বিজ্ঞাপন

সাহাবি জীবন

এক মুহূর্তও না ভেবে ইসলামের খাতিরে ধন-সম্পদের মায়া ছেড়েছিলেন যে সাহাবি

এক মুহূর্তও না ভেবে ইসলামের খাতিরে ধন-সম্পদের মায়া ছেড়েছিলেন যে সাহাবি

সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান থেকে ক্রীতদাস। ক্রীতদাস থেকে মক্কার শীর্ষ ধনী ব্যবসায়ী। ধনসম্পদ, সম্মান, প্রভাব- প্রতিপত্তি সব কামিয়েছিলেন। তবে ইসলামের খাতিরে ধন-সম্পদের মোহ ছেড়েছিলেন বিন্দুমাত্র ভাবনা ছাড়াই। ইসলামের পথে সাহাবি সুহাইব রুমী (রা.)-এর দীর্ঘ যাত্রা ছিল এমন রোমাঞ্চে ভরপুর। ইসলামের জন্য তার ত্যাগ ও ভালোবাসার স্বীকৃতি বর্ণিত হয়েছে পবিত্র কোরআনেই।

বন্দী জীবন

আরবের বনী তামিম গোত্রের সন্তান ছিলেন সুহাইব রুমী (রা.)। বিত্ত বৈভব, আরাম আয়েশেই কেটেছিল তার শৈশব। তবে বেশি দিন সুখ জুটেনি কপালে। শৈশবে মায়ের সঙ্গে ইরাকের পল্লীতে বেড়াতে যাওয়ার সময় রোমান সৈন্যরা অপহরণ করে তাকে। রোমের এক বাজারে বিক্রি করে দেয় শিশু সুহাইবকে। রোমের বিভিন্ন অঞ্চলে কাটে তার ক্রীতদাস জীবন। ক্রীতদাস হিসেবেই কাটিয়ে দেন জীবনের বড় একটা অংশ। 

মক্কায় মুক্ত জীবনে ইসলামের ছায়াতলে

ক্রীতদাস জীবনের পুরো সময়ে এক মুহূর্তের জন্যও ভুলেননি আরব দেশের কথা। শৈশবে অপহরণের শিকার সুহাইব রুমী সুযোগ বুঝে একদিন চলে আসেন আরবের প্রধান বাণিজ্যিক নগরী মক্কায়। আব্দুল্লাহ ইবনে যুদআন নামক কোরাইশের এক নেতার সাথে মিলে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করেন। ধীরে ধীরে হয়ে উঠেন মক্কার সেরা ধনী ব্যক্তি। মক্কায়  একেবারে ইসলামের সূচনালগ্নে ইসলাম গ্রহণ করেন তিনি, যখন মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তিনি তখন ইসলাম গ্রহণ করেন। মক্কার মুশরিকদের নির্যাতনের ভয়ে তখন কেউ কেউ ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করতো তবে তিনি প্রকাশেই ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছিলেন।

হিজরতের সংকল্প

কুরাইশদের নির্যাতনের ফলে মুসলমানদের জন্য মক্কায় টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এমন সময় আল্লাহ তায়ালা হিজরতের নির্দেশ দিলেন। আল্লাহ তায়ালার নির্দেশের পর তৎকালীন মুসলমানদের জন্য সব থেকে বড় ও নেক আমল হয়ে দাঁড়াল মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত। মদিনায় মন খুলে আল্লাহকে ডাকা যাবে। বিনা বাধায় নামাজ পড়া যাবে। দীন কায়েম করা যাবে। কেউ বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। কেউ কষ্ট দেবে না। স্বাধীনভাবে ইসলামের সব বিধান মানা যাবে।

হিজরতের পথে কুরাইশের বাধা

হজরত সুহাইব রুমী (রা.) ইসলামের তৃতীয় হিজরতকারী হওয়ার স্বপ্ন দেখলেন। কিন্তু তার হিজরতের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ালো মক্কার কুরাইশরা। এতো সম্পদ নিয়ে তাকে হিজরত করতে দিতে রাজি নন কুরাইশ নেতারা।

এক প্রচণ্ড শীতের রাতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বারবার বাড়ির বাইরে যাওয়া আসা করতে লাগলেন। পেছনে ওত পেতে থাকা কুরাইশরা ভাবল,তার পেটে সমস্যা দেখা দিয়েছে। নিশ্চিন্ত মনে সবাই যার যার ঘরে চলে গেল। সেদিনের মতো তার পিছু ছাড়লো। রাতের আঁধারে সুযোগ বুঝে বাড়ি থেকে বের হয়ে মদিনার পথ ধরলেন সুহাইব রুমী (রা.)। 

মক্কা থেকে বের হয়ে কিছুদূর যেতে না যেতেই ওত পেতে থাকা লোকজন তা টের পেয়ে গেল। দ্রুতগতির ঘোড়ায় চড়ে ধাওয়া করল সুহাইবকে। সুহাইব তাদের উপস্থিতি টের পেলেন। তিনি এক উঁচু টিলায় আশ্রয় নিলেন। টিলার উপরে উঠে তীর, ধনুক বের করে পিছু ধাওয়া নেওয়া কুরাইশদের বললেন, তোমরা জানো তোমাদের মধ্যে আমিই সবচেয়ে ভালো তীরন্দাজ। আল্লাহর কসম আমার কাছে যতগুলো তীর আছে তার প্রত্যেকটি দিয়ে তোমাদের এক এক জনকে খতম না করা পর্যন্ত তোমরা আমার কাছে পৌঁছাতে পারবে না। এরপর আমার তরবারি তো আছেই। 

ইসলামের খাতিরে ছাড়লেন সম্পদের মায়া

কুরাইশের একজন বলল, আল্লাহর কসম! তুমি জীবনও বাঁচাবে এবং অর্থ সম্পদও নিয়ে যাবে তাতো আমরা হতে দেব না। তুমি মক্কায় এসেছিলে শূন্য হাতে, এখানে এসেই সম্পদের মালিক হয়েছো, আবার তুমি এসবও সঙ্গে নিয়ে যাবে!

এ কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গেই সুহাইব রুমী (রা.) তাদের প্রস্তাব দিলেন, আমি যদি আমার ধন-সম্পদ তোমাদের হাতে তুলে দেই তোমরা আমাকে রাস্তা ছেড়ে দেবে? তারা বলল, হ্যাঁ। তিনি এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে তার সকল ধন সম্পদ তাদের দেখিয়ে দিলেন। তারা তার পথ ছেড়ে দিল। দীর্ঘ দিনের পরিশ্রম আর তিলে তিলে গড়ে ওঠা সম্পদ এভাবেই তিনি ছেড়ে গেলেন দ্বীনের খাতিরে। আল্লাহর জন্য সবকিছুর মায়া ত্যাগ করলেন। পেছনের ফেলে আসা এই সম্পদের জন্য তিনি একটুও কাতর হননি। আল্লাহও তাকে ভুলে যাননি। আল্লাহ তায়ালা আয়াত নাজিল করে জানিয়ে দিয়েছেন, তার এই ত্যাগকে আল্লাহ পছন্দ করেছেন। 

আল্লাহর পক্ষ থেকে সান্ত্বনা ও পরস্কার

মদিনায় পৌঁছে নবীজির (সা.) সঙ্গে দেখা হতেই নবীজি বলে উঠলেন, আবু ইয়াহিয়া, ব্যবসা লাভজনক হয়েছে। এ কথা তিনবার বললেন নবীজি। সুহাইব রুমী (রা.)বললেন, আল্লাহর কসম! ইয়া রাসুল আল্লাহ, আমার আগে তো আপনার কাছে কেউ আসেনি। তাহলে নিশ্চয়ই জিবরাঈ (আ.) এ খবর দিয়েছেন আপনাকে।

ব্যবসাটি সত্যিই লাভজনক হয়েছিল।  তার এই আত্মত্যাগের প্রেক্ষাপটে সূরা বাকারার একটি আয়াত নাজিল হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন অনেক মুফাসসির। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনের সূরা আল-বাকারার ২০৭ নম্বর আয়াত নাজিল করেন। যেখানে বর্ণিত হয়েছে :

 ‘মানুষের মধ্যে এমন আছে যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে নিজের প্রাণ দিয়ে থাকে, বস্তুতঃ আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি অত্যধিক দয়ালু।’ 

এনটি