এক স্বর্ণযুগ। সে সময় মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিস্টানরা চমৎকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে সহাবস্থান করত, যার ফলে বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল অভূতপূর্ব উপায়ে। আলভেস গত ৪৫ বছর ধরে পর্তুগালে মুসলিম শাসনের এই প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি আন্দালুসীয় যুগের আরবি কবিতা পর্তুগিজ ভাষায় অনুবাদ করেছেন, যার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৮ সালে ইউনেস্কো তাকে শারজাহ পুরস্কারে ভূষিত করে।

আলভেস প্রায় ১০ বছর ধরে পর্তুগিজ ভাষায় ব্যবহৃত আরবি শব্দের একটি অভিধান তৈরিতে কাজ করেছেন। তিনি জানান, পর্তুগিজ ভাষায় প্রায় ১৯ হাজার শব্দ রয়েছে যা সরাসরি আরবি থেকে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, পর্তুগিজরা কোনো কিছুর আশা প্রকাশ করতে সাধারণত ওশলা শব্দটি ব্যবহার করে, যা মূলত আরবি ইনশাআল্লাহ শব্দের সরাসরি রূপান্তর।

গবেষকদের মতে, কবিতা, ভাষা ও কার্পেট বুনন থেকে শুরু করে সংগীত, স্থাপত্য এবং বিজ্ঞানের বহু ক্ষেত্রে পর্তুগাল তার ইসলামী অতীতের কাছে ঋণী। বিশেষ করে আরবরা যদি জাহাজ চলাচলের আধুনিক বিজ্ঞান উন্নত না করত, তবে পর্তুগিজরা হয়তো বিশ্বখ্যাত নাবিক হতে পারত না। ফলে ইউরোপীয় রেনেসাঁর যে ভিত্তি, তা আরবদের হাত ধরেই তৈরি হয়েছিল। তবে দুঃখজনকভাবে ইউরোপের মূলধারার ইতিহাসে আরব ও মুসলিমদের এই অবদানকে অনেক ক্ষেত্রেই আড়ালে রাখা হয়েছে।

লিসবন মসজিদের সামাজিক কমিটির সদস্য ফাওজিয়া ইব্রাহিমো বলেন, স্কুলের পাঠ্যবইগুলোতে যখন শিশুরা এই সময়কাল সম্পর্কে পড়ে, তখন তারা মূলত খ্রিস্টান ও মুসলিমদের মধ্যকার যুদ্ধবিগ্রহের কথাই বেশি জানতে পারে। সেখানে মুসলিমদের সবসময় শত্রু হিসেবে দেখানো হয়। অথচ সেই যুগের শিল্প, বিজ্ঞান এবং দীর্ঘদিনের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে আরও বেশি আলোচনা হওয়া উচিত ছিল।

পঞ্চদশ শতকে খ্রিস্টান রাজারা আন্দালুসের শেষ মুসলিম ঘাঁটিগুলো জয় করার পর আইবেরিয়ান উপদ্বীপে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। সে সময় মুসলিম ও ইহুদিদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হয় অথবা দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। তবে পর্তুগালের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে তো বটেই, এমনকি বর্তমান প্রজন্মের জিনগত গঠনেও এই মুসলিম-ইহুদি বংশোদ্ভূতদের গভীর সংযোগ রয়েছে। বিজ্ঞানীদের এক জেনেটিক গবেষণায় দেখা গেছে, আইবেরিয়ান উপদ্বীপের বর্তমান জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের শরীরে ইহুদি বা মুসলিম পূর্বপুরুষদের ডিএনএ রয়েছে।

২০১৫ সালে পর্তুগাল একটি আইন পাস করে, যার মাধ্যমে পঞ্চদশ শতকে দেশ থেকে বিতাড়িত ইহুদিদের বংশধরদের নাগরিকত্ব দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে সেই আইনে মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কায়রোর বিখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যান্ড ইমাম আহমাদ তায়েব এক সফরে এসে পর্তুগিজ সরকারের প্রতি আহ্বান জানান যেন ইহুদিদের মতো বিতাড়িত মুসলিমদের বংশধরদেরও এই নাগরিকত্বের সুযোগ দেওয়া হয়।

পর্তুগালের আধুনিক যুগের সবচেয়ে বিখ্যাত কবি ফার্নান্দো পেসোয়া আজ থেকে ১০০ বছর আগেই তার লেখায় এই অবিচারের কথা তুলে ধরেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, আরবদের বিতাড়িত করে আমরা যে অপরাধ করেছি, আসুন তার প্রায়শ্চিত্ত করি; কারণ তারাই এই উপদ্বীপকে সভ্য করে তুলেছিল। 

পেসোয়ার বিভিন্ন লেখায় ইসলামী সভ্যতার প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা এবং আন্দালুসের প্রতি পর্তুগালের সাংস্কৃতিক ঋণের কথা বারবার উঠে এসেছে। পর্তুগালের ইতিহাসবিদদের একাংশও মনে করেন, মুসলিমরা কোনো বহিরাগত শত্রু ছিলেন না, বরং তারা ছিলেন বর্তমান পর্তুগিজদেরই পূর্বপুরুষ এবং তাদের রেখে যাওয়া ইসলামী ঐতিহ্যই আজ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে।

সূ্ত্র : দ্য নিউজ আরব

এনটি