বিজ্ঞাপন

পানামায় মুসলিম-ইহুদিদের সম্প্রীতির যে চিত্র অনেকেরই অজানা

পানামায় মুসলিম-ইহুদিদের সম্প্রীতির যে চিত্র অনেকেরই অজানা

মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত যেখানে বিশ্বজুড়ে মুসলিম ও ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদের দেয়াল তুলে দিয়েছে, সেখানে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে লাতিন আমেরিকার দেশ পানামা। দূরপ্রাচ্যের সব যুদ্ধ, বৈরিতা ভুলে পানামা সিটির মুসলিম ও ইহুদিরা বছরের পর বছর ধরে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করছেন। নিজেদের তারা মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের ছায়া থেকে সম্পূর্ণ দূরে রেখেছেন এবং জাতীয় পরিচয়ে সবাই একতাবদ্ধ।

বাণিজ্য ও ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বই সম্প্রীতির মূল চাবিকাঠি

পানামার ৩৭ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ২৪ হাজার মুসলিম এবং ১২ থেকে ১৪ হাজার ইহুদি বসবাস করেন। দুই সম্প্রদায়ের এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে তাদের মধ্যকার গভীর ব্যবসায়িক সম্পর্ক। বিশেষ করে হংকংয়ের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল কোলন ফ্রি ট্রেড জোনে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ব্যবসা করছেন।

পানামা সিটির সবচেয়ে পুরোনো সিনাগগের রাব্বি গুস্তাভো ক্রাসেলনিক বলেন, এখানে অনেক ইহুদি ও মুসলিম পেশাজীবী একসঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্বে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। যখন কেউ কাউকে ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে পাশে পায়, তখন তাকে ঘৃণা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

একই সুর শোনা গেল মিশর থেকে ১৫ বছর আগে পানামায় আসা ডা. মোহাম্মদ আলীর কণ্ঠেও। তিনি জানান, পানামার সমাজ অত্যন্ত বন্ধুভাবাপন্ন এবং তারা ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে সহজে গ্রহণ করে। ধর্ম বা বিশ্বাসের ভিত্তিতে কাউকে ঘৃণা করার কোনো কারণ এখানে নেই। আমরা সবাই মানবতার অংশ।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি থেকে দূরত্ব

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে ফ্রান্সে যখন ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যু নিয়ে মুসলিম ও ইহুদিদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়ায়, তখন পানামার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানকার ধর্মীয় নেতারা সচেতনভাবেই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সংকটকে নিজেদের সমাজে প্রবেশ করতে দেন না। রাব্বি ক্রাসেলনিকের মতে, সবার নিজস্ব মতামত থাকার অধিকার আছে, তবে আমরা জানি যে পানামায় বসে মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যার সমাধান হবে না। তাই এখানে তা নিয়ে বিতর্ক করা অর্থহীন।

দুই সম্প্রদায়ের সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে এবং আন্তঃধর্মীয় সংলাপ চালিয়ে যেতে এখানে গঠিত হয়েছে ইন্টার-রিলিজিয়াস কমিটি অব পানামা (কোইপা)। এই উদ্যোগে মুসলিম ও ইহুদিদের পাশাপাশি খ্রিস্টান এবং হিন্দু ধর্মীয় নেতারাও সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। এমনকি সুন্নি ও শিয়া বিভেদের মতো বিষয়গুলোকেও এখানকার মুসলিম ব্যবসায়ীরা অজ্ঞতা হিসেবেই দেখেন এবং ঐক্যের ওপর জোর দেন।

ইতিহাস ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

লাতিন আমেরিকায় মুসলিম ও ইহুদিদের আগমন ঘটেছিল স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক আমলে। পরবর্তীতে পানামা খাল খননের সময় মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত থেকে প্রচুর মুসলিম এখানে আসেন। অন্যদিকে উনবিংশ শতাব্দী থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত ইউরোপ থেকে ব্যাপক হারে ইহুদিরা পানামায় অভিবাসী হন।

রাজনৈতিকভাবে পানামার সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ এবং আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিকেই তারা সাধারণত অনুসরণ করে। তা সত্ত্বেও দেশটির মুসলিম সম্প্রদায় পানামার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। পানামায় ইতিপূর্বে দুজন ইহুদি প্রেসিডেন্টও দায়িত্ব পালন করেছেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যখন ইসলামোফোবিয়া বা ইহুদি-বিদ্বেষ বাড়ছে, তখন পানামায় এর কোনো প্রভাব নেই বললেই চলে। ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. জন তোফিক করম বলেন, লাতিন আমেরিকার জাতীয় আদর্শই এমন যে তা সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষকে একটি বৃহত্তর জাতীয় পরিচয়ে অন্তর্ভুক্ত করে।

দিনশেষে পানামার মুসলিম ও ইহুদিদের প্রধান পরিচয়—তারা পানামানিয়ান। ডা. মোহাম্মদ আলী আশা প্রকাশ করেন, পানামার এই সম্প্রীতির মডেল থেকে শিক্ষা নিয়ে একদিন মধ্যপ্রাচ্যসহ পুরো পৃথিবীতে স্থায়ী শান্তি ফিরে আসবে।

সূত্র : মিডল ইস্ট আই

এনটি